Image description

যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, তাদের জন্যই সরকারি বরাদ্দে নিমার্ণ হয়েছিল গুচ্ছগ্রামের ঘরগুলো। হতদরিদ্রদের স্থায়ী ঠিকানা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করাই ছিল এই ঘর নিমার্ণের উদ্দেশ্য। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে সেই স্বপ্নের অনেকটাই আজ ধুলোয় মিশেছে। যে ঘর একসময় ছিল আশ্রয়ের প্রতীক, সেটিই এখন অনেকের কাছে আতঙ্কের নাম।

 

কোথাও টিনের চালায় মরিচা, কোথাও বেড়া ভাঙা, আবার কোথাও হেলে পড়েছে ঘরের কাঠামো। বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি পড়ে, ঝড় এলেই বুক কাঁপে বাসিন্দাদের। সরকারি বরাদ্দের এসব বেহাল দশার ঘরগুলোও জোরপূর্বক লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে মাদারীপুরের গুচ্ছগ্রামগুলোতে আশ্রয়ের স্বপ্ন যেন রূপ নিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগে।

 

তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় রয়েছে ১৫টি গুচ্ছগ্রাম। এসব গুচ্ছগ্রামে বসবাস করছে প্রায় এক হাজার পরিবার। ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত এসব আবাসন প্রকল্পের ঘরগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং দখল ও হাতবদল নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে সরকারি এই উদ্যোগের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক হতদরিদ্র মানুষ। তাদের দাবি, শুধু আশ্রয় দেওয়াই যথেষ্ট নয় সেই আশ্রয়কে বসবাসের উপযোগী রাখার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।

 

সরেজমিনে মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর পাঙ্গাশিয়া গ্রামের গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরগুলোর প্রতিটি চালায় যেন জমে আছে অবহেলার চিহ্ন। কোনো ঘরের টিন ফুটো, কোথাও বেড়া ভেঙে গেছে, আবার কোনো ঘরের কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে ভিজে যায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক ঘরই এখন বসবাসের অনুপযোগী। তবু বিকল্প আশ্রয় না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এসব ঘরে দিন কাটাচ্ছেন অসহায় পরিবারগুলো।

 

গুচ্ছগ্রামের ঘরগুলোর বেহাল দশা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
গুচ্ছগ্রামের ঘরগুলোর বেহাল দশা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

 

 

বাসিন্দাদের অভিযোগ, নতুন ঘর কিংবা পুরোনো ঘর সংস্কারের আশায় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দরজায় বহুবার ঘুরেছেন তারা। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের দুর্দশা কাটেনি। ঘরের ভেতরে যেমন নিরাপত্তা নেই, তেমনি ঘরের বাইরেও স্বস্তি নেই। গুচ্ছগ্রামে যাতায়াতের জন্য নেই পর্যাপ্ত পাকা রাস্তা। বর্ষা এলেই কাদাপানিতে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা নামলেই সড়কবাতির অভাবে পুরো এলাকা ডুবে যায় অন্ধকারে। এতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের চলাচলে তৈরি হয় বাড়তি ঝুঁকি। স্থানীয়দের দাবি, শুধু চর পাঙ্গাশিয়া নয়, জেলার প্রায় প্রতিটি গুচ্ছগ্রামেই কমবেশি একই চিত্র।

 

২০ হাজার টাকার ঋণ, হারালেন সরকারি আশ্রয়

 

গুচ্ছগ্রামের দুর্ভোগ ছাড়াও সামনে এসেছে দখল ও হাত বদলের অভিযোগ। মাত্র ২০ হাজার টাকা ধার পরিশোধ করতে না পারায় বৃদ্ধা ফজিলা বেগমের সরকারি বরাদ্দের ঘর ও জমি জোরপূর্বক লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল হাকিম হাওলাদারের বিরুদ্ধে।

 

কালকিনি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর পাঙ্গাশিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজিলা বেগমের পরিবারের অভিযোগ, ২০১০ সালে মাত্র ২০ হাজার টাকা ধার নেওয়ার পর তা পরিশোধ করতে না পারায় তার ঘর ও জমি লিখে নেওয়া হয়। অভিযোগের তীর তৎকালীন পৌরসভায় কর্মরত আব্দুল হাকিম হাওলাদারের দিকে। আশ্রয় হারিয়ে এরপর থেকেই গুচ্ছগ্রাম ছেড়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছেন ফজিলা বেগম। যে সরকারি ঘরটি ছিল তার শেষ সম্বল ছিল, সেটিও এখন আর তার দখলে নেই।

 

ফজিলা বেগমের ছোট ছেলে মো. হান্নান সরদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার মা ২০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। সেই টাকা পরিশোধ করতে না পারায় হাকিম হাওলাদার সরকারের দেওয়া আমাদের ঘর ও জমি লিখে নেন। তিনি তখন পৌরসভায় চাকরি করতেন। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আমাদের শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন আমাদের থাকার জায়গা নেই। আমরা সরকারের কাছে মায়ের জমি ফেরত চাই, পাশাপাশি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

 

তবে ফজিলা বেগমের পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আব্দুল হাকিম হাওলাদার। তিনি বলেন, আমি টাকা দিয়ে জমি ও ঘর কিনেছি। এ বিষয় নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিশ-বৈঠকও হয়েছে। পরে আমি কাগজপত্র ঠিক করেছি। ফজিলা বেগমের ঘর বা জমি জোরপূর্বক দখল কিংবা দলিল করে নেইনি।

 

অভিযোগ রয়েছে, একই গুচ্ছগ্রামের কবির নামের আরেক বাসিন্দার ঘর ও জমিও হায়াত নামে এক ব্যক্তি কিনে নিয়েছেন। অথচ সরকারি বরাদ্দের এসব জমি ও ঘর বিক্রি কিংবা হস্তান্তরের সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন উঠলেও এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা স্থায়ী সমাধান পাননি বলে অভিযোগ তাদের।

 

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা চম্পা বেগম বলেন, সরকার প্রায় ৪০ বছর আগে আমাদের একটি টিনশেড ঘর দিয়েছিল। সেই ঘর এখন ভেঙে গেছে, বসবাসের উপযোগী নেই। বৃষ্টি হলে ঘরের সবকিছু ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। ঝড় হলে আতঙ্কে থাকতে হয়। আমরা সবাই নতুন ঘর চাই।

 

আরেক ভুক্তভোগী শিপন বালী বলেন, গুচ্ছগ্রামে কোনো বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান করতে গেলেও জায়গা পাওয়া যায় না। জায়গার অভাবে পারিবারিক অনেক অনুষ্ঠান ঠিকভাবে আয়োজন করা সম্ভব হয় না। সরকার যদি পর্যাপ্ত জমিসহ বড় পরিসরে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়, তাহলে এখানকার মানুষ উপকৃত হবে।

 

এ বিষয়ে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, সরকার ভূমিহীনদের বসবাসের জন্য ঘর ও জমি দিয়েছে। কিন্তু এসব জমি কখনোই বিক্রয় বা হস্তান্তরযোগ্য নয়। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করেছেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের জমি ফিরিয়ে দেওয়াসহ গুচ্ছগ্রামের সমস্যাগুলো সমাধানে শিগগিরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।