Image description

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন স্বাস্থ্যকে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখার প্রস্তাব দেওয়ার কথা ভাবছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের স্বাস্থ্যের সকল পর্যায়ের সেবা নিশ্চিতে বরাদ্দ ও ব্যয়ের সমন্বয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন। স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়কে জনকল্যাণমূলক ও অলাভজনক হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য নিয়ে তা নিরীক্ষার কাজ করছে ১২ সদস্যের এই কমিশন। আগামী মাসে সরকারের কাছে সংস্কার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

কমিশনকে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বেঁধে দেওয়া ৯০ দিনের সময় শেষ হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারির শুরুতে সরকারকে লেখা কমিশনের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সময়সীমা মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

কমিশনের অন্তত তিনজন সদস্য আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অংশের পুরোনো কাঠামো ভেঙে সংস্কার করা ও কিছু কাঠামো বহাল রেখে ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেওয়া হবে।

কমিশন ইতিমধ্যে সারা দেশে বিভাগীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ, জেলা-উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সেবা গ্রহণকারী, ঔষধশিল্প, বেসরকারি মেডিকেল কলেজসহ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। মাঠপর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন সমাধানের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা চলছে। কমিশনের প্রধান জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেছেন, আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে তাঁরা প্রতিবেদন দেবেন। সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে।

জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্ব

স্বাস্থ্যকে জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে কমিশনে আলোচনা চলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন সদস্য বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরকার বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভাগকে কাজে লাগাচ্ছে। সেখান থেকে অর্থনৈতিক প্রাপ্তি আশা করছে না। স্বাস্থ্যসেবাকেও তেমনি জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্ব দেওয়া যায় কি না কমিশন সে প্রস্তাব দিতে পারে।

কমিশনের একজন সদস্য বলেন, ‘স্বাস্থ্য একটা জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু। সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য ব্যয় করা অর্থে রাষ্ট্র নিরাপত্তা ছাড়া কোনো প্রত্যাশা রাখে না। তেমনি স্বাস্থ্যের বিনিয়োগ হবে প্রত্যাশা ছাড়া। এসবের মধ্যে রয়েছে ওষুধ, মেডিকেল ডিভাইসসহ বিভিন্ন বিষয়।’

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর উৎপাদিত ওষুধে স্থানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ হয়। তবে ওষুধের কাঁচামালের (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট–এপিআই) ৯০ শতাংশের বেশি আসে ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। ফলে দেশ ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণ তা বলার যৌক্তিকতা কতটা সে বিষয়ে আলোচনা করছে কমিশন।

আলোচনায় উঠে এসেছে, স্বাস্থ্যকে জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্ব দিলে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনেও সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখবে। জরুরি টিকা নিজেরা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব বাড়বে। যেসব দেশ থেকে ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করা হয়, তারা রপ্তানি বন্ধ করে দিলে দেশে উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাবে। মুমূর্ষু রোগীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় মেডিকেল অক্সিজেনের সিংহভাগই আমদানি করা হয়। বহু ওষুধ, টিকা ও মেডিকেল ডিভাইস আসে চীন, ভারতসহ বিদেশ থেকে। কোনো বিশেষ কারণে জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি বন্ধ হলে রোগীরা মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়বে। কমিশন মনে করছে, কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় সফটওয়্যারটি পরিচালিত হচ্ছে নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পের মাধ্যমে। এ ধরনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে বিদেশনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে কমিশনের কাছে।

আইনি বাধ্যবাধকতায় নজর

কমিশনের একজন সদস্য বলেছেন, সংবিধানে স্বাস্থ্যকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের ভূমিকা রয়ে গেছে পরোক্ষ। স্বাস্থ্যকে সংবিধান কর্তৃক সংরক্ষিত অধিকার করা হলে রাষ্ট্রকে এতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে কমিশনের আলোচনা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ওই সদস্য বলেন, বর্তমানে সংবিধানে স্বাস্থ্যের স্বীকৃতি যে রূপে রয়েছে তাতে কোনো নাগরিক চিকিৎসা না পেলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারবে না। এ ছাড়া কোনো আর্থিক লাভের আশা না রেখে স্বাস্থ্যে বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।

স্বাস্থ্যে বরাদ্দ নিতান্ত অপ্রতুল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সেবাগ্রহীতার নিজের পকেট থেকে যেতে পারে। আর স্বাস্থ্যের জন্য সরকারের ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ থেকে ৬ শতাংশ হতে হবে। সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগেরই হিসাবে দেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে রোগীর নিজস্ব ব্যয় ৬৯ শতাংশ। বেসরকারি সংস্থার হিসাবে এই ব্যয় আরও বেশি। আর সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ ৫ দশমিক ২ শতাংশ। এই বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ডব্লিউএইচওর দেওয়া সর্বশেষ হিসাব বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় ছিল জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

কমিশনের সদস্যরা বলছেন, পুরো ব্যয় সরকার বহন না করলে অথবা স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা না থাকলে চিকিৎসার জন্য জনগণের বাড়তি ব্যয় বন্ধ হবে না। সরকারের পক্ষে পুরো খরচ বহন করা কঠিন হবে বলে ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশ সরকারকে বহনের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষা

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর বিষয়ে আলোচনা করছে কমিশন। সদস্যদের ভাষ্য, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলে মাধ্যমিক ও বিশেষায়িত সহজে পাওয়া যাবে। তারা গ্রামীণ পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতাগুলো শনাক্ত করেছেন। প্রচলিত ‘চিকিৎসকনির্ভর’ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা থেকে বের হওয়ার উপায় খোঁজা হচ্ছে। স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের যথাযথ বণ্টন ও পদায়ন এবং চিকিৎসা শিক্ষার মানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন। চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) যে নিবন্ধন লাগে, তা অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা চলছে।

কমিশনের কাজ যে পর্যায়ে

মাঠপর্যায়ে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কাজ শেষ করেছে কমিশন। কমিশনের অনুরোধে সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরো জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৬৪ জেলার সোয়া ৮ হাজার পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়েছে। এতে স্বাস্থ্যসেবার মান, সেবার ক্ষেত্রে অবহেলা, ওষুধের দুষ্প্রাপ্যতা এবং নাগরিককে স্বাস্থ্যসেবা দিতে রাষ্ট্রের ওপর আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফল প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন কমিশনের একাধিক সদস্য।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি শাখা কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাঁরা বলছেন, সমন্বিত ব্যবস্থাপনাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও বৈশ্বিক সংস্থা ওয়াটারএইড সাউথ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক খায়রুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো সবার জানা। এ থেকে উত্তরণে সরকারগুলোর আগ্রহের ঘাটতি দীর্ঘদিনের। সংস্কার প্রস্তাব যদি দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং পরবর্তী সরকার এসে তা বাস্তবায়ন অব্যাহত না রাখে, তাহলে কোনো লাভ হবে না। অল্প সময়ের মধ্যে কী করা যায় তা ভাবা উচিত। নির্বাচনের আগে এই সরকার হয়তো কয়েক মাস সময় পাবে। পরে রাজনৈতিক সরকার এসে এ ব্যাপারে আন্তরিক নাও হতে পারে।’

সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ও পরামর্শগুলো জনকল্যাণমুখী হওয়া উচিত বলে মনে করেন পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি শাখায় ঘাটতি ও সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যা যে চিহ্নিত হয়নি তা নয়। কিন্তু সমাধানে সমন্বিত আগ্রহ প্রয়োজন ছিল।’