
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে ‘বাংলাদেশ নতুন করে গড়ে উঠছে, ইসলামি কট্টরপন্থিরা সুযোগ খুঁজছে’-শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর দেশে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং, একাধিক উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এই রিপোর্টটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিভ্রান্তিকর এবং পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তির চক্রান্তের অংশ বলে অভিহিত করছেন। অনেকের মতে-গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে নানা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, ১৮ কোটি মানুষের একটি সমগ্র জাতিকে অন্যায়ভাবে কলঙ্কিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে ওই পলাতক চক্রটি।
সোমবার নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী নেতাকে উৎখাতের পর এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতার মধ্যে একটি শহরের ধর্মীয় মৌলবাদীরা ঘোষণা দিয়েছে, তরুণীরা আর ফুটবল খেলতে পারবে না। আরেকটি শহরে এই মৌলবাদীরা এমন এক ব্যক্তিকে ছেড়ে দিতে পুলিশকে বাধ্য করেছে, যিনি হিজাব না পরায় প্রকাশ্যে এক নারীকে হেনস্তা করেছিলেন। পরে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ যখন গণতন্ত্র পুনর্নির্মাণ ও সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের জন্য নতুন এক ভবিষ্যৎ তৈরির চেষ্টা করছে, তখন দীর্ঘদিন ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইসলামি উগ্রপন্থিরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।’
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের করা প্রতিবেদনটির কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। বিবৃতিতে নিউইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনটি উদ্বেগজনক এবং বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিউইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধটি ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থা উত্থানের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি বাংলাদেশের ভুল চিত্র তুলে ধরেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বিভ্রান্তিকর এ চিত্রায়ণ কেবল দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতাকে অতি সরলীকৃত করে না বরং ১৮ কোটি মানুষের একটি সমগ্র জাতিকে অন্যায়ভাবে কলঙ্কিত করার ঝুঁকিও তৈরি করে। সুনির্দিষ্টভাবে উসকানিমূলক নিবন্ধের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বছর ধরে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি করেছে সেটাকে এবং পরিস্থিতির জটিলতাকে স্বীকার করা উচিত।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ধর্মীয় সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার বিদায়ের পর এবং তার পর থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত অনেক সংঘর্ষকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যদিও বাস্তবে এসব ঘটনা ঘটেছিল রাজনৈতিক কারণে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই সমর্থন জোগাড় করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। যা বিষয়টিকে জটিল করে তোলে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ধর্মীয় নিপীড়নের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। সুতরাং পুরো পরিস্থিতিকে সাম্প্রদায়িক সংঘাত হিসাবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। এটি প্রকৃত রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে।
প্রেস উইং জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য তার প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট করেছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সন্ত্রাসবাদ দমন প্রচেষ্টার সঙ্গে তার চলমান কাজ এই প্রতিশ্রুতিকে আরও জোরদার করে। সামাজিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়র সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে চরমপন্থা মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টা ভুল তথ্যের বিস্তারের দ্বারা ম্লান হওয়া উচিত নয়।
দেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের মতো কিছুই হয়নি জানিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, কোথায় কী বলা হলো সেটা সম্পর্কে আমি কোনো কমেন্ট করতে চাচ্ছি না। তবে বাংলাদেশে কোনো ধরনের জঙ্গিবাদের উত্থান হচ্ছে না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশে কোনো ধরনের জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেনি এবং আশঙ্কাও নেই। বুধবার দুপুরে ঈদের শুভেচ্ছা ও ঈদ পুনর্মিলনীর উদ্দেশ্যে রাজধানীর বিভিন্ন থানা পরিদর্শন শেষে বাড্ডা থানায় সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশে উগ্রপন্থিদের সুযোগ নেই জানিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, নিউইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদনে বলতে চাচ্ছে, শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার কারণে দেশে চরমপন্থা-উগ্রপন্থার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, এ সুযোগ কাউকে নিতে দেওয়া হবে না। বরং আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠার জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখব। বুধবার সকালে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার উত্তর রামপুর গ্রামে ছাত্র আন্দোলনে নিহত শহিদ মাসুম মিয়ার কবর জিয়ারত ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রকাশিত প্রতিবেদনের পেছনে পরাজিত শক্তি ও তাদের মদদদাতারা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। বুধবার রাজধানীর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, নানা ধরনের যে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে তার আরেকটি প্রমাণ হলো-‘বাংলাদেশে আবার ইসলামি উগ্রবাদের উত্থান’ ইত্যাদি বলে নিউইয়র্ক টাইমসের যে প্রতিবেদন। এর পেছনে নিশ্চয়ই কারা জড়িত বাংলাদেশের মানুষ জানে। আজকে যারা পরাজিত শক্তি এবং তাদের যারা মদদ দেয় তাদের যৌথ প্রচেষ্টা এটা।
তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশে বসবাস করি। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কেউ জানে না এখানে কোথায় উগ্রবাদের উত্থান হয়েছে? কোন এলাকায়? কোন মহল্লায়? কোন গ্রামে? এখানে যারা ধর্মপ্রাণ মানুষ তারা উপাসনালয়ে যাচ্ছে, মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডায় যাচ্ছে। ফ্যাসিবাদের কোনো ছোবল নেই, মানুষ নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন করছে। কথা বলতে পারছে।