Image description
সড়ক দুর্ঘটনা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের শয্যায় শুয়ে কাতরাচ্ছে ছোট্ট শিশুটি। হাতে স্যালাইন লাগানো। কপালে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। হাতেও দেখা যাচ্ছে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। দুই চোখ বন্ধ। মাঝেমধ্যে এক চোখ কোনোমতে খুলতে পারলেও অন্য চোখ খুলতে পারছে না। এক চোখ খুলে কিছুক্ষণ পরপর ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে তাকায়। বিড়বিড় করে কারও সন্ধান জানতে চায়। আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে।

শিশুটির নাম আরাধ্য বিশ্বাস। বুধবার সকালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি-জাঙ্গালিয়া এলাকায় বাস ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয় সে। এই দুর্ঘটনায় তার পরিবারের পাঁচ সদস্যসহ মারা গেছেন ১০ জন।

ছয় বছরের আরাধ্য এখনো জানে না যে তার মা-বাবা আর বেঁচে নেই। দিলীপ বিশ্বাস (৪৩) ও সাধনা বিশ্বাস দম্পতির একমাত্র মেয়ে আরাধ্য। তাদের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপার গোয়ালিয়া গ্রামে। ঈদের ছুটিতে তারা কক্সবাজারে বেড়াতে যাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে।

নিহত দিলীপ বিশ্বাসের বন্ধু ও হিন্দু, বৌদ্ধ কল্যাণ ফ্রন্টের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শোভন কুমার কাজল কালবেলাকে বলেন, দিলীপ গাজীপুরে একটি বায়িং হাউসের ব্যবসা করতেন। ঈদের বন্ধে তারা কক্সবাজারে বেড়াতে যাচ্ছিলেন।

একই দুর্ঘটনায় আহত আরেকজন তরুণীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার অবস্থাও গুরুতর। হাসপাতালে আনার পর মাঝেমধ্যে জ্ঞান ফেরে আবার চলে যায়। আঘাতের ধরন ও বিস্তারিত জানার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

‘তারা দুজনই ব্রেনে আঘাত পেয়েছেন। শিশুটির অবস্থা ভালো না। অজ্ঞাত মেয়েটিকে আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে’—বললেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন।

একই স্থানে পরপর তিন দিন দুর্ঘটনা: চুনতি-জাঙ্গালিয়া এলাকায় গত তিন দিনে তিনটি দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সোমবার সকালে যাত্রীবাহী বাস ও মিনিবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচ তরুণ নিহত হন, আহত হন ৯ জন। মঙ্গলবার ভোরে পর্যটকবাহী দুটি মাইক্রোবাস উল্টে ৯ জন আহত হন। বুধবার সকালে বাস-মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১০ জন নিহত এবং পাঁচজন আহত হন। একই স্থানে বিকেলে প্রাইভেটকার উল্টে আহত হন আরও পাঁচজন।

বুধবারের দুর্ঘটনার বর্ণনা দেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি জানান, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী রিলাক্স পরিবহনের একটি বাস চুনতি-জাঙ্গালিয়া এলাকার মহাসড়কের একটি বাঁকে আসে। তখন চালক ‘হার্ড ব্রেক’ করতে গেলে বাসটির সামনের অংশ ঘুরে যায়। এতে বাসটি মহাসড়কে আড়াআড়ি হয়ে যায়। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা কক্সবাজারগামী দ্রুতগতির একটি মাইক্রোবাসের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তেই কক্সবাজারগামী দ্রুতগতির আরেকটি মাইক্রোবাস দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

বাসে থাকা কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তারা জানিয়েছেন, চুনতি-জাঙ্গালিয়া এলাকায় পৌঁছলে বাসটি আকস্মিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারায়। পরে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী মাইক্রোবাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

কেন একই জায়গায় এত দুর্ঘটনা: প্রতিনিয়ত ট্রাকে লবণ পরিবহন করায় একদিকে পিচ্ছিল সড়ক, অন্যদিকে সরু পথ ও আঁকাবাঁকা বিপজ্জনক বাঁক। নেই স্পিডব্রেকার, জঙ্গলের কারণে বাঁক পার হওয়ার সময় দেখা যায় না কিছুই।

তা ছাড়া বাসের বেপরোয়া গতিকেও দায়ী করেছেন যাত্রীরা। ইমন নামে একজন যাত্রী বলেন, ‘রিল্যাক্স পরিবহনের বাসটি চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাচ্ছিল। চুনতি-জাঙ্গালিয়া এলাকায় পৌঁছলে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এলোমেলোভাবে চলতে থাকে। সে সময় বাসের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি ছিল।’

সাব্বির আহমেদ নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘চুনতি-জাঙ্গালিয়া এলাকায় লবণবাহী ট্রাক থেকে পানি গলে সড়ক পিচ্ছিল হয়েছিল। বাসের অতিরিক্ত গতি ও সড়ক পিচ্ছিল থাকায় চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।’

সরকারের পদক্ষেপ: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক বলেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে কাটা হয়েছে সড়কের পাশের কিছু জঙ্গল। স্পিডব্রেকার বসানো, ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা করা, দুর্ঘটনাস্থলের সড়ক প্রশস্ত করাসহ সংশ্লিষ্টদের বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বলেছি। তিনি বলেন, ‘শুধু সড়কের এই অংশই প্রশস্তকরণ নয়, পুরো কক্সবাজার-চট্টগ্রাম সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলব।’

স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, সরু এই সড়কে আছে বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক বাঁক। সড়কটি চার লেন কিংবা ছয় লেন করা হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটত না। অথচ সরকার এ সড়কের উন্নয়নে এগিয়ে আসছে না।

দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক বাঁক আছে। এর মধ্যে জাঙ্গালিয়া এলাকায়ও একটি বড় বাঁক রয়েছে। গাড়ি ওভারটেক করার সময় বিপরীত দিক থেকে গাড়ি আসছে কি না, দেখা যায় না। এ কারণে মূলত দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। এ ছাড়া লবণ পরিবহন করার সময় পানি পড়ে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে থাকাও একটি বড় কারণ।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বরত নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, ‘লবণ পানির কারণে সড়ক পিচ্ছিল থাকে। এ ছাড়া সকালে কুয়াশার কারণেও ভেজা থাকে সড়ক। এসব কিছুকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া যানবাহনের তুলনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি সরু। এ কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি প্রশস্ত করার একটি প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্যে আছে। সড়ক প্রশস্ত করা গেলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।

হতাহতদের ক্ষতিপূরণ: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক বলেছেন, দুর্ঘটনায় নিহত প্রতিটি পরিবারকে বিআরটিএ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা ও আহতের পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের ৫০ হাজার টাকা ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।