
বাতিল হচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশনের পুলিশ প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ স্থাপনের বিতর্কিত নীতিমালা। আগের কমিশনের অপরাধের দায় এড়াতে এ এম এম নাসির উদ্দিন কমিশন বিতর্কিত এই অংশটি বাদ দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ স্থাপন নীতিমালা অতীতে কীভাবে প্রণয়ন করা হয়েছিল তার একটি তুলনামূলক খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। নীতিমালায় বিতর্কিত কিছু থাকলে কমিশন চাইলে তা বাদ দিতে পারেন। কেননা নির্বাচনের কাজে কাউকে সুবিধা দিতে কিছু প্রণয়ন করা হলে কিংবা সর্বজনীন না হলে সেটি পরিবর্তন করা উচিত। সেটাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভোটকেন্দ্র স্থাপন নীতিমালা নিয়ে নিবিড় পর্যালোচনা করছে ইসি। সেখানে বিগত নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদের আগ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো তারা খতিয়ে দেখেন। নীতিমালা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সব কমিশনই ভোটকেন্দ্র স্থাপন নীতিমালায় কিছু কিছু সংযোজন-বিয়োজন করেছেন।
তবে সবচেয়ে বিতর্কিত ধারা যুক্ত করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পদত্যাগী কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বে হওয়া কমিশন। সেখানে আগের নীতিমালা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ বাদ দেওয়া এবং বিতর্কিত কিছু বিষয় সংযোজন করা হয়।
কয়েকটি সংসদের নীতিমালা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৮ সালে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর বিধান অনুসারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের ধার্য করা সময়সূচি অনুসারে ভোটকেন্দ্রের স্থান নির্ধারণ এবং কেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা সরকারি গেজেটে প্রকাশ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত।
নবম সংসদে সেটি হুবহু ঠিক রেখে শুধু ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৮ অনুচ্ছেদ’ এ অংশটুকু যোগ করা হয়। পরের সংসদে আগের অংশ ঠিক রেখে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে সর্বোত্তম স্থানে কেন্দ্র স্থাপন অত্যাবশ্যক। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দলের প্রভাবহীন ও ভোটারদের ভোটদানের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রের স্থান নির্ধারণের পর সুষ্ঠু নির্বাচন বহুলাংশে নির্ভরশীল এই অংশ যুক্ত করেন।
নবম সংসদে নীতিমালার ১০ ধারায় ‘ভোটকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে সহকারী রেজিস্ট্রেশন অফিসাররা ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের সময় প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন। কাজেই তাদের সে সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা স্বাভাবিক এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভোটকেন্দ্র স্থাপনের উপযোগী পাবলিক বিল্ডিং ও ভবন সম্পর্কে জানা তাদের পক্ষে সম্ভব। তাই ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রণয়নে প্রয়োজনবোধে তাদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।’ হাবিবুল আউয়ালসহ পরবর্তী সব কমিশন এই অংশটি বাদ দেন।
একইভাবে নীতিমালায় নবম সংসদে ২৩ ও দশম সংসদে ২২ ধারার ‘ভোটকেন্দ্রের স্থান নির্ধারণে ইসির নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক ভাবমূর্তির প্রতি অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে। কমিশনের নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি কোনোমতেই যেন বিন্দুমাত্র প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়, সে বিষয়ে যত্নবান হতে হবে।’ কে এম নুরুল হুদার মতো পদত্যাগী আউয়াল কমিশনও এ অংশটি পুরোপুরি বাদ দেয়। বরং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ভোটকেন্দ্র স্থাপনের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে যুক্ত করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়ে যান তৎকালীন ইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল।
নীতিমালার ৪ ধারায় মহানগর, জেলা, উপজেলা ও থানাতে ভোটকেন্দ্র স্থাপনে কমিটি গঠন করা। সেখানে উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, জেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসাররা তার আওতাধীন উপজেলা, জেলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত অবস্থা, কক্ষের সংখ্যা, স্থাপনার অবস্থান বা যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত থাকেন।
অন্যদিকে পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য স্থাপনার যাতায়াত ব্যবস্থা ও সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকেন। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকার ও ইসির নানা কার্যক্রমে মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন। তাই উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে সেসব অফিসারের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে, তাদের মতামতের ভিত্তিতে ভোটকেন্দ্র স্থাপন কার্যক্রম অধিকতর সহজ ও সুষ্ঠু হবে।
আর ৪-এর ১ ধারায় ‘উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব রাখা হয় শুধু কমিটির সভায় খসড়া ভোটকেন্দ্রের তালিকা উপস্থাপন করা এবং সংশ্লিষ্ট ডিসি ও এসপিদের মতামত গ্রহণ করা।’ এ ছাড়া খসড়া তালিকা চূড়ান্ত করার আগে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা ডিসির নেতৃত্বে কমিটি ও উপজেলায় ইউএনওর তত্ত্বাবধান কমিটির কাছে পাঠাবেন। তারা যে কেন্দ্র চূড়ান্ত করবেন সেটিই গেজেটে প্রকাশ করা হবে, এ ধরনের বিতর্কিত ধারা যুক্ত করা হয়।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আমার দেশকে জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ কমিশনের কর্মকর্তারা তাদের কাজের ধারাবাহিকতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে করে এসেছেন। কিন্তু হঠাৎ বিগত কমিশন সেখানে পুলিশ প্রশাসনকে যুক্ত করে ইসির করণীয় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করেন। আমরা কারো বিতর্কিত সিদ্ধান্তের দায় নেব না। তাই দ্বাদশ সংসদে বিতর্কিত অংশগুলো বাদ দেওয়া হতে পারে।
বিগত তিনটি কমিশন নিরপেক্ষ ছিল না মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, ভোটকেন্দ্র স্থাপনে বিতর্কিত নীতিমালা প্রণয়ন করে যে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের এমপিদের ভোট কাটতে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল, তা অবিলম্বে পরিবর্তন আনা দরকার। এ কাজগুলো নিরপেক্ষতার সঙ্গে করা উচিত। এর মাধ্যমে নির্বাচনটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে।