বগুড়ার শেরপুরের করতোয়া নদীর পূর্বপাড়ের গ্রামগুলোয় অসুস্থ ও অসহায় মানুষের কাছে পরিচিত একটি নাম সফুরা খাতুন। কোনো বাড়িতে কেউ অসুস্থ হয়েছেন, অথচ দেখভালের মানুষ নেই— এমন খবর পেলেই ছুটে যান তিনি। প্রয়োজনে রোগীর সঙ্গে রাত কাটান হাসপাতালে। নিজের সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও মানুষের সেবায় কখনো পিছপা হননি। এভাবেই প্রায় ছয় দশক ধরে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৭৫ বছর বয়সী এ নারী।
সম্প্রতি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের খামারকান্দি গ্রামে সফুরা খাতুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কিছুক্ষণ আগেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এক রোগীর সেবা করে ফিরেছেন তিনি। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ির বারান্দায় বসে শোনালেন তার দীর্ঘ মানবসেবার গল্প। উঠে এলো দুঃখ-কষ্ট, স্বজন হারানোর বেদনা আর মানুষের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার সংগ্রামের কথা।
সফুরা খাতুনের জীবন শুরু থেকেই নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা। আট বছর বয়সে তার মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর সৎমায়ের সংসারে বেড়ে উঠতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে একই গ্রামের আমির উদ্দিনের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। স্বামী ছিলেন শ্রমজীবী। বিয়ের ১৫ বছরের মধ্যে তাদের সংসারে জন্ম নেয় তিন সন্তান। এরই মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্বামী আমির উদ্দিন।
স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন সফুরা। দরিদ্র পরিবারে জন্ম, স্বামীর রেখে যাওয়া জমিজমাও ছিল না। সহযোগিতার জন্য পাশে দাঁড়ানোর মতো তেমন কেউ ছিলেন না। অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটলেও ভেঙে পড়েননি তিনি। স্বামীর ভিটা আঁকড়ে ধরে সন্তানদের নিয়ে শুরু করেন বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
সেসময় করতোয়া নদীর পূর্বপাড়ের গ্রামগুলো ছিল বন্যাপ্রবণ। প্রায় প্রতিবছর বন্যার পানিতে তলিয়ে যেত বিস্তীর্ণ এলাকা। ফসলহানির পাশাপাশি কাজের সুযোগও ছিল সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে জীবিকার তাগিদে এবং মানুষের প্রতি মমতা থেকে বাড়ির আশপাশের অসুস্থ ও অসহায় মানুষের সেবায় এগিয়ে আসেন সফুরা।
গ্রামে এমন অনেক মানুষ ছিলেন, যাদের অসুস্থতার সময় দেখভাল করার কেউ ছিল না। খবর পেলেই তাদের বাড়িতে ছুটে যেতেন তিনি। নিজের মা-বাবা ও ভাই-বোনের মতো মমতা দিয়ে তাদের সেবা করতেন। কখনো রোগীর প্রয়োজনে টানা চার-পাঁচ দিন, আবার কখনো ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছে তাকে। এ সময় নিজের সন্তানদের রেখে যেতেন ভাসুরের পরিবারের সদস্যদের কাছে। নিজের সন্তানদের থেকে দূরে থেকেও অন্যের স্বজনের সেবায় কাটিয়েছেন দিনের পর দিন।
এভাবেই একসময় এলাকায় প্রচলিত হয়ে যায় একটি কথা— ‘যার কেউ নেই, তার আছে সফুরা।’
শুরুতে অসুস্থ মানুষের দেখভাল করলেও সময়ের সঙ্গে স্থানীয় ধাত্রীদের সহযোগিতা করতে গিয়ে প্রসবকালীন সেবার কাজও শিখে নেন তিনি। পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন। এরপর রোগীসেবার পাশাপাশি ধাত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেসময় গ্রামাঞ্চলে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার খুব একটা পরিচিত ছিল না। তখন থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার প্রসূতির প্রসবে সহায়তা করেছেন তিনি।
তবে তার সেবার পরিধি শুধু প্রসূতি মায়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নবজাতকের যত্ন, শিশুদের পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং যক্ষ্মা রোগীদের নিয়মিত ওষুধ সেবনে সহায়তাসহ নানা কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। গ্রামে কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। রোগীর প্রয়োজনে ছুটে যেতেন শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে। দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের নিয়ে হাসপাতালে যাতায়াতের কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছেও পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন সফুরা।
খামারকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সফুরাকে মানুষের সেবা করতে দেখে আসছি। অসুস্থ মানুষের জন্য তিনি একেবারে নিবেদিত প্রাণ। বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের জন্য কাজ করেন— এমন মানুষ সমাজে খুব কম দেখা যায়।’
খামারকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সফুরা নিজের উদ্যোগে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। বলা যায়, বিনা পারিশ্রমিকেই তিনি এসব কাজ করেন। কেউ কেউ হয়তো সামান্য আর্থিক সহযোগিতা করেন।’
শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তাকে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন রোগীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে আসতে দেখি। শুনেছি দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।’
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ‘সফুরা খাতুনের কথা শুনেছি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে তার বিধবা ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিয়মের মধ্যে থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।’
মানুষের সেবা করতে গিয়ে জীবনের বড় একটি অংশ পার করে দিয়েছেন সফুরা খাতুন। অথচ নিজের জীবনেই রয়ে গেছে অভাব-অনটন ও অনিশ্চয়তা। স্বামীর রেখে যাওয়া কোনো জমিজমা নেই। তিন সন্তানকে নিয়ে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে গেলেও অন্যের বিপদে আজও সবার আগে এগিয়ে যান তিনি।
যে বয়সে অনেকেই বিশ্রামে সময় কাটান, সেই ৭৫ বছর বয়সেও মানুষের অসুস্থতার খবর পেলে ঘরে বসে থাকতে পারেন না সফুরা। নিজের জীবনের দুঃখ-কষ্ট আড়াল করে অন্যের কষ্ট লাঘব করাই যেন তার জীবনের ব্রত। করতোয়া নদীর পূর্বপাড়ের মানুষের কাছে তাই সফুরা শুধু একজন নারী নন, অসহায় মানুষের ভরসার আরেক নাম।