
আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন করছে না। সংস্থাটির অনেক শর্ত দেশের স্বার্থবিরোধী। দেশের স্বার্থ বিপন্ন করে কোনো শর্ত বাস্তবায়ন করা হবে না। এসব কারণে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে আইএমএফও ঋণের কিস্তি ছাড় ইতোমধ্যে তিন দফা পিছিয়েছে। এতে পুরো কর্মসূচিই চলছে ঢিমে তালে। ঋণের অর্থছাড়ে আইএমএফ-এর প্রধান তিনটি শর্ত হচ্ছে-ডলারর দাম, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ও কর আদায় বাড়ানো। এসব শর্ত বাস্তবায়ন করলে মূল্যস্ফীতির হার এবং জনগণের ওপর চাপ বাড়বে। কাজেই এগুলো আইএমএফ-এর চাওয়া অনুযায়ী নয়, সহনীয়ভাবে করতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের সমঝোতা অনুযায়ী আগামী জুনে ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি একসঙ্গে ছাড় করার কথা রয়েছে। অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে ৬ এপ্রিল আইএমএফ-এর একটি মিশন বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে। তারা শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং আগামী দিনে শর্ত বাস্তবায়নে সরকারের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা করবে।
সূত্র জানায়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করতে ২০২২ সালের আগস্টে সরকার আইএমএফ-এর কাছে ঋণ সহায়তা চায়। আন্তর্জাতিক ভাষায় আইএমএফ-এর কাছে সংকট মোকাবিলায় ঋণ সহায়তা চওয়াকে বেলআউট বা পুনরুদ্ধার বলা হয়। আইএমএফ সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পর ঋণের বিপরীতে কঠিন শর্ত আরোপ করে। এসব শর্তে সম্মত হয়ে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ-এর সঙ্গে একটি ঋণচুক্তি করে সরকার। চুক্তি সইয়ের তিনদিনের মধ্যেই ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আইএমএফ-এর কাছ থেকে প্রথম কিস্তির অর্থ বাবদ সরকার ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায়। ওই বছরের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তি বাবাদ ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তি বাবদ ১১৫ কোটি ডলার পায়। তিন কিস্তিতে আইএমএফ-এর কাছ থেকে সরকার মোট পেয়েছে ২৩১ কোটি ডলার। চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড় হওয়ার কথা ছিল গত ডিসেম্বরে। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আইএমএফ-এর শর্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত প্রধান ব্যক্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের পদত্যাগী গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এখন গা ঢাকা দিয়েছেন। ফলে শর্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও ঝুলে গেছে। এছাড়া আইএমএফ-এর অনেক শর্ত দেশের স্বার্থবিরোধী ছিল। যেগুলো অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন করতে অনীহা প্রকাশ করে। এতে আইএমএফ-এর ঋণচুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন এগোচ্ছিল না। ফলে আইএমএফও ঋণের অর্থ ছাড় করছে না। গত ডিসেম্বরে ঋণের চতুর্থ কিস্তি ছাড় হওয়ার কথা। কিন্তু হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে হওয়ার কথা, সেটিও হয়নি। পরে তা পিছিয়ে মার্চে নেওয়া হয়। সেটিও হয়নি। এখন নেওয়া হয়েছে দুই কিস্তি জুনে। এপ্রিলে আইএমএফ মিশন ঢাকা সফর করে গেলে তারা জুনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিষদে বাংলাদেশ বিষয়ে প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। তখন পর্ষদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
জানা যায়, আইএমএফ-এর ঋণচুক্তি থেকে সরকার একেবারে বেরিয়ে যেতে চাচ্ছে না। কারণ, আইএমএফ ঋণ দেওয়ার আগে সে দেশের সার্বিক অর্থনীতির চিত্র ও ঝুঁকি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। এ কারণে সংস্থাটির ঋণ পাওয়া গেলে অন্য সংস্থাগুলোর ঋণ পাওয়াও সহজ হয়। এ কারণে সরকার আইএমএফ-এর ঋণচুক্তির মধ্যে থাকতে চাচ্ছে। যদিও গত সরকারের আমলে তীব্র ডলার সংকট নিরসনে আইএমএফ-এর ঋণ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন ডলার সংকট কেটে গেছে। যে কারণে সংস্থাটির ঋণ নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না সরকার। এদিকে আইএমএফ ঋণচুক্তি বাতিল করতে চাচ্ছে না। কারণ, অনেক দেশই কঠিন শর্তের কারণে তাদের ঋণ নিচ্ছে না। ফলে বৈশ্বিকভাবে আইএমএফ-এর ঋণের চাহিদা কমে গেছে। এ কারণে আইএমএফ শর্ত শিথিল করে হলেও বাংলাদেশকে ঋণ দিতে চাচ্ছে। যে কারণে দুই পক্ষই সমঝোতা করে জুনে ঋণছাড়ে সম্মত হয়েছে।
গত সরকার আইএমএফ-এর বেশকিছু শর্ত বাস্তবায়ন করে গেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার অনেক শর্ত বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করেছে। এখন সংস্থাটির অন্যতম শর্ত হচ্ছে-ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমানো বা ডলারের দাম আরও বাড়ানো। তাদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনায় ডলারের দাম এখনো কম। এর দাম বাড়ালে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়বে। বিনিয়োগও বাড়বে। পাশাপাশি ডলার ধরে রাখার প্রবণতা কমবে। ডলারের দাম বাড়বে-এমন প্রত্যাশায় অনেক রপ্তানিকারক, রেমিটরসহ গ্রাহকরা ডলার ধরে রাখছেন। ডলারের দাম বাড়ালে ধরে রাখার প্রবণতা কমে যাবে। এতে বাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়বে। বাজার স্বাভাবিক হবে।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে ভিন্নকথা। ডলারের দাম বাড়ালে যেটুকু উপকার পাবে অর্থনীতি, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে। কারণ, ডলারের দাম বাড়ালে টাকার মান কমে যাবে। এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। টাকার মান কমায় ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে। এতে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়বে। এর প্রভাবে দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামও বেড়ে যাবে। ফলে সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতির হার বাড়বে। পাশাপাশি বৈদেশিক দেনার পরিমাণ বেড়ে যাবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেও আরও চাপে ফেলবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন মূল্যস্ফীতির হার কমাতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতির হার গত জুলায়ে ছিল সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এ থেকে কমে ফেব্রুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে। আলোচ্য সময়ে এ হার কমেছে ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, আগামী দিনে এ হার আরও কমে যাবে। কিন্তু অনেকেই আগামী জুলাইয়ের দিকে এ হার বাড়ার আশঙ্কা করছেন। এছাড়া বর্তমানে দেশ থেকে টাকা পাচার ও হুন্ডির প্রবণতা বন্ধ হওয়ায় বাজারে ডলারের প্রবাহ বেড়েছে। দামও স্থিতিশীল রয়েছে। যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের দাম বাড়াতে চাচ্ছে না। এ সরকার ক্ষমতায় এসে ডলারের দাম দুই দফায় ২ টাকা করে সর্বোচ্চ ৪ টাকা বাড়িয়েছে। গত সরকার ডলারের দাম দফায় দফায় বাড়িয়ে ১১৮ টাকায় রেখে গেছে। কিন্তু ব্যাংকে ওই সময়ে এই দামে ডলার পাওয়া যেত না। কোথাও কোথাও প্রতি ডলার বিক্রি হতো ১৩২ টাকা। এ সরকার দুই দফায় বাড়িয়ে এখন ১২২ টাকা করেছে। ব্যাংকে এই দামে ডলারও পাওয়া যাচ্ছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো আইএমএফ-এর আরও একটি শর্ত। কারণ, এখনো এ খাতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। সংস্থাটি ভর্তুকি কমাতে দাম বাড়ানোর শর্ত দিচ্ছে। কিন্তু সরকার পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। কারণ, এর দাম বাড়ালে শিল্পের খচর বাড়বে। পণ্যের দাম বাড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পাবে। এ কারণে এর দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আইএমএফ-এর তৃতীয় অন্যতম শর্ত হচ্ছে কর আদায় বাড়ানো। এ ব্যাপারে সরকার বলছে, জনগণের ওপর চাপ বাড়িয়ে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। এজন্য কর বাড়ানো হবে না। তবে যারা কর দেওয়ার যোগ্য, তাদেরকে করের আওতায় এনে কর বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আগামী বাজেটে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।
আইএমএফ-এর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকার কিছু পদক্ষেপ নেবে বলে জানা গেছে। ফলে আগামী জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ একসঙ্গে ছাড় করার কথা রয়েছে। দুই কিস্তিতে ১২০ কোটি ডলারের বেশি পাওয়ার কথা। তবে আলোচনার শর্তের ওপর এটি কমবেশি হতে পারে।