Image description

মুসলিম নারীদের দ্বীনি শিক্ষা, দাওয়াতি কার্যক্রম ও নেতৃত্বের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন। এ লক্ষ্যে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অন্তত ৫০ লাখ মানুষের কাছে কোরআন-হাদিসের জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে মুসলিম নারীদের কোরআন শিক্ষা, আরবি ভাষা, মৌলিক দ্বীনি জ্ঞান ও দাওয়াতি কাজে দক্ষ করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

 

শুক্রবার আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি বলেন, উম্মাহর নারীসমাজকে দ্বীনি শিক্ষা ও দাওয়াতি কার্যক্রমে এগিয়ে নিতে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা পরিকল্পনা করছিলেন। এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে আয়োজন করা হয়েছে এ অনুষ্ঠান। নারীদের দাঈ হিসেবে গড়ে তোলা এবং কোরআন-হাদিসের আলোকে সমাজে কার্যকর ভূমিকা পালনের উপযোগী করে প্রস্তুত করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

 

তিনি বলেন, সামাজিক সংস্কৃতি, পর্দা ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতার কারণে নারীদের নিয়ে কাজ করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দ্বীনি শিক্ষা ও দাওয়াতি কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণও সীমিত থাকে। তবে এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সহযোগিতা ও নারীদের আত্মত্যাগের মানসিকতাও জরুরি।

 

অনুষ্ঠানে ইসলামের ইতিহাসে নারীদের অবদানের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, ইসলামের প্রথম গ্রহণকারী ছিলেন একজন নারী। প্রথম শাহাদাত বরণকারীও ছিলেন নারী। নবী করিম (সা.)-কে প্রথম আশ্রয় দেওয়া এবং ইসলামের জন্য অর্থ ব্যয়কারীদের মধ্যেও নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হজরত সুমাইয়া (রা.) ইসলামের জন্য জীবন উৎসর্গ করে প্রথম শহীদের মর্যাদা অর্জন করেন।

 

তিনি আরো বলেন, হজরত আয়েশা (রা.)-সহ সাহাবি নারীরা হাদিস বর্ণনা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ সাহাবিরাও বিভিন্ন মাসআলা ও হাদিসের বিষয়ে তাদের সহযোগিতা নিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ড. আকরাম ইংল্যান্ডের রচিত ‘আল-ওয়াফা’ নামের ৫০ খণ্ডের গ্রন্থে আট হাজার নারী মুহাদ্দিসের জীবনী সংকলিত হয়েছে। এসব দৃষ্টান্ত মুসলিম নারীদের জ্ঞানচর্চা ও দাওয়াতি কাজে এগিয়ে আসার অনুপ্রেরণা হতে পারে।

 

নারীদের জন্য মানসম্মত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। নিজের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, মেয়েদের জন্য ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নিরাপদ দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।

 

এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মসজিদ কমপ্লেক্সে নারীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। মসজিদে ইতোমধ্যে নারীদের জন্য একটি ফ্লোর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাততলা একটি ভবন সম্পূর্ণ নারীদের কার্যক্রমের জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও আপাতত এক বা দুটি ফ্লোরে কার্যক্রম শুরু করার চিন্তা করা হচ্ছে। এ ছাড়া পাশে আরো ৩২ কাঠা জমি নেওয়া হয়েছে, যার অধিকাংশ নারীদের কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী মুসলিম নারীদের জন্য বৃহৎ একটি মারকাজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

অনুষ্ঠানে আস-সুন্নাহ অনলাইন ইনস্টিটিউট চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম নারীদের কোরআন তিলাওয়াত, আরবি ভাষা ও মৌলিক দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া হবে। প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত ও প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এ জন্য যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করা একজন দায়িত্বশীলসহ কয়েকজন কাজ করছেন। অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরির কাজেও উল্লেখযোগ্য অর্থ ও জনবল বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

 

শায়খ জানান, আগ্রহী নারীদের প্রথমে নিবন্ধন ও মূল্যায়ন করা হবে। এরপর তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে কেউ অনলাইনে, আবার কেউ সরাসরি বিভিন্ন স্থানে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। অভিজ্ঞ আলেম ও প্রশিক্ষকদের সহযোগিতায় তাঁদের ধারাবাহিকভাবে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা হবে।

 

দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনায় আটটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান।

 

প্রথমত, ইখলাস বা নিয়তের বিশুদ্ধতা। তিনি বলেন, দাওয়াতি কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইখলাস। কাজের পরিমাণ কম হলেও নিয়ত বিশুদ্ধ থাকলে তা মূল্যবান হবে। অন্যদিকে লোকদেখানো, প্রশংসা বা স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে কাজের বরকত নষ্ট হতে পারে। তাই একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতে হবে।

 

দ্বিতীয়ত, নিজের জ্ঞানের সীমার মধ্যে থেকে কথা বলা। কাউকে যে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাঁকে সেই দায়িত্বের মধ্যেই থাকতে হবে। তাজবিদ শেখানোর দায়িত্ব পেলে তাজবিদ শেখাতেই মনোযোগ দিতে হবে। ফতোয়া বা মাসআলা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অনুমোদন থাকতে হবে। কোনো বিষয় জানা না থাকলে তা স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট আলেমদের কাছে পাঠাতে হবে।

 

তৃতীয়ত, উম্মাহর ঐক্যের ধারণা ধারণ করা। তিনি বলেন, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন কোনো বিশেষ মতবাদ বা নির্দিষ্ট পন্থার প্রচারক হিসেবে কাজ করতে চায় না। কোরআন-সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যার আলোকে দ্বীন বোঝার চেষ্টা করাই তাদের মূলনীতি। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মাধ্যমে দ্বীনি কাজে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

 

চতুর্থত, দায়িত্বশীলদের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা। দাওয়াতি কাজে একটি নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল কাঠামো বা চেইন অব কমান্ড অনুসরণ করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নির্দেশনা মেনে চলতে হবে, যতক্ষণ তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশনার পরিপন্থী না হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার সুযোগও থাকবে।

 

পঞ্চমত, নিজেকে জাহির করার প্রবণতা, অতিরিক্ত কথা বলা এবং দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কাজ করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। দাওয়াতি কার্যক্রম চলাকালে অপ্রয়োজনীয় গল্প-আড্ডা থেকে বিরত থেকে মূল কাজে মনোযোগী থাকার আহ্বান জানান তিনি।

 

ষষ্ঠত, ধারাবাহিকভাবে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কোরআন-হাদিসের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের পাশাপাশি সমসাময়িক বিভিন্ন মতবাদ ও ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিভ্রান্তি সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। এ লক্ষ্যেই দাওয়াত সুন্নাহ প্ল্যাটফর্মের সিলেবাসে বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নারীদের জন্য অনলাইন ইনস্টিটিউটও ধারাবাহিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে।

 

সপ্তমত, দাওয়াতি কার্যক্রমে ব্যক্তিগত বিষয় ও অপ্রয়োজনীয় সম্পর্কের আলোচনা পরিহার করতে হবে। সংসার, স্বামী, শ্বশুরবাড়ি কিংবা পারিবারিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পরিবর্তে দ্বীনি জ্ঞান ও দাওয়াতি কাজসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মনোযোগী থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

 

অষ্টমত, ব্যক্তিগত তথ্য ও নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ব্যক্তিগত বার্তা, এসএমএস, ছবি, ভিডিও কিংবা অন্যের গোপনীয় তথ্য অনুমতি ছাড়া কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। দাওয়াতি কার্যক্রমে ছবি ও ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রেও সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।

 

অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নারীদের দাওয়াতি কাজে এগিয়ে আসার জন্য পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীদের নিজেদের সময়, শ্রম ও সামর্থ্য দ্বীনি কাজে ব্যয় করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

 

তিনি জানান, আগ্রহী নারীদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করা হবে। কেউ পাঠদান করবেন, কেউ অনলাইন কার্যক্রমে যুক্ত হবেন, আবার কেউ সরাসরি দাওয়াতি কাজে অংশ নেবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্যায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনে সংশোধনের সুযোগও থাকবে।

 

শায়খ আহমাদুল্লাহ আরো বলেন, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে গিয়ে সবকিছু ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী না-ও হতে পারে। তবে কাজ শেখা, অভিজ্ঞতা অর্জন ও দ্বীনি কার্যক্রমে নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা গ্রহণের ব্যবস্থাও উন্মুক্ত রাখা হবে।