Image description

ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সিলেট নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানের প্রায় সব বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে বিএনপির নেতা বন্দনা। প্রায় ১২৯টি বিলবোর্ডের মধ্যে তিনটি বিলবোর্ড কেবল ভাড়া নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতা ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাকি ১২৬টি বিলবোর্ড বিএনপির নেতাদের দখলে। এগুলোর কোনোটিই ভাড়া নেওয়া হয়নি বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছে থেকে। বরং বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিজ্ঞাপন ঢেকে সাঁটানো হয়েছে বিএনপি নেতার ঈদ শুভেচ্ছার ব্যানার। 

জানা যায়, সিলেট নগরীর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে প্রায় ১২৯টি বড় বড় বিলবোর্ড। এর মধ্যে শুধু সড়কে মাঝখানের বিভাজকে আছে ৫৪টি বিলবোর্ড। এই বিলবোর্ডগুলো বিজ্ঞাপনী সংস্থার নিকট বছরভিত্তিক ভাড়া দেয় সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক)। এসব বিলবোর্ড আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বছর মেয়াদ বা মৌসুম অনুযায়ী ভাড়া দেয় বিজ্ঞাপনী সংস্থা। বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক ও খণ্ডকালীন বিলবোর্ড ভাড়া নিয়ে বিজ্ঞাপন সাঁটায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বিলবোর্ডে এই বিজ্ঞাপনগুলোর ওপর রাজনৈতিক নেতাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে নানা প্রচারণা। ক্ষমতাসীন দল হলে ভাড়া নয়, ‘দখল’ করে চলে শুভেচ্ছা জানানোর হিড়িক। এই দখলবাজি চলে আসছে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে। 

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর আম্বরখানা, চৌহাট্টা, রিকাবিবাজার, বন্দরবাজার, শাহি ঈদগাহ, টিলাগড়, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রোড, সুবিদবাজার, ফাজিলচিস্ত, পাঠানটুলা, মদিনামার্কেট, কালীবাড়ি, চাঁদনিঘাট, শাহজালাল উপশহর, মেন্দিবাগসহ বিভিন্ন এলাকার বিলবোর্ড বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিজ্ঞাপন ঢেকে বিএনপির নেতাদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাদের কর্মীরা। সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরীর নামে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিলবোর্ড রয়েছে। এরমধ্যে আম্বরখানা, চৌহাট্টায়, মদিনামার্কেট এলাকায় কয়েকটি তোরণ ও বিলবোর্ড সরাসরি তার নামে রয়েছে। মদিনামার্কেট কালীবাড়ি এলাকায় বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নামে রয়েছে। এরমধ্যে একটি নিষিদ্ধঘোষিত মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাহেল সিরাজের আত্মীয়ের দেওয়া। এ ছাড়া নগরীজুড়ে রয়েছে মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী ও জেলা বিএনপির নেতাসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড শাখার বিএনপির সহযোগী সংগঠনের। নেতাদের বড় বড় ছবি দিয়ে এসব বিলবোর্ড দখলকারীদের বেশির ভাগই দলীয় পদপদবি বিহীন নেতা। ৫ আগস্টের পরই এসব নেতাদের আবির্ভাব হয়েছে। 

তবে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল এনসিপির তিনটি বিলবোর্ড। এই বিলবোর্ডগেুলো শোভা পাচ্ছে নগরীর শাহজালাল উপশহর, কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল ও বাইপাস এলাকায়। এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ বিলবোর্ডে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনটি বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, দেড়লাখ টাকায় ভাড়া নিয়ে এনসিপি নেতা বিলবোর্ড সাঁটিয়েছেন।

জানতে চাইলে এনসিপির সিলেটের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যরিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি আমার এলাকাকেন্দ্রিক ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছি। এ জন্য তিনটি বিলবোর্ড ভাড়ার দরদাম নির্ধারণ করে ভাড়ার টাকা পরিশোধ করে তারপর শুভেচ্ছা ব্যানার সাঁটিয়েছি। দখল নয়, বলে কয়ে হলেও করা যেত। কিন্তু আমি এই সুযোগ নেইনি।’

বিলবোর্ড সংশ্লিষ্ট সিসিক সূত্রে জানা গেছে গেছে, অতীতে পতিত সরকারি দল আওয়ামী লীগের দখলে প্রায় সব বিলবোর্ড থাকলেও এবার যেন আওয়ামী লীগের রূপে একচেটিয়াভাবে কেবল বিএনপিকে দেখা গেছে।

বিলবোর্ড দখলের ব্যাপারে বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা খবরের কাগজকে বলেন, এই দখলবাজি গত ১৫ বছর ধরে চলে আসছে। রাজনৈতিক কোনো সভা, বিভিন্ন দিবসে আমাদের বোর্ডগুলো দখল করে নেতারা নিজেদের ব্যানার সাঁটিয়ে দেন। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। যে নেতা বা তার কর্মীর যে এলাকায় সেই এলাকার বিলবোর্ড দখল করে তারা ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যানার সাঁটিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছ থেকে এই বিলবোর্ডগুলো ভাড়া নিয়েছে তাদের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে। যেমন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠান আমাদের বলছে এই ঈদে আমাদের প্রচার থাকার কথা বিলবোর্ডে। প্রয়োজনের সময় যদি আমরা আমাদের কাস্ট্রমারদের সেবা দিতে না পারি, এর দায় আমাদের নিতে হয়। 

দখল করা বিলবোর্ডে ঈদ শুভেচ্ছা কেন? এ বিষয়ে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে তার ঘনিষ্ঠজন সূত্রে জানা গেছে, সাবেক মেয়রের নামে বিলবোর্ডে শুভেচ্ছা জানানো ও তোরণ সিটি করপোরেশন থেকে করে দিয়েছে। তবে সিলেট সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞাপন শাখায় দায়িত্বরত গৌতম রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো ব্যক্তিবিশেষের নামে বিলবোর্ডে শুভেচ্ছা জানানো ও তোরণ নির্মাণ করে দেওয়ার সুযোগ নেই সিটি করপোরেশন থেকে। সাবেক মেয়রের তোরণ বা বিলবোর্ড আমরা করে দেইনি। 

আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি ব্যতিক্রম, পটপরিবর্তনের সুযোগে এ বিষয়টি বোঝানোর সুযোগ ছিল বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘অনেক বছর রাজনীতিতে কোণঠাসা ছিল বিএনপি। পতিত সরকারের চেয়ে তারা যে ব্যতিক্রম এখন এটা বোঝানোর সুযোগ ছিল। এতে জনগণের কাছেও ইতিবাচক সাড়া পেত বিএনপি। কিন্তু এই ঈদ শুভেচ্ছা বিলবোর্ড দখলে দেখা যাচ্ছে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও একই পথে হাঁটছেন। তারা মনে হয় আওয়ামী সরকারের এই পতন থেকেও কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেননি।’