
জুলাই বিপ্লবে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সফল করতে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই গাজীপুর থেকে ঢাকার উত্তরায় আসে কিশোর রাহাত হোসেন শরীফ। সেখানে এসে দেখে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে উত্তরার সড়ক-মহাসড়ক। সেখানে সড়কে পড়ে থাকা আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার গুলিবিদ্ধ লাশ ও আহতদের সরিয়ে নিয়ে পাঠায় হাসপাতালে। হেলিকপ্টার থেকে র্যাব সদস্যরা তা দেখে তাকে গুলি করে হত্যা করে তাকে। তার মা স্বপ্না সন্তানের মৃত্যুর খবর শোনার পর শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন।
ঘটনাস্থলে রাহাতের সঙ্গে থাকা বন্ধু শাহরিয়ার নাফিস বলে, পুলিশ ও ছাত্রলীগের বাধা এড়িয়ে উত্তরা বিএনএস সেন্টারে পৌঁছে একদিকে ‘অপারেশন ক্লিনডাউন’-এ থাকা হেলিকপ্টার থেকে হামলা, অন্যদিকে পুলিশ-বিজিবি-র্যাবের ভয়াবহ গুলিবর্ষণের দৃশ্য দেখতে পাই। এ ছাড়াও বিভিন্ন ভবনের ছাদ ও শাখা সড়ক থেকে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে হামলাও চলছিল। এ সময় আমাদের পাশে থাকা এক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হন। রক্ত এসে পড়ে আমাদের গায়ে।
নাফিস আরো বলে, সামনে এগিয়ে যেতেই কয়েকজনের গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখি। তখন দৌড়ে গিয়ে পেটে গুলিবিদ্ধ একজনকে নিয়ে আসি। আমাদের দেখে সঙ্গী হন কয়েকজন। এভাবে গুলিবিদ্ধ কয়েকজনকে এনে হাসপাতালে পাঠাই আমরা। এদের মধ্যে কেউ তখনো বেঁচে ছিলেন আর কেউ কেউ ঘটনাস্থলেই শাহাদতবরণ করেছেন। এ সময় রাহাত বলে, ‘মরলে মরমু, দেশের জন্য শহীদ হমু।’
আমরা ততক্ষণে হয়তো চোখে পড়ে যাই র্যাবেরÑ এমন ধারণা নাফিসের। সে বলল, গুলিবিদ্ধ লাশ ও ক্ষতবিক্ষত দেহ সরিয়ে আনার বিষয়টি হয়তো নজরে পড়েছিল হেলিকপ্টারে থাকা র্যাবের। হেলিকপ্টারে বন্দুক হাতে র্যাবকে দেখেছি আমি। রাহাত পাশেই র্যাবের পোড়া গাড়ির ভাঙা দরজা খোলার চেষ্টা করছিল ঢাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য। উদ্দেশ্য সামনে গিয়ে গুলিবিদ্ধদের নিয়ে আসা। ততক্ষণে সন্ধ্যা ৬টা বেজে গেছে। তার সামনেই ছিলাম আমি। এমন সময়ই উপর থেকে টিয়ার শেল পড়ে আমার পায়ে। একটু সরে নিচে বসতেই উপরে থাকা হেলিকপ্টার থেকে কয়েকটি গুলির শব্দ পাই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দেখলাম মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রাহাত। মাথায় লাগা গুলিতেই শাহাদতবরণ করে সে। গুলিবিদ্ধ রাহাতকে প্রথমে ক্রিসেন্ট ও পরে উত্তরা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মাত্র চারদিন আগে ১৪ জুলাই নওয়াব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া রাহাতের শহীদ হওয়ার খবর তখনো জানেন না তার গার্মেন্টকর্মী মা স্বপ্না। ডিউটি শেষ করে বাসায় এসে রাহাতকে খুঁজছিলেন আশপাশে। কিছুক্ষণ পরই জানতে পারেন তার একমাত্র ছেলে মাথায় আঘাত পেয়েছে, তাকে দ্রুত মেডিকেলে যেতে হবে। কিন্তু যাওয়ার কোনো উপায় নেই। রাহাতের বাবা সেলিম সৌদি প্রবাসী। বাসায় স্বপ্নার বৃদ্ধা মা ছাড়া আর কেউ নেই, যাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবেন। তাই এক নিকটাত্মীয়কে পাঠালেন উত্তরা জেনারেল হাসপাতালে।
তবে এলাকার মানুষের মুখে মুখে শুনেছেন রাহাত গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছে। কিন্তু স্বপ্না সে কথা বিশ্বাস করছিলেন না। কারণ দুপুরেই একসঙ্গে খাবার খেয়েছেন তারা। তিনি অপেক্ষা করছিলেন ছেলের ফেরার জন্য। কিছুক্ষণ পরই রাহাতের লাশ এলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একমাত্র সন্তান হারানোর শোকে পাথর হয়ে যান তিনি। জার্মানিতে গিয়ে মায়ের কষ্ট লাঘবে কিশোর রাহাতের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল।
স্বপ্না জানান, শেষ রাতেই তার সন্তান তাকে দিয়েছিল শহীদ হওয়ার বার্তা। কিন্তু তিনি তখন বুঝে উঠতে পারেননি। বুঝলে ছেলেকে ঘরেই রাখতেন অথবা নিজেও সঙ্গে থাকতেন।
রাহাতের খুনিদের ফাঁসি দাবি করে স্বপ্না বলেন, হাসিনা পালিয়েছে, কিন্তু যারা গুলি করেছে ওরা তো পালায়নি। ফুটেজ দেখে দ্রুত সবাইকে আটক করতে হবে। যারা গুলি ছুড়েছে তাদের ফাঁসি দিতে হবে।