Image description

রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ‘অলংকার নিকেতন’ জুয়েলার্সের মালিক এম এ হান্নান আজাদের বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ২৬ মার্চ ভোরে ২০-২৫ জনের একটি ডাকাতদল র‌্যাব, ম্যাজিস্ট্রেট ও ছাত্র পরিচয়ে অভিযানের কথা বলে ওই বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তারা ভবন মালিক এম এ হান্নান আজাদের বাসা এবং ওই ভবনে অবস্থিত একটি অফিস থেকে স্বর্ণালংকারসহ বিপুল পরিমাণ টাকা লুটে নেয়।

ডাকাতির ঘটনায় তদন্তকারীরা জানান, ধানমণ্ডির ডাকাতিটি ছিল পরিকল্পিত।

 
কারণ অপরাধীরা নিজেদের র‍্যাব সদস্য, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, তথ্য কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট এবং এমনকি ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। ডাকাতদের লক্ষ্য ছিল একটি বড় সোনার চালান এবং টাকা লুট করা। তাদের বিশ্বাস ছিল যে ধানমণ্ডির ওই ভবনের মালিক এম এ হান্নানের কাছে বিপুল সোনা ও টাকা গোপনে রাখা ছিল।

 

ছয়তলা বাড়িটির পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা ডুপ্লেক্স করে থাকেন মালিক এম এ হান্নান আজাদ।

 
তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ‘এস এম সোর্সিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস। দ্বিতীয় তলাও ভাড়া দেওয়া। ওই ভবনে ডাকাতির ঘটনায় ধানমণ্ডি থানায় বাদী হয়ে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী এম এ হান্নান আজাদের ভাগ্নে তৌহিদুল ইসলাম লিমন।

 

তৌহিদুল ইসলাম লিমন বলেন, ‘অলংকার নিকেতন জুয়েলার্সের মালিক আমার মামা এম এ হান্নান আজাদ।

 
তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আমি ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। ধানমণ্ডির ৮ নম্বর রোডের ছয়তলা বাড়িটিতে ২৬ মার্চ ভোর ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে তিনটি মাইক্রোবাস এবং একটি প্রাইভেট কারযোগে ডাকাতরা দলবদ্ধভাবে বাসার সামনে আসে। তারা এসে সিকিউরিটি গার্ডদের বলে, আমরা র‌্যাবের লোক, আমাদের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছে, এই বাড়িতে অভিযান চালানো হবে, তাড়াতাড়ি গেট খোলেন। এ সময় ডাকাতদের কয়েকজনের গায়ে র‌্যাবের কটি পরা ছিল।’

 

তিনি বলেন, তখন সিকিউরিটি গার্ড তাদের সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন।

 
কিন্তু ডাকাতরা সিকিউরিটি গার্ডদের গালাগালি করতে থাকে এবং গেট না খুললে তাদের হত্যার হুমকি দেয়। তাদের মধ্যে একজন ওপর দিয়ে উঠে জোর করে গেট খুলে ফেলে। এরপর ডাকাতরা একযোগে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে সিকিউরিটি গার্ড, কেয়ারটেকার শেখ রিয়াজুল ইসলাম, গাড়িচালক বিজয় মিয়াকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। এরপর ডাকাতদল চতুর্থ তলায় এস এম সোর্সিংয়ের গেট ভেঙে পিয়ন দেলোয়ারকে মারধর করে মালিক কত তলায় থাকেন তা জানতে চায়। ডাকাতরা হত্যার ভয় দেখিয়ে দেলোয়ারের কাছে থাকা ৪৫ হাজার ১০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়।

 

এরপর তৃতীয় তলায় গিয়ে ডাকাতরা এস এম সোর্সিং অফিসের পিয়নদের মারধর করে চাবি ছিনিয়ে নেয়। অফিসের ড্রয়ার ভেঙে ২২ লাখ টাকা লুট করে নেয়। ডাকাতদের আরেকটি দল একই অফিসের চতুর্থ তলায় গিয়ে আলমারি ভেঙে আরো ১৩ লাখ টাকা লুট করে নেয়। সর্বশেষ অলংকার নিকেতন জুয়েলার্সের মালিক এম এ হান্নান আজাদের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। সেখানে আলমারি ভেঙে নগদ দেড় লাখ টাকা, সোনার দুল ও চেইনসহ প্রায় আড়াই ভরি অলংকার লুট করে নেয়।

ডাকাতির ঘটনায় যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হলেন- গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ফরহাদ বিন মোশারফ (৩৩), লক্ষ্মীপুরের ইয়াছিন হাসান (২২), নরসিংদীর মোবাশ্বের আহম্মেদ (২৩) ও নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারের ওয়াকিল মাহমুদ (২৬)। তাদের কাছ থেকে স্ক্রু ড্রাইভার, স্লাই রেঞ্জ, দুটি কালো রঙের র‌্যাবের কটিসদৃশ জ্যাকেট, নগদ ৪৫ হাজার টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে কয়েকজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- মো. ইব্রাহিম (৩২), আব্দুল্লাহ, ম্যাজিস্ট্রেট ও র‌্যাবের ডিআইজি পরিচয় দেওয়া জুসান আমিম, জুসানের কথিত বড় ভাই সফিকুল, জুসানের সহযোগী বাবু, ওমায়েদ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া আতিক ও আহসান। বাকিদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি, তারাও পলাতক।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত আগস্টে অলংকার নিকেতন থেকে একটি বড় পরিমাণ সোনার গহনা চুরি হয়েছিল, যার জন্য তেজগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

তদন্তকারীরা বলেছেন, তারা এই ডাকাতির সঙ্গে আগের চুরির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা, কিংবা দোকানের কোনো কর্মচারী এর সঙ্গে জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ধানমণ্ডি জোনের সহকারী কমিশনার শাহ মোস্তাফা তরিকুজ্জামান বলেন, প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী ছিল ৪-৫ জন সন্দেহভাজন। গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েছে, যার সত্যতা পুলিশ যাচাই করছে।

গ্রেপ্তার হওয়া ওয়াকিল তদন্তকারীদের বলেছেন, তিনি এবং আরেক সন্দেহভাজন ধানমণ্ডিতে একটি রেস্তোরাঁয় সেহরি খেতে গিয়েছিলেন, তখন এক পূর্বপরিচিত তাদের ছাত্রপ্রতিনিধিদের পরিচয়ে অভিযানে যোগ দিতে বলেছিল।

তিনি আরো জানান, পুলিশ তাদের দাবির সত্যতা যাচাই করছে।

তদন্তকারীদের মতে, প্রথমে ডাকাতরা পরিকল্পনা করেছিল বড় পরিমাণ সোনা ও টাকা লুট করার। কিন্তু তারা প্রত্যাশিত পরিমাণ সোনা না পেয়ে, এস এম সোর্সিং নামে একটি বায়িং হাউসের অফিস ভাঙচুর করে এবং সেখান থেকে ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে যায়। যেহেতু তাদের চাহিদা মতো পর্যাপ্ত টাকা তারা পায়নি, তাই হান্নানকে অপহরণ করার পরিকল্পনা করে। তারা হান্নানকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করতে চেয়েছিল। তবে, স্থানীয়রা এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

এ সময় ছয়জন নিরাপত্তাকর্মী, যাদের মধ্যে কিছু নির্মাণাধীন ভবনের নিরাপত্তা প্রহরী ছিল, তাদের সহায়তায় পুলিশ চার সন্দেহভাজনকে আটক করতে সক্ষম হয়। 

 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তাদেরকে ৫,০০০ টাকা পুরস্কার দিয়েছে এবং তাদের পুলিশ বাহিনীর সহায়ক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পুরস্কৃতরা হলেন— স্বপন ভুঁইয়া (২৫), বিজয় (৪০), রিয়াজুল ইসলাম (৩৪), দেলওয়ার হোসেন (২০), সিয়াম (১৮), এবং টনি (২০)।