গুলশান-১ গোলচত্বর। রাজধানীর অন্যতম অভিজাত ও মূল্যবান বাণিজ্যিক এলাকা। এখানে সিনেমা হল নির্মাণের শর্তে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল প্রায় তিন বিঘা (দুই বিঘা ২৮ শতাংশ) জমি। সময়টা ১৯৭৪-৭৫ সাল। তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) (বর্তমানে রাজউক) দুই প্রতিষ্ঠান ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’-এর নামে চারটি প্লট বরাদ্দ দেয়। কিন্তু সিনেমা হলের বদলে সেখানে গড়ে ওঠে ছয়তলা গুলশান শপিং সেন্টার। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য হলরুম রাখার শর্তও মানা হয়নি। পরে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আদালতের নির্দেশে তা ভেঙে ফেলা হয়। এরপর সামনে আসে জমির নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে নতুন বিতর্ক।
২০০৬ সালে জমির আমমোক্তারনামা দেওয়া হয় শান্তা হোল্ডিংসকে। অভিযোগ রয়েছে, মূল লিজ গ্রহীতার অনুমতি ছাড়াই জমি বন্ধক রেখে ওয়ান ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেয় শান্তা হোল্ডিংস। জমির মালিকানা ও চুক্তি নিয়ে বিরোধ গড়ায় আইনি লড়াইয়ে। এর মধ্যেই চারটি প্লট একীভূত করে ৪০ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) তাতে অনুমোদনও দেয়। পরে সমালোচনার মুখে প্লট একত্রীকরণের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। অন্যদিকে, সিনেমা হলের নামে জমি বরাদ্দ থেকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন—পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেও থমকে গেছে মন্ত্রণালয়।
রাজউকের নথি বলছে, জমি বরাদ্দ পেয়েই প্লটগুলো বাণিজ্যিকীকরণের দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন লিজ গ্রহীতা ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র‘ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহমেদ ফায়জুর রহমান। পরবর্তী সময়ে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারসাজিতে প্লটের বরাদ্দের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে প্লটগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমোদন পায়।
রাজউক জানিয়েছে, গুলশানের জমি আকর্ষণীয় হওয়ায় ১৯৭৪ সালের ২১ মে গুলশান-১ গোলচত্বরের ১৪ নম্বর প্লট ‘মেসার্স চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেডের’ নামে বরাদ্দ নেওয়ার পর আরও প্লট বরাদ্দের তোড়জোড় শুরু করেন প্রতিষ্ঠানটির এমডি ফায়জুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ৩১ জানুয়ারি আরও তিনটি প্লট বরাদ্দ পান তিনি। গুলশান-১ এর ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট ‘মেসার্স বাণীচিত্র প্রতিষ্ঠানের’ নামে ‘সিনেমা হল’ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল উদ্দিন চৌধুরীর সময়ে ১৯৯৯ সালের ১৭ জানুয়ারি প্লট তিনটিতে বাণিজ্যিক দোকান নির্মাণের অনুমতি নেওয়া হয়। বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি পেলেও একটি হলকক্ষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য রাখার শর্ত ছিল। পরে সেখানে গুলশান শপিং সেন্টার করা হলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য হলরুম রাখা হয়নি।
জানা গেছে, সিনেমা হল নির্মাণের শর্তে বরাদ্দ দেওয়া জমি বাণিজ্যিকীকরণের উদ্দেশ্য খুঁজতে চুলচেরা বিশ্লেষণে নেমেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। জমি বরাদ্দের পেছনের ঘটনা তদন্ত করতে চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমানের নির্দেশে উপসচিব মোছা. লুৎফুন নাহার নাজীম স্বাক্ষরিত চিঠিতে এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইন অনুবিভাগ) বাবর আলী মীরকে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়। তবে এক মাস পর তদন্তের ভার ছেড়ে দেন অতিরিক্ত সচিব বাবর আলী মীর। এ বিষয়ে গণপূর্তের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘মন্ত্রী তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন, তদন্ত করতে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রীর সঙ্গে ফের আলোচনা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিনেমা হলের জমিতে কীভাবে বাণিজ্যিকভাবে অন্য কাজের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সে ব্যাপারেই তদন্ত হবে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, গুলশান-১ এর গোলচত্বরের ছয়তলা ভবন ভাঙা সম্পন্ন হয়েছে। চারদিকে টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, বহুতল ভবনের ফাউন্ডেশনের জন্য বিভিন্ন ধরনের লোহার পাইপ ও নির্মাণ উপকরণ রাখা হয়েছে। নির্মাণসামগ্রী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ড কাজ করছেন। সেখানে থাকা শান্তা হোল্ডিংসয়ের বিলবোর্ডে লেখা ২ থেকে ৬ হাজার ৫০০ স্কয়ার ফিট অফিস স্পেস হবে। গুলশান শপিং সেন্টারে ৭২৩টির বেশি দোকান ছিল, ভবন ভেঙে ফেলায় বহু ব্যবসায়ী বিভিন্ন স্থানে চলে গেছেন, কিছু ব্যবসায়ী টিনে ঘেরা বাউন্ডারি ঘেঁষে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়েছেন।
জানা গেছে, গুলশানে সিনেমা হলের জায়গায় ছয়তলা ‘গুলশান শপিং সেন্টার’ নির্মাণ করে দোকানের পজিশন বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়। শপিং সেন্টারে দোকানের পজিশন ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রির পাশাপাশি ২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর শান্তা প্রপার্টিজ লিমিটেডের (বর্তমান যা শান্তা হোল্ডিংস) কাছে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল করেন ‘বাণীচিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেড’ ও ‘চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেড’-এর এমডি আহমেদ ফায়জুর রহমান। জমিটি ব্যবহারের ক্ষমতা পায় শান্তা প্রপার্টিজ। পরে শান্তা হোল্ডিংসকে দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি স্থগিত চেয়ে রাজউকের কাছে নোটিশ দেন ‘বাণীচিত্র’র নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়া ইয়ামিন।
যা বলছে বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্র: গুলশান-১ এর ১৪, ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লটের ২ বিঘা ২৮ শতাংশ জমি মালিক বাণীচিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেড ও চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেড। শান্তা হোল্ডিংয়ের কাছে জমির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেওয়ার পর দফায় দফায় শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে। চুক্তি ভঙ্গ করে এবং বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্রের পূর্বানুমতি ছাড়াই জমি বন্ধক রেখে শান্তা হোল্ডিংস একাধিক ব্যাংক থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানির আলাদা অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে বাণীচিত্র প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতায় পড়েছে—এমন অভিযোগে শান্তা হোল্ডিংসয়ের কাছে ৩ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ, ঋণের কাজের মূলধন রূপান্তরের লাভ, এর ওপর ১৫ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং বন্ধক মুক্ত করে জমি ব্যাংক থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেড।
‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ ফয়জুর রহমানের মৃত্যুতে তার স্ত্রী ফ্লোরিন গনি রহমান এবং সন্তানরা তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বনে গেছেন। গুলশানের জমি নিয়ে শান্তা হোল্ডিংস পাওয়ার অব অ্যাটর্নির নামে প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বাণীচিত্র লিমিটেডের পক্ষে পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা ও রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগে তিনি শান্তা হোল্ডিংসের বিরুদ্ধে শর্ত ভঙ্গ করে এসব প্লট বন্ধক দিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ করেন। পাশাপাশি শান্তা হোল্ডিংসের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ফ্লোরিন গনি রহমান। তবে এই অভিযোগের সুরাহা হওয়ার আগেই রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আর ঊর্ধ্বতন মহল মিলে প্লটে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে শান্তা হোল্ডিংসকে অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
প্লট একত্রীকরণের পর স্থগিত: গুলশানের প্লট চারটি নিয়ে উদ্ভূত জটিলতা নিরসনে রাজউকের সাবেক সদস্য মো. নূরুল ইসলাম ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিকুর রহমান ফাইলটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। একাধিক আরবিট্রেশন ও রিভিশন মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লটের সঙ্গে ১৪ নম্বর প্লট একত্রীকরণ করা হয়। ভূমি বরাদ্দের নির্দেশিকা না মেনে ফাইল প্রক্রিয়া করার দাপ্তরিক নিয়মের বাইরে গিয়ে ২০২৬ সালের ২২ জুলাই রাজউকের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরে শান্তা হোল্ডিংসকে অনুমোদনের চিঠি দেওয়া হয়। তবে প্লটগুলো একত্রীকরণের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার প্রেক্ষাপটে গত ৭ আগস্ট শান্তা হোল্ডিংসের প্লট একত্রীকরণের আবেদনের কার্যক্রম স্থগিত করে রাজউক।
যেভাবে ব্যাংক থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে শান্তা: গুলশান দক্ষিণ বাণিজ্যিক ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট ওয়ান ব্যাংক লিমিটেডের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চের কাছে বন্ধক রেখে ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ১০০ কোটি টাকা ঋণ নেয় শান্তা হোল্ডিংস লিমিটেড। পরে ২০১৬ সালের ২২ জুনে গুলশান দক্ষিণ বাণিজিক ১৪ নম্বর প্লটের ৩৫ দশমিক ১০ শতাংশ জমি বন্ধক রেখে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৯০ কোটি ৫৯ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ঋণ নেয় শান্তা হোল্ডিংস।
কেন বেঁকে বসেছেন জমির লিজ গ্রহীতা: প্লট মালিকের দাবি, প্লটের মূল বরাদ্দগ্রহীতাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং রাজউকের পূর্বানুমতি ছাড়াই রাজউক অন্তর্ভুক্ত চারটি বাণিজ্যিক প্লট বন্ধক রেখে ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে শান্তা হোল্ডিংস। এতে বেঁকে বসেছেন চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বাণীচিত্র লিমিটেডের পক্ষে পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান। ২০২৩ সালের আগস্টে অনিয়মের অভিযোগ তুলে শান্তা হোল্ডিংসকে নোটিশ অব টার্মিনেশনের মাধ্যমে আমমোক্তারনামা বাতিলে নোটিশ দেয় বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান।
আমমোক্তারনামা বাতিলে জটিলতা: সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দাতা (যিনি ক্ষমতা দেন) যে কোনো সময় একা একাই বাতিল করতে পারেন। কিন্তু অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দাতা চাইলেই নিজের ইচ্ছায় একতরফাভাবে বাতিল করতে পারেন না। দাতা মারা গেলেও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরাও এর শর্ত দ্বারা বাধ্য থাকেন। জমির লিজ গ্রহীতা ও শান্তা হোল্ডিংসের সঙ্গে প্রথমে যৌথ চুক্তি হয়। চুক্তির ছয় দিন পর ২০০৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর শান্তা হোল্ডিংসকে আমমোক্তারনামা দেওয়া হয়। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল করতে হলে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় অথবা উভয় পক্ষের আইনি সম্মতি বা চুক্তি ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে হয়। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ এর ধারা ৪(৪) মোতাবেক আরবিট্রেশনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রেজিস্ট্রিকৃত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের কার্যকারিতা স্থগিত থাকবে।
দোকানের পজিশন বিক্রি, গোপনে শান্তাকে আমমোক্তারনামা: ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’ প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন আহমেদ ফজলুর রহমান। তিনি গুলশানের জমিতে নকশা অনুমোদন নিয়ে পাঁচতলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে দোকানের পজিশন হস্তান্তর করেন। ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন তার ছেলে আহমেদ ফায়জুর রহমান। তিনি ১৯৯৭ ও ১৯৯৯ সালে দুটি পৃথক সংশোধিত নকশা অনুমোদন নিয়ে ভবনটির ওপরে আরেক তলা নির্মাণ করে দোকানের পজিশন বিক্রি করেন। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে দোকানের পজিশন বিক্রি করে ২০০৬ সালের ১৯ ডিসেম্বরে গোপনে শান্তা হোল্ডিংসকে জমির আমমোক্তারনামা দেন ফায়জুর রহমান। এতে বেকায়দায় পড়েন গুলশান শপিং সেন্টারের দোকান মালিকরা। তারা ২০০৭ সালে ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’ এবং শান্তা হোল্ডিংসের মধ্যকার চুক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে ২০২১ সালে সমঝোতা করেন দোকান মালিকরা।
গুলশানের জমির লিজ গ্রহীতার বক্তব্য: চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বাণীচিত্র লিমিটেডের পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তার নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে আইনজীবী বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কালবেলাকে বলেন, আইনের স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী জমির মূল লিজ গ্রহীতা ও পাওয়ার প্রাপ্ত ডেভেলপারের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে লিজ গ্রহীতা পাওয়ার টার্মিনেশনের জন্য নোটিশ প্রদান করতে পারেন। আইনানুযায়ী নোটিশ জারির সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ‘স্থগিত’ হয়ে যায়—যদিও এটি চূড়ান্তভাবে বাতিল হতে আদালতের বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়োজন হয়। এই স্থগিত থাকাকালীন সময়ে বিরোধের অবসান না হওয়া পর্যন্ত ডেভেলপার প্রকল্প-সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছর ধরে শান্তা প্রোপার্টিজ জমির লিজ গ্রহীতার প্রতি চরম অন্যায় ও প্রতারণামূলক আচরণ করে আসছে। গুলশানের এই মূল্যবান জমিকে পুঁজি করে প্রতিষ্ঠানটি কেবল নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে।
জমি বন্ধক রেখে প্রতারণা করা হয়েছে দাবি করে আইনজীবী বলেন, শান্তা প্রোপার্টিজ লিজ গ্রহীতার জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেছে এবং তা এই প্রকল্পের উন্নয়নে না লাগিয়ে অন্য ব্যবসায় ব্যবহার করেছে। জমি বন্ধক না রাখলে তারা এই সুবিধা পেত না, যা একটি স্পষ্ট প্রতারণা।
বোরহান উদ্দিন বলেন, গুলশান শপিং সেন্টারের দোকানদারদের পুনর্বাসন বা সরিয়ে নেওয়ার জন্য শান্তা হোল্ডিংসের যে অর্থ দেওয়ার কথা ছিল, তারা তা পরিশোধ করেনি। ফলে নির্ধারিত সময়ে দোকানদারদের পাওনা মেটানো সম্ভব হয়নি। পরে লিজগ্রহীতার প্রভাব ব্যবহার করে শান্তা হোল্ডিংস সেই দোকানদারদের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করিয়ে নেয়। এসব কারণে লিজ গ্রহীতা শান্তা হোল্ডিংসকে দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তাদের প্রাপ্ত পাওনা বা বিনিয়োগের টাকা নিয়ম অনুযায়ী ফেরত দিতে ইচ্ছুক।
গুলশানের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নির বিষয়ে শান্তা হোল্ডিংসের ওয়েবসাইটে দেওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলে সেখান থেকে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যোগাযোগ করবেন। তবে কেউ যোগাযোগ করেননি। পরে গতকাল সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও ওই নম্বরে ফের ফোন করা হয়। তবে কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি। কেবল বলা হয়, বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের জানাবেন। এর আগে গত সোমবার শান্তা গ্রুপের পরিচালক খন্দকার জামিল উদ্দিনের মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে মোবাইলে মেসেজ পাঠানো হলেও তার সাড়া মেলেনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার কালবেলাকে বলেন, সিনেমা হলের নামে বরাদ্দকৃত জমিতে শপিং সেন্টার তৈরি করা এবং পরে বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তর হওয়ায় জমি বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। এই অনিয়মের পেছনে রাজউকের যারা জড়িত আছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ বাস্তবায়নে জোর দেবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন বদিউল আলম মজুমদার।