
ঈদের টানা ছুটিতে রেকর্ড সংখ্যক পর্যটকের ঢল নেমেছে কক্সবাজারে। বসন্ত শেষে চৈত্রের খরতাপ উপেক্ষা করেও সেখানে ছুটি উপভোগ করছেন লাখো পর্যটক। ফলে সৈকতসহ পুরো কক্সবাজার শহর ও পর্যটন স্পটগুলো মুখর হয়ে উঠেছে। হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় তিল পরিমাণ জায়গা নেই।
ঈদুল ফিতরের টানা ছুটি শুরু হয়েছে ২৯ মার্চ থেকে। চলবে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত। দীর্ঘ ছুটিতে বিভিন্ন জেলা থেকে যাওয়া পর্যটকদের পদচারণায় প্রাণ পেয়েছে দেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার। সামর্থ্যবান দেশি পর্যটকরা এবার বিদেশে না গিয়ে কক্সবাজারমুখী হয়েছেন। এমনটাই জানিয়েছেন রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী।
সরেজমিন দেখা যায়, চৈত্রের তীব্র রোদ আর ব্যাপসা গরমেও সৈকত ফাঁকা পড়ে নেই। ছাতা, ক্যাপ বা কাপড়, যে যা পাচ্ছেন তাই মাথায় নিয়ে ঘুরছেন হাজারো পর্যটক। কেউ আবার গরমের আধিক্য ঝেড়ে ফেলতে ফেনিল জলে রৌদ্রস্নান করছেন। ঘোড়ার সওয়ারি হচ্ছেন অনেকে। তরুণ- তরুণীদের কাছে জনপ্রিয় বাইক-স্কুটি যাত্রা। আর সাহসী পর্যটকরা স্পিডবোটে চড়ে ঢেউয়ের সঙ্গে দুলছেন। অন্যদিকে, বয়োবৃদ্ধরা সৈকতে রাখা ছাতার নিচে বসে সাগরের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। জানা যায়, সৈকতের লকার সার্ভিসেও কোনো স্টোর খালি নেই। যদিও সৈকতে বিপৎসংকেত লালের সঙ্গে উড়ছে লাল-হলুদের পতাকাও। তবে, পর্যটকদের সেদিকে খেয়াল নাই। অনেকে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেন সতর্ক সংকেতই ভুলে যেতে বসেছেন। সূত্র জানায়, টানা ঈদের ছুটিকে উপলক্ষ করে কক্সবাজারের আবাসিক হোটেলের শতভাগ রুম আগাম বুকিং চলছে। রুম না পেয়ে অনেকেই আত্মীয় ও পরিচিতদের বাসায় উঠেছেন। হোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভ্রমণের জন্য সমুদ্র শহরকে বেছে নিচ্ছেন। ফলে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্যটন ব্যবসায় ছন্দপতন ঘটেনি, তাই তারা মহাখুশি।
গতকাল বুধবার সকালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কলাতলী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট, লাবণী পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, বিশাল সৈকতে হাজার হাজার পর্যটকের সরব উপস্থিতি। একই অবস্থা হিমছড়ি, ইনানী ও পাটোয়ার টেকেরও।
ইনানীর বিচ ক্যাফের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম জানান, মেরিন ড্রাইভ সড়ক কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসা দক্ষিণে টানছে। ইনানীর সি-পার্ল, বে-ওয়াচ, দ্য ওয়েব রিসোর্ট, প্যাভেলস্টোন, ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, এনকর রিসোর্টের মতো তারকামানের হোটেলগুলো দেশের পর্যটন শিল্পের গর্ব।
পাটোয়ার টেকের সি-মাউন্ড রেস্তোরাঁর মালিক সুইডেন প্রবাসী সাদেক রুবেল জানান, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা চলছে। এজন্য পর্যটকরা পাটোয়ার টেকের পাথুরে বিচ দেখে সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য উপভোগ করার চেষ্টা করছেন।
ঢাকার পিজি হাসপাতালের ডা. জিয়াউল হাসান কালবেলাকে জানান, পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। হোটেলের পরিবেশ এবং সমুদ্রের আবহাওয়া দুটিই ভালো লাগছে। তবে সৈকতে পড়ে থাকা প্লাস্টিক ও ময়লা-আবর্জনার আধিক্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
ঢাকার সাভার থেকে ঘুরতে যাওয়া পর্যটক বেলাল হোসাইন জানান, ট্রেনে চড়ে পুরো পরিবার নিয়ে এসেছি। গরম একটু বেশি, তবুও তাতে ঈদ আনন্দে ছেদ পড়েনি।
কক্সবাজার ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা আনোয়ার কামাল বলেন, দীর্ঘদিন দেশের প্রধান অবকাশযাপন কেন্দ্র কক্সবাজারের মন্দাকাল গেছে। তবে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর স্বরূপে ফিরেছে সৈকত।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় পর্যটকদের আগমন তুলনামূলক অনেক বেশি।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি আপেল মাহমুদ কালবেলাকে জানান, বিচে ছিনতাইকারী ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এদিকে, সৈকতের পরিচ্ছন্নতায় কাজ করছে ম্যানেজমেন্ট কমিটির বেশ কিছু টিম। বিভিন্ন স্পটে অপচনশীল বর্জ্য ফেলতে ২৭টি বড় ডাস্টবিন স্থাপন কার হলেও পর্যটকরা যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কিছু অতি উৎসাহী পর্যটক সতর্কতা লাইন অতিক্রম করে ঝুঁকি নিয়ে সাগরে নেমে পড়ছেন। এসব ক্ষেত্রে পর্যটক সচেতনতা জরুরি বলে মনে করে ট্যুরিস্ট পুলিশ।