Image description

পারিবারিক বিরোধের জেরে ধারালো বঁটির কোপে মাকে হত্যা করেছিলেন ছেলে। সেই নৃশংস ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো গ্রাম। ক্ষোভে ফুঁসছিলেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। হত্যার পর গ্রেফতার হয়ে কারাগারেও যেতে হয়। কিন্তু দুই মাসের মাথায় কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা যান সেই ছেলে। শেষ পর্যন্ত তার মরদেহ দাফন করা হয় সেই মায়ের কবরের পাশেই, যাকে হত্যা করেছিলেন তিনি।

যশোর সদর উপজেলার বাজে দুর্গাপুর গ্রামের এ ঘটনায় জানাজার আগে ছেলের পক্ষ থেকে এলাকাবাসীর কাছে ক্ষমা চান বাবা ও বড় ভাই। তাদের ক্ষমা প্রার্থনা এবং জানাজায় মানুষের ঢল—সব মিলিয়ে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয় গ্রামে।

মৃত মামুনুর রশিদ (৪৫) দুর্গাপুর গ্রামের আলতাফ হোসেন মাস্টারের ছেলে। তিনি ঝিকরগাছা উপজেলার লাউজানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। তার মায়ের নাম আনোয়ারা বেগম (৫৮)।

স্বজন ও স্থানীয় লোকজন জানান, গত ২৭ আগস্ট পারিবারিক বিষয় নিয়ে মা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান মামুন। একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে ধারালো বঁটি দিয়ে মাকে কোপ দেন। এতে আনোয়ারা বেগমের মৃত্যু হয়। চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এলে বঁটি ফেলে পালিয়ে যান মামুন। পরদিন এলাকাবাসীর সহযোগিতায় পুলিশ তাকে আটক করে। হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

কারাগারে বন্দি অবস্থায় গত ২৮ অক্টোবর হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন মামুন। প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে স্থানান্তর করা হয় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রবিবার রাত ৮টার দিকে মৃত্যু হয়।

 

আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশের পাহারায় মামুনের মরদেহ নিয়ে আসা হয় গ্রামের বাড়িতে। একদিকে মায়ের হত্যাকারী, অন্যদিকে নিজের সন্তান—মামুনের মরদেহ সামনে পেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তার বাবা আলতাফ হোসেন। তবে জানাজার আগে বাজে দুর্গাপুর আঞ্জুমানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ছেলের পক্ষে ক্ষমা চান তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বড় ছেলে প্রভাষক মঞ্জুর হাসান। তারা এলাকাবাসীর কাছে মামুনকে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ জানান।

পরে জানাজা শেষে পারিবারিক সিদ্ধান্তে মায়ের কবরের পাশেই দাফন করা হয় মামুনকে। স্বজনদের কান্না আর শোকের আবহে ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ। জানাজায় অংশ নেন শত শত মানুষ।

মামুনের বাবা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘মামুনের দুটি বিয়ে হয়েছিল। প্রায় ৮-৯ বছর আগে সদর উপজেলার ভেকুটিয়া গ্রামের মিথিলাকে বিয়ে করে। দাম্পত্য কলহের জেরে তাদের বিচ্ছেদ হয়। পরে ঝিকরগাছার অমৃতবাজার গ্রামের রিনাকে বিয়ে করে মামুন। প্রায় ছয় বছর আগে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গেও বিচ্ছেদ হয়। দুই স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের জন্য মামুন তার মাকে দায়ী করতো। এ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই কথা-কাটাকাটি হতো।’

আলতাফ হোসেন আরও বলেন, ‘পারিবারিক অশান্তির কারণে মামুন মানসিক সমস্যায় ভুগছিল। তাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসা শেষে ঘটনার দিন বাড়িতে ফেরে। বাড়িতে ফেরার পর মায়ের সঙ্গে কথা -কাটাকাটির একপর্যায়ে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘তুচ্ছ ঘটনায় স্ত্রীকেও হারালাম, সন্তানকেও হারালাম। প্রথমে অনেক ক্ষোভ জন্মালেও হাজার হোক, সে তো আমার ছেলে। তাই তাকে মাফ করে দিয়েছি। জানাজায়ও ছেলের পক্ষে এলাকাবাসীর কাছে মাফ চেয়েছি। আমার ছেলেকেও মাফ করুক, আমার স্ত্রীকেও আল্লাহ মাফ করুক—সৃষ্টিকর্তার কাছে এটাই চাই।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য গোলাম রব্বানি বলেন, ‘ছেলের হাতে মা খুনের ঘটনায় এলাকার মানুষ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী পলাতক মামুনকে আটক করে পুলিশে দেয়। তার প্রতি মানুষের ক্ষোভ ও ঘৃণা তৈরি হয়েছিল। তবে মামুনের মৃত্যুর পর মরদেহ বাড়িতে এলে মানুষের ঢল নামে। জানাজায় সেই ক্ষোভ ভুলে শত শত মানুষ অংশ নেন। পরিবারের ইচ্ছাতেই মায়ের কবরের পাশে মামুনকে দাফন করা হয়েছে। তুচ্ছ একটি ঘটনায় একটি পরিবার শেষ হয়ে গেলো। স্বজনেরা মামুনকে ক্ষমা করে দিলেও, মূলত ক্ষমা করে দেওয়ার মালিক সৃষ্টিকর্তা।’

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদ বলেন, ‘মামুনের মরদেহ সব আইনি কার্যক্রম শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তার দাফনও সম্পন্ন হয়েছে। তিনি কারাগারে যত দিন ছিলেন, তত দিন শান্ত স্বভাবের ছিলেন।’