Image description
 

ছিলেন একজন কম্পিউটার অপারেটর। ১৭ বছর আগে এই পদে নিয়োগ পান। এর দুবছর পর কৌশলে ভাগিয়ে নেন কথিত ক্যাশিয়ারের পদ। বর্তমানে দুই পদেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে একটি পদে টানা ১৭ বছর এবং আরেক পদে টানা ১৫ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি চাকরিবিধি অনুসারে সাধারণত তিন বছরের বেশি সময় একই কর্মস্থলে থাকার কথা না থাকলেও তিনি ‘অদৃশ্য ক্ষমতাবলে’ প্রায় দেড় যুগ একই অফিসে কর্মরত। বলছিলাম কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মচারী এসএম আসাদুজ্জামানের কথা।

 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আসাদুজ্জামান ঢাকার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাসিক মাসোহারা দিয়ে দুই পদে টানা ১৭ বছর ধরে বহাল আছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

 

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর পাঠানো এক লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, একজন তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারী হয়েও এসএম আসাদুজ্জামান বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের তালিকায় রয়েছে ঢাকায় তিনটি ফ্ল্যাট, টাঙ্গাইলে পাঁচতলা বাড়ি ও ১৫ তলা নির্মাণাধীন ভবন, ঢাকায় পাঁচটি প্লট, কক্সবাজারে চারতলা বাড়ি, গাজীপুরে ২৪ একর জমিতে কটেজ, টাঙ্গাইলে ৯২ বিঘা জমি ও বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল অর্থ। এছাড়া কক্সবাজারে শেয়ারে হোটেল ও রেস্টুরেন্টের মালিকানা রয়েছে তার।

 

সূত্র জানায়, আসাদুজ্জামান মাসে ৪ থেকে ৫ বার বিমানযোগে ঢাকা যাতায়াত করেন। তৃতীয় শ্রেণির একজন সাধারণ কর্মচারীর জন্য এই ভ্রমণ অস্বাভাবিক বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

 

অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মচারীর সঙ্গে ছিল আওয়ামী লীগের পতিত সরকারের সাবেক মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম ও কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের ঘনিষ্ঠতা। তাদের আস্থাভাজন হয়ে এসএম আসাদুজ্জামান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটও গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের মালিক।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যামামলা, ঘুস, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও অনিয়মের একাধিক অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানা ও আদালতে পৃথক দুটি মামলাও রয়েছে।

 

সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলার পিইডিপি-৪ প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ (কনসালট্যান্ট) মো. ফরিদ হাসানের নামে আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। একই অভিযোগের অনুলিপি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সচিবসহ বিভিন্ন দপ্তরের ১২ কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে। যদিও মো. ফরিদ হাসান এই অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তার দাবি, তার নাম দিয়ে অন্য কেউ এই অভিযোগ করতে পারেন। তবে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, ক্যাশিয়ার এসএম আসাদুজ্জামান তাকে ‘ম্যানেজ’ করায় এখন ফরিদ হাসান অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করছেন।

 

ওই লিখিত অভিযোগমতে, আসাদুজ্জামান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঠিকাদারি কাজ নিজের দখলে রেখেছেন এবং প্রতিটি বিল থেকে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১ থেকে ২ শতাংশ কমিশন আদায় করেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট রাখতে নিয়মিত ঘুস, উপহার ও কক্সবাজার থেকে কাঁচা মাছ এবং শুঁটকি উপটৌকন হিসেবে পাঠান।

সূত্রমতে, নিজের কর্মস্থলের এক অফিস সহায়কের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কেরও অভিযোগ উঠেছে তার। এছাড়া সরকারি অর্থ অপচয় করে অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মচারীকে মাসিক বেতন দিয়ে কর্মরত রাখা হয়েছে। এছাড়া সরকারি অফিস নিজের খুশিমতো রাতের পার্টিসহ বিভিন্ন আয়োজনে ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

ভাঙাড়ি শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা

 

২০২৩ সালের ২ এপ্রিল রাতে চুরির অপবাদ দিয়ে কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কম্পাউন্ডের ভেতর বেঁধে রাখা হয় লালমনিরহাটের মোগলাহাট ইউনিয়নের ফুলগাছ গ্রামের মাহির উদ্দিনের ছেলে মমিনুল ইসলামকে। তিনি কক্সবাজার শহরে ভাঙাড়ি শ্রমিকের কাজ করতেন। পরে সেখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তাপ্রহরীসহ বেশ কজন মিলে তাকে রাতভর মারধর করে। পরদিন সকালে মুমূর্ষু অবস্থায় মমিনুলকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। পরে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মমিনুল।

 

পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের নায়ক ছিলেন কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ক্যাশিয়ার এসএম আসাদুজ্জামান। তার নির্দেশেই সেদিন রাতে মমিনুলকে পেটানো হয়। এছাড়া ওই হত্যাকাণ্ডে টার্ন বিল্ডার্সের কর্মকর্তা নাহিদ ও সাদ্দামসহ জনস্বাস্থ্যের আরও কজনের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু আসাদুজ্জামান মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তদন্ত ও মামলার অগ্রগতি থামিয়ে দেন।

 

ভাই আমিনুল ইসলামের অভিযোগ, পুলিশ শুরু থেকেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় ছিল। কারণ, এক ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার পরিচয় পাওয়া সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশ দাফন করে পুলিশ। দাফনের পর মামলা করা হয়েছে শুধু নিরাপত্তাপ্রহরী মিজানুর রহমানকে আসামি করে। কিন্তু ঘটনায় আরও অনেকে জড়িত ছিল।

 

জানতে চাইলে কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইবনে মায়াজ প্রামাণিক বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেখবেন।’

 

অন্যদিকে এসএম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সব অভিযোগ পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ এছাড়া কক্সবাজার কিংবা অন্য কোথাও নিজের কোনো সম্পদ নেই বলেও দাবি আসাদুজ্জামানের।

 

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ফজলুর রহমান বলেন, ‘এক ব্যক্তি দুই পদে থাকতে পারেন না। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’