আল জাজিরার প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কাছে অবস্থিত ‘ভার্চুয়াল বটমস লিমিটেড’ নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার অভিজ্ঞ সেলাই অপারেটর লাইলী বেগম। তিনি প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা (১২১ ডলার) আয় করেন। অতিরিক্ত সময় (ওভারটাইম) কাজ করলে এই আয় কখনো কখনো ১৮ থেকে ২০ হাজার টকায় (১৪৫–১৬১ ডলার) পৌঁছায়।
লাইলী বেগম এই টাকায় দুই সন্তানকে স্কুলে পড়ানোর খরচ চালিয়ে উঠতে পারছেন না। ৩৭ বছর বয়সী এই পোশাকশ্রমিককে মাঝেমাঝেই সন্তানদের পাতে এক বেলা ঠিকমতো খাবার তুলে দিতে হিমশিম খেতে হয়।
পড়াশোনার খরচ চালাতে না পারায় চলতি বছরের শুরুর দিকেই লাইলীর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে।
আল জাজিরাকে লাইলী বেগম বলেন, আমরা দিনে এক বেলা ঠিকমতো খাবার খাওয়ার খরচই কুলিয়ে উঠতে পারি না। আজ সকালে আমরা শুধু মুড়ি আর চানাচুর খেয়েছি। দুপুরে খাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। রাতে এক বেলা পেটপুরে খাওয়ার আশায় পুরো দিন আমাদের অভুক্তই থাকতে হচ্ছে। গতকালও পরিস্থিতি এমনই ছিল। এভাবেই এখন আমরা কোনোমতে বেঁচে আছি।
তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেটা এত শুকিয়ে গেছে যে, বুকের পাঁজরগুলো গুনে বলা যায়। আমি আর কী-ই বা করতে পারি?
লাইলী বেগমের মতো বাংলাদেশে আনুমানিক ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিক রয়েছেন, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী। তারা সবাই এখন বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করছেন।
চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। এইচ অ্যান্ড এম, জারা, লেভি স্ট্রস, ওয়ালমার্ট এবং প্রাইমার্কের মতো বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর পোশাক সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এটি। তৈরি পোশাক খাত থেকে বাংলাদেশ গত অর্থবছরে ৩ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার আয় হয়েছে, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি।
অথচ এই বিপুল বৈশ্বিক পোশাকসামগ্রী তৈরি করেন যেসব মানুষ, তারা বলছেন—মজুরি হিসেবে যা মেলে, তা দিয়ে বেঁচে থাকার ন্যূনতম জীবনযাত্রার খরচটুকুও আর মেটানো যাচ্ছে না।
‘সরকার শুধু আশ্বাসই দেয়’
১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম। কম্বোডিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি মাসে ২১০ মার্কিন ডলার, ভিয়েতনামে তা ১৪০ থেকে ২১০ ডলারের মধ্যে, আর চীনের উৎপাদন কেন্দ্র গুয়াংডংয়ে মজুরির হার ২৮৬ থেকে ৩৭৮ ডলার।
এই বৈষম্য ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার খরচ বাড়ায় আরও তীব্র হয়েছে। দিন দিন পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার খরচ বাড়ায় শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। বাধ্য হয়ে তারা কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমেছেন। ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) থেকে আন্দোলন করছেন।
রোববার (১ নভেম্বর) ঢাকার কাছে আশুলিয়ার জামগড়ায় এমনই একটি বিক্ষোভে অংশ নেন লাইলী বেগম। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে এবং বহু শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, রোববারের আন্দোলনের কারণে ৫২৯টি কারখানার উৎপাদন কাজ ব্যাহত হয় এবং এতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক প্রভাবিত হন।
ঢাকার উত্তরে গাজীপুর এলাকায় শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন । পাশাপাশি প্রতিবেশী মিরপুর এলাকা থেকেও পুলিশের সাথে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
লাইলী বেগম আল জাজিরাকে বলেন, সরকার শুধু আশ্বাসই দেয়। মজুরি কখন বাড়বে এবং কতটা বাড়বে, তা তারা আমাদের এখনো জানায়নি।
মূল্যস্ফীতি কেড়ে নিচ্ছে মজুরির ক্রয়ক্ষমতা
আশুলিয়ার ৩০ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক রাসেল খান আল জাজিরাকে জানান, ওভারটাইমসহ তার মাসে আয় হওয়াই ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। এই আয় দিয় মা, ছোট ভাই, স্ত্রী ও সন্তানসহ পুরো পরিবারের খরচ চালানো আর সম্ভব হচ্ছে না।
জীবনযাত্রার ব্যয় লাফিয়ে বাড়তে থাকায় সংসার চালাতে তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ টাকার ঋণে জর্জরিত হয়েছেন। রাসেল বলেন, এই আয়ে পরিবার চালানো এখন অসম্ভব। জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে, শুধু বেঁচে থাকার জন্যই আমাদের ঋণ করতে হচ্ছে।
পোশাক খাতে সর্বশেষ সর্বনিম্ন মজুরি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। তারপর থেকে নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যার মধ্যে খাদ্যে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাবার ছাড়া অন্যান্য খাতে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।
লাইলী বেগম জানান, মা ও সন্তানদের নিয়ে এক ঘরে থাকার জন্য তাকে সাড়ে তিন হাজার টাকা ঘরভাড়া দিতে হয়।
সিরাজগঞ্জের গ্রামে থাকা লাইলীর বাবাও তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তিনি জানান, রান্না করার জন্য ব্যবহৃত কুড়ানো কাগজ ও অন্যান্য বর্জ্য পোড়াতে হচ্ছে তাকে, কারণ প্রায় ২,২০০ টাকা দামের গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য তার নেই।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, গত পাঁচ বছরের টানা মূল্যস্ফীতি কম আয়ের শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, যখন প্রকৃত আয় কমে যায়, তখন তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান কাটছাঁট করতে হয়। তাদের কোনো বাড়তি আয় বা সঞ্চয় থাকে না। সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের মধ্যেও একটি ‘অনুকরণীয় প্রভাব’ তৈরি করেছে, যারা একই ধরনের স্বস্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।
মজুরি পর্যালোচনার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করার জন্য শ্রম আইন সংশোধনের পর সরকার এই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয়। বর্তমান তিন বছরের এই মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে।
বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার ( ১ নভেম্বর) শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সোমবার (২ নভেম্বর) পোশাক কারখানা মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে আলোচনা সাপেক্ষে নতুন সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণের আশ্বাস দেন।
ইতোমধ্যে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মজুরি বোর্ড দ্রুতই তাদের কাজ শুরু করবে।
বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার ২০২৭ সালের জানুয়ারির বেতন থেকেই নতুন মজুরি কার্যকর করার দাবি জানান। তিনি আন্দোলনকারীদের কাজে ফেরার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিকদের মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি তোলেন।
‘সিংহভাগ লভ্যাংশ পশ্চিমাদের ঝুলিতে’
একদিকে শ্রমিকেরা বেতন বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা সামলাতে হচ্ছে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন বড় সংকটের মুখে। ঠিক এমন একটা কঠিন সময়েই বেতন বাড়ানোর আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) কর্মকর্তা এবং কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ হোসেন মুহাম্মদ মুস্তাফিজ আল জাজিরাকে জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতার পাশাপাশি ন্যায্য মজুরি এবং কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
মুস্তাফিজ জোর দিয়ে বলেন, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মধ্যে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষার দায়িত্ব কেবল মালিকদের একার নয়। যেসব বৈশ্বিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশি পোশাক কেনে, এই দায়ভার তাদেরও নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, কেবল উৎপাদকদের পক্ষে টেকসই মজুরি বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শ্রমিকদের জীবনযাত্রা সুরক্ষা এবং শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও দায়িত্বশীল ক্রয়নীতির মাধ্যমে অবদান রাখতে হবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ল্যারেন্ডন স্কলার ও মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী তাকবীর হুদা বাংলাদেশি পোশাক ক্রয়কারী পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে উদাসীন থাকার অভিযোগ তুলেছেন।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এমন একটি পক্ষই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। আর ওই পক্ষ হলো পশ্চিমা ক্রেতা ব্র্যান্ডগুলো, যারা এই শ্রমিকদের তৈরি পোশাক থেকে অর্জিত মূল্যের সিংহভাগ নিজেদের ঝুলিতে পুড়ছে।"
তাকবীর হুদা উল্লেখ করেন, এ বছরই গঠন করার কথা থাকলেও মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে কেবল শ্রমিকেরা আন্দোলনে নামার পর। তিনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আন্দোলন না করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে শ্রমিকদের এমনটা বিশ্বাস করার মতো কারণ খুবই কম। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট নিরসন না করা পর্যন্ত কেবল মজুরি বোর্ড গঠন শ্রমিকদের দাবি মেটাতে পারবে না।
আর লাইলী বেগমের জন্য নতুন মজুরি নির্ধারণের এই দীর্ঘসূত্রতার অর্থ হলো পরিবারকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মজুরি বাড়তেই হবে, কিন্তু একই সাথে খাবারের দামও কমাতে হবে।