গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদক কারবারের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের তিন সাংবাদিককে প্রায় তিন ঘণ্টা জিম্মি করে নির্যাতন, হত্যার হুমকি এবং জোর করে মাদকসেবী ও কারবারি হিসেবে স্বীকারোক্তির ভিডিও ধারণের অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন হাজীর মাজার বস্তি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগীরা হলেন ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক রাবিউল হাসান, আসিফুল ইসলাম রিফাত ও ফটোসাংবাদিক আবির আহমেদ সুপ্ত। এ ঘটনায় রাবিউল হাসান শুক্রবার সন্ধ্যায় টঙ্গী পশ্চিম থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়, মাদক কারবারের তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহের সময় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল সাংবাদিকদের ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে তাঁদের মাথায় আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে মারধর করে একটি স্থানে নিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হয়।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, তাঁদের ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, টাকা ও পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তাঁদের জোর করে ঘুমের ওষুধ মেশানো তরল পান করানো হয়। পরে সামনে মাদক ও টাকা রেখে মাদকসেবী ও কারবারি হিসেবে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে ভিডিও ধারণ করা হয়। এসব ভিডিও ও ছবি পরবর্তী সময়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইলের কাজে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যেই ধারণ করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের ধারণা।
রাবিউল হাসান অভিযোগ করেন, ঘটনার আগে তাঁরা প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে ওই এলাকায় মাদক কেনাবেচার তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছিলেন। তাঁর মোবাইলে মাদক কারবারিদের ছবি, ভিডিও এবং বিভিন্ন মাদক সরবরাহকেন্দ্রের দৃশ্য ধারণ করা ছিল।
তিনি বলেন, হামলাকারীরা সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তাঁদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং মোবাইল ফোনের তথ্য দেখতে চান। ফোন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে অস্ত্রের মুখে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে এতে থাকা তথ্য মুছে ফেলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রাবিউল আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তাঁদের বারবার আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন এবং গুলি করার হুমকি দেন। তাঁদের ধারণ করা তথ্য-প্রমাণ দেখার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত আটকে রাখা হয়। এ সময় তাঁদের হত্যার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল বলে তাঁর দাবি।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের আটকে রাখার সময় আশপাশে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা চলছিল। ঘটনাস্থলের কাছেই একটি মসজিদ ও খেয়াঘাট রয়েছে। এত দীর্ঘ সময় তাঁরা আটকে থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য ঘটনাস্থলে আসেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি ভিডিও কলের মাধ্যমে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই ব্যক্তি মাদক কারবার ও এলাকার অপরাধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ করেন সাংবাদিকেরা। প্রাণভয়ে তাঁরা তাতে সম্মতি জানানোর পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
আহত সাংবাদিকেরা প্রথমে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের অন্যত্র পাঠানো হয়।
এর আগে গত ২৬ অক্টোবর একই এলাকায় অস্ত্রের মুখে দৈনিক কালবেলার গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মহিন উদ্দিন রিপনকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় করা অভিযোগে বলা হয়, তাঁকে মারধর করে আটকে রাখা হয় এবং এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। তাঁকে বিবস্ত্র করে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ধারণের অভিযোগও রয়েছে। এসব করা হয়েছিল ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে—এমন অভিযোগ করেন তিনি।
ঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিকেরা জানান, তাঁদের জিম্মি করে রাখার সময় হামলাকারীরা মহিন উদ্দিন রিপনের নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও তাঁদের দেখায়। একই এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিক হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগে মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি তুরাগ নদ থেকে সাবেক এক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার এবং পরে মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাঁর মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনাও ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরাও পুলিশ সেখানে যেতে ভয় পাই। মনে হয়, বাংলাদেশের ভেতরে এটি যেন আলাদা একটি রাষ্ট্র।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দলবদ্ধভাবে গেলেও অনেক সময় কোনো কাজ করতে পারি না। একবার একজন সহকর্মীকে নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগৃহ করতে সেখানে গিয়েছিলাম। কোনোমতে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি।’
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার শনিবার দায়িত্ব ছাড়ার আগে বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টঙ্গীর মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকায় মাদক কারবারি ও অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে শিগগির অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
নবনিযুক্ত জিএমপি কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মাত্র দায়িত্ব নিয়েছি এবং ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পেরেছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান বলেন, সাংবাদিকদের লিখিত অভিযোগ তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত দুই দিনে ওই এলাকা থেকে ছয়জন মাদকসেবী ও দুজন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মাজার বস্তিতে আগের উচ্ছেদ অভিযানের পর মাদক কারবারিরা তাঁদের কার্যক্রমের ধরন পরিবর্তন করেছেন। তুরাগ নদ ও বিশ্ব ইজতেমা ময়দানসংলগ্ন এলাকায় তাঁরা ভ্রাম্যমাণভাবে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।