
যেসব ঘটনা ঘটছে, ইন্টারেস্টিং। মুহাম্মদ ইউনুস অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। অবশ্যই, এই ঘটনা আমাদের জন্য স্বস্তির। এক ঘোর আওয়ামী সমর্থক, যিনি খুব কাছের আত্মীয়, ও মানুষ হিশেবে আমার খুব পছন্দের, আমারে কইতেছিলেন, গত দশ বছরে এরকম হাতের নাগালে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের রমজান আসে নাই। আত্মীয়বর এতদিন পর্যন্ত কইতেছিলেন, হাসিনাতেই ফিরতে হবে। এখন, তার সেই আগ্রহ ও আবেগ যে কমে গেছে, তা বোঝা যাচ্ছে। বলছেন, হাসিনা আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতি পুরো ধ্বংসের হোতা। খুনী। তারে কেন ফেরত চাইব? বরং হাসিনার বাইরে নতুন আওয়ামীলীগ আসবে, আজ হোক, কাল। যেহেতু আদর্শ মরে না। তবে, তিনি ছাত্রদের ব্যাপারে ক্রিটিকাল। আর বিএনপির ব্যাপারে কনফিউজড। বলছেন, পুরনো তরিকায় দুর্নীতিতে ঢুকছেন ছাত্ররা, এইটাতে ওদের সতর্ক হওয়া উচিত।
এইবার গ্রামে গিয়ে মনে হল, বিএনপির পদধারী আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধব যারা, তাদের অবস্থা পালটেছে। আগে যে জাগায় আওয়ামীলীগের পদধারি আত্মীয় ও বন্ধু বান্ধবদের দেখা যেত, এখন, ঠিক সেই জায়গাগুলোতে ও একই চেহারায় এই নতুন পদধারীদেরকে দেখা যায়। পরিবর্তনটা ইন্টারেস্টিং। আগের নেতাদের আশেপাশে কখনো বিএনপির বন্ধুদের দেখি নাই, তারা দূরে দূরে থাকত। এখনকার যে বিএনপি নেতা, আমার স্কুলবেলার বন্ধু, তার মোটরসাইকেলের ঠিক পেছনেই দেখি, পুরনো আওয়ামীলীগ নেতা ও আর এক পরিচিত ছোট ভাই। বিএনপির বন্ধুরে হাসতে হাসতে জিগেশ করলাম, এই আওয়ামী লীগরে নিয়া হাঁট কেন? সে এবং পুরনো আওয়ামীলীগ করা ছোট ভাই, যে এমপির কাছের লোক ছিল দীর্ঘদিন, উভয়ই হাসতে হাসতে, ইশারা করে অন্য আলাপ, যেমন, কুশলে ঢুকে গেল।
আমাদের গ্রামে অবশ্যই বিএনপির তিন এমপি নমিনেশন প্রার্থির তিন কমিটি হইছে এইবার। গতকালকে তাদের একজনের বাড়িতে মেজবান ছিল, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও মেয়র শাহাদাত আসছিলেন, প্রার্থি, যিনি আত্মীয়ও আমার, আমারে ইনভাইট করতে আসলেন। একই ঘটনা, ঈদের কয়েকদিন আগে, গ্রামের জামায়াতের ইফতারের আমন্ত্রণে গিয়েও দেখলাম। পুরনো আওয়ামীলীগারদের কেউ কেউ সসম্মানে সামনের দর্শক সারি দখল করে আছে। মূলত, দলগুলোর এই নতুন ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী নেতৃশ্রেণী ও সুবিধাবাদীর বাইরে, যাদেরে সাধারণ কওয়া যায়, এরকম লোকজন প্রায় সবাই এই মুহূর্তে মুহাম্মদ ইউনুস নিয়া বেশ আগ্রহী। যার সাথেই কথা বলছি, দুই মাস আগেও যিনি অস্বস্তি ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছিলেন, দুই মাস পরে, এখন আইসা অদ্ভূত প্রশান্তির হাসি হাসছেন। আলহামদুলিল্লাহ বলছেন। সম্ভবত, এর কারণ দ্রব্যমূল্য। আইন শৃঙ্খলাও বোধ হয় এর কারণ। এখন, শৃঙ্খলায় মানুষের আস্থা আসছে। এইটা, প্রায় মিরাকল।
দেশের অভ্যন্তরে ইসকন ও ইন্ডিয়া প্রশ্ন বহুদিন ধইরা অস্বস্তি তৈরী করলেও, শেষমেষ, ইন্ডিয়া দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু কার্ড ও ইসকন খেলাতে বিরতি দিয়েছে। মানে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বশেষ, জাতিসংঘ মহাসচিবের সফর ও ইউনুসের চীন সফরের পরে অনেক কিছুই পালটে গেছে। নিজেদেরকে সেভেন সিস্টার্স এর অভিভাবক দাবী করে ইউনূসের কুটনৈতিক মন্তব্য সম্ভবত, মোদি প্রশাসনকে নড়ে চড়ে উঠতে বাধ্য করেছে। ইউনুস যে ফাঁদে পা দেবেন না, বা দুর্বল খেলোয়ার হবেন না, তা বোঝা ইন্ডিয়ার পক্ষে অসম্ভব নয়। মাঝখানে হাসিনা একটা বিভ্রান্তি মাত্র, আর কিছু নয়। নরেন মোদির সাথে মুহাম্মদ ইউনুসের বৈঠক হচ্ছে দেখলাম। ইউনুসের কাছে মোদির চিঠিও পড়লাম। ইন্টারেস্টিং ঘটনা।
ট্রাম্পের আমেরিকা নিয়া হাসিনাশিবিরে বহুত গীত শোনা গেলেও, তারে তেমন সত্য দেখা যায় না। আওয়ামীলীগের যেসব কনসার্ন, তারে নিয়া ট্রাম্ প্রশাসন বিন্দুমাত্র ব্যথিত দেখা যায় না। সর্বশেষ, মার্কিন পণ্যে বাংলাদেশের শুল্ক ৭৪% দেখিয়ে, যেটি মূলত ট্রেড ডেফিসিট, টাম্প প্রশাসন কর্তৃক বাংলাদেশি পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের একটা ঘটনা ঘটেছে, যেটি ভারতসহ অনেক দেশের উপরেও ট্রাম্প এর নতুন বাণিজ্য নীতি হিশেবে দেখা গেছে। অনেক দেশের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই নীতি মার্কিন পণ্যের উপর শুল্ক সংকোচনের চাপ হিশেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে দেখা গেছে। ফলে, প্রেস সচিব এই ঘটনা নিয়া একটা আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশ অলরেডি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শুল্কহারের যৌক্তিক বিকল্প ও অসামঞ্জস্যগুলো সংশোধনে কাজ করছে, ফলে, দ্রুতই ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে এই নিয়া একটা সমাধানে আসতে পারবে বাংলাদেশ। এই ব্যাপারটা এই মুহূর্তে একটা চ্যালেঞ্জ বটে, তবে, এইটা একক বাংলাদেশের কোন চ্যালেঞ্জ না, ভারতসহ আরো অনেকগুলো দেশের নাম আছে এখানে, যা ট্রাম্পের প্রশাসনিক নীতি। ইউনুসের কারণে এই নীতি না। আশা করছি, দ্রুতই বাংলাদেশ এই সমস্যা সামলে উঠতে পারবে।
মূলত, মুহাম্মদ ইউনুস ক্রমে, একটা কেন্দ্রিয় আশার প্রতীকে পরিণত হচ্ছেন আমাদের। এই মুহূর্তে ইউনুস কী পরিমাণ হোপ তৈরী করতে পারছে, তা বুঝতে ঈদের জামাতের পরে লম্বা পাতলা কাপড়ের টুপি পরিহিত ইউনুসের হাত ছুঁতে ছেলে বুড়ো সবার অত্যুগ্র আগ্রহরে নজর দিতে পারেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে, জাতিসংঘ মহাসচিবের সাথে ইউনুস চট্টগ্রামের ভাষায় বক্তৃতা দিয়েছেন, যা চট্টগ্রামের, একই সাথে রোহিঙ্গাদের ভাষারও কাছাকাছি। ফলে, সবাইকে দ্রুত কানেক্ট করতে পেরেছে ও ইউনুসকে আপন মানুষ হিশেবে নিতে পেরেছে সবাই। কেউ কেউ ইউনুসের বয়সের কথা বইলা অনুৎসাহ তৈরী করছেন, আমি কই কি, এই বয়সটাই আমাদের দরকার, যে বয়সে কারো কিছু চাওয়ার নেই, অনেক কিছু দেবার থাকে। তা হল, হাসিনাবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে তার প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব। তার উপস্থিতি ও বিশ্বনেতৃত্বের ভরসা আমাদের দরকার। তা কীভাবে আমরা পাব, তারে লইয়া বেশ কিছুদিন ধরেই কিছু নতুন ধরনের আলাপ আলোচনা চলছে।
এর ভেতরেই, কয়েকদিন আগে, একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা দেখলাম। প্রভাবশালী রাজনীতি বিশ্লেষক ও মটিভেশনাল স্পিকার পিনাকীরে সাধারণভাবে অপছন্দ করা বিএনপির সমর্থকরা হঠাৎ পিনাকীর প্রশংসা করা শুরু করল। কেন এই প্রশংশা, খুঁজতে গিয়ে দেখি, পিনাকীর একটা প্রস্তাবনা।
পিনাকী একটা ট্রানজিশনাল সরকারের প্রস্তাব দিচ্ছেন, যেখানে বিএনপি নেতা তারেক রহমান উপ-প্রধান উপদেষ্টা থাকবেন, ইউনুস প্রধান উপদেষ্টা, আর বাকি দলগুলোর প্রতিনিধিরা থাকবেন। এই সরকার, মূলত আপদকালীন মুহূর্তকে ইউনুসের নেতৃত্ব মোকাবেলায় ব্রতি হবেন এবং তারেক রহমানের হাতে খড়ি হবে রাষ্ট্র পরিচালনার। এইটা, শুরুতে ছাত্রদের প্রস্তাবিত সেই জাতীয় সরকার, যাতে প্রথম দিন তারেক রহমান রাজি হন নাই, আরো পরে আমি যে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের প্রস্তাব দিয়েছিলাম সব দল মিলে, সেই প্রস্তাবের কাছাকাছি একটা অবস্থা। আমার প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল, ইন্টারিম সরকারকে অভ্যুত্থানের সরকারে পরিণত করা ও তার অধীনে ফ্যাসিস্ট পরবর্তি নতুন দেশের শুরু ও প্রয়োজনীয় সংস্কার, যেমন নতুন সংবিধান এডপশন ও গণহত্যার বিচার সমাধা করা। তা তো সেই সময় হল না। এখন, অভ্যুত্থানের সরকার দূরের কথা, এমন কি গণঅভ্যুত্থান নিয়া কোন ঘোষণাপত্র বা দলিলে একমত হতেও তারা ইতস্তত করছেন। কারণ দুইটা। এক, তারা এইটা ছাড়াই নিজেদের নিশ্চিত ক্ষমতারোহন দেখতে পাচ্ছেন। দুই. তারা এই পরিবর্তন ও ঘোষণারে নিজেদের কায়েমি স্বার্থর জন্য ক্ষতিকর ভাবছেন। তো, যে বিএনপি পাঁচ তারিখ জাতীয় সরকারে রাজি হয় নাই, একটা ন্যুনতম ঘোষণাপত্রে একমত হয় নাই, সেই বিএনপি কি পিনাকীর প্রস্তাবিত ট্রান্জিশনাল সরকারে রাজি হবে, যার মেয়াদ হবে আরো অন্তত চার বছর? আমার মনে হয়, বিএনপি বা তারেক রহমানের কাছ থেকে এইটা এইটা ইউটোপিয়ান কল্পনা। খালেদা জিয়া একটিভ থাকলে হয়তো বা আরো বড় কিছুও আশা করা সম্ভব হইত।
দেখা যাক। তবে, পিনাকির এই প্রস্তাবকে একটা গুড জেশ্চার হিশেবে নিতে পারছেন বিএনপির সমর্থকরা, এইটা ভাল ঘটনা।