
সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। কর্মীদের কাজের বেলায় ষোল আনা হলেও বেতনের বেলায় সামান্য। কারণ আউটসোসিংয়ে কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করেন তার ঠিকাদার। ঠিকাদার যেভাবে বলেন তাকে সেভাবে কাজ করতে হয়। ঠিকাদাররা সরকার থেকে বেশি টাকা নিলেও কর্মীদের বেতন দেন ইচ্ছেমতো। পান থেকে চুন খসলেই কেটে নেন বেতনের অংশের টাকা। এতে করে কর্মীরা সবসময়ই ক্ষতির মুখোমুখি হন। থাকে চাকরি হারানোর ভয়। এভাবে বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা ঠিকাদারের পেটে চলে যায়। প্রায় প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজ করেও মিলে না অতিরিক্ত পারিশ্রমিক। দেওয়া হয় না নিয়মিত বেতনও। তাই আউটসোসিং পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ একটি অভিশপ্ত পদ্ধতি বলে অভিহিত করেন কর্মীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন চাকরিজীবী জানান, সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠানে সরকারি বিধি মোতাবেক সকল নিয়ম নীতি মেনে কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে আবার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলো আবার সরকারের রাজস্ব খাতে নেয়া হয়েছে। অনেক প্রকল্প দীর্ঘদিন পরিচালিত হলেও আওয়ামী লীগ সরকার রাজস্ব খাতে নেয়নি। আশ্বাস দিয়ে দিয়ে দীর্ঘদিন পার করেছে। অনেকে আশ্বাসে বিশ্বাস করে চাকরি করেছেন বছরের পর বছর। কিন্তু এখন দেখছেন সেই প্রকল্পের অনেকগুলোকে আওয়ামী লীগের দোসররা আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে ঠিকাদারের হাতে তুলে দিচ্ছেন। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য লাখো মানুষের জীবিকা নিয়ে তামাশা করছেন বলে অভিযোগ করেন চাকরিজীবীরা। তারা বলছেন, এতো দিন চাকরি করার পর আমাদের প্রকল্প রাজস্ব খাতে নেয়ার কথা, তা না করে ঠিকাদারের হতে তুলে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে এখন আবার নতুন করে আউটসোসিং পদ্ধতি চালু করার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পগুলোকে অকার্যকর করার চেষ্ঠা করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো কর্মীই আউটসোসিং পদ্ধতিতে চাকরি করতে চান না। তারা চান তাদের কাজের স্বীকৃতি। রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করতে চান। আর তাদের কষ্টের উপার্জিত টাকায় যেন কেউ ভাগ না বসায় সেই নিশ্চয়তা তারা চান। তারা বলছেন, আউটসোসিংয়ের ষড়যন্ত্র বন্ধ করে আমাদের চাকরি সরাসরি রাজস্ব খাতে নেয়ার ব্যবস্থা করা হোক।
আউটসোসিং কর্মীরা অনেকেই বলছেন, চাকরিতে প্রবেশের পর তাদের ব্যাংক হিসাবে সরকার নির্ধারিত বেতন ঢুকলেও পরদিনই সে বেতনের চুক্তির অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান চেকবই তাদের নিজেদের কাছে রেখে দেয়। ফাঁকা চেকবইয়ে কর্মচারীদের স্বাক্ষর নিয়ে টাকা উত্তোলন করে দেয় নির্ধারিত বেতনের কম টাকা। বাকিটা গিলে খাচ্ছে এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এমনকি চাকরি প্রত্যাশীদের আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় নিয়োগের সময়ও নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা।
এদিকে, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পটি কোরআন শিক্ষার প্রকল্পটি ধ্বংস করতে আউটসোর্সিং করা হয়েছে অথচ হিন্দুদের মন্দিরভিক্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পটি আউটসোসিং করা হয়নি। এ কেমন বৈষম্য। এ নিয়ে আলেম ওলামাদের মধ্যে অসন্তোষ বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদে প্রকল্পটির জনবলকে আউটসোর্সিং বাতিল করে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করার জন্য মানববন্ধন করছেন মসজিদ শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষ- কেয়ারটেকার ঐক্য পরিষদ। গত রোববার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররাম উত্তর গেইটের সামনে মানববন্ধন করেন তারা।
মানববন্ধনে নেতৃবৃন্দ ইফার মসজিদভিক্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের জনবলকে রাজস্বখাতে স্থানান্তর, কর্মী-কেয়ারটেকারদের স্কেলভিত্তিক বেতন প্রদান ও শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধিসহ আউটসোর্সিং ব্যতিরেকে প্রকল্পটি ঈদের পূর্বেই অনুমোদনপূর্বক বকেয়াসহ বেতন-বোনাস প্রদানের জোর দাবি জানান।
ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসাইন বলেছেন, মসজিদভিক্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পটি অর্থ মন্ত্রণালয় আউটসোর্সিং করেছে। আমার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ জানাই। আমি প্রধান উপদেষ্টার সাথে কথা বলেছি। মসজিদভিক্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পটি আউটসোর্সিং থাকবে না। দ্রুত সমাধান হবে।
সূত্রমতে, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পটি ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু হয়ে ৭ম পর্যায় পর্যন্ত অত্যন্ত সফলতা ও সুনামের সাথে সারা দেশব্যাপী ৭৩৭৬৮টি শিক্ষা কেন্দ্র ও ২,০৫০টি রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েও বর্তমানে এর কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতার গণআন্দোলনের মাধ্যমে বৈষম্যের শিকার হওয়া চাকরিজীবী ও জনতার উপর জগদ্বল পাথরের মতো চেপে বসা বৈষম্যের অবসান হতে শুরু হয়েছে। তারা আরো জানান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ প্রকল্পটি জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে সাড়া দেশের মসজিদ অবকাঠামো ব্যবহার করে দারিদ্র্য, সুবিধা বঞ্চিত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদেরকে বিনামূল্যে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ, কিশোর-কিশোরী ও বয়স্কদের পবিত্র কুরআন শিক্ষা, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা দান করে আসছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, আলেম ওলামা ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত বেকার নারী ও পুরুষের দারিদ্র্যতা দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়াও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্প আউটসোর্সিংয়ে নেয়ার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের শিক্ষক কেয়ারটেকার ঐক্য পরিষদ। এতে অংশ নেন প্রকল্পটির নারী ও পুরুষ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এসব প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে প্রান্তিক পর্যায়ে কোরআন শিক্ষা, বাল্যবিবাহ, সন্ত্রাসবাদ এবং সকল হিংসাত্মক কর্মকা- প্রতিরোধে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পে ইসলামিক স্কলাররা কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদিরা প্রকল্পটি আউটসোর্সিংয়ে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের এক লাখ আলেম-ওলামাকে সরকারের বিপক্ষে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। এসময় অবিলম্বে সিদ্ধান্তটি বাতিল এবং ঈদের আগে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবি জানানো হয়। সেইসাথে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় থাকার ঘোষণাও দিয়েছেন মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা। পরে তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করেন।