Image description
 
আমার দেশ ও পত্রিকাটির বর্তমান সম্পাদক এবং প্রকাশক মুহতারাম মাহমুুদুর রহমানকে নিয়ে অনেকেই আজেবাজে লিখছেন সোস্যাল মিডিয়ায়। প্রত্যেকের নিজস্ব বাক স্বাধীনতা রয়েছে। আজেবাজে লিখতে পারেন। তবে সত্য ও বাস্তবতা জানানোটা আমি কর্তব্য মনে করছি। যারা না জেনে আজেবাজে লিখছেন তারা অন্তত প্রকৃত বিষয়টা জেনে রাখলে ভাল।
 
প্রথমত পত্রিকাটি জন্মের আগে আমি যোগ দিয়েছিলাম। তখনো পত্রিকার অফিস নেই। কোথায় অফিস হবে সেটাও নিশ্চিত নয়। কবে প্রকাশ হবে তার কোন হদিস নেই। এমন একটি পরিস্থিতিতে সর্বশেষ ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন, বছরে ৩টি বোনাস, বছর শেষে প্রতি নতুন বছরের শুরুতে আউটফিট বোনাসহ সব রকমের সুযোগ সুবিধা ছেড়ে অনিশ্চিত আমার দেশে যোগ দিতে হয়েছিল।
 
এরও একটা কারণ রয়েছে। আমার দেশ বের করার জন্য তখন পরিকল্পনায়। শুরুর দিকে পত্রিকাটির নির্বাহি সম্পাদক (বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করতেন) রশিদ উন নবী বাবু ভাই মূলত অর্গানাইজের দায়িত্বে ছিলেন। তৎকালীন খ্যাতিমান সাংবাদিক নেতা আমানুল্লাহ কবীর ভাই সম্পাদক হিসেবে যোগ দেবেন নিশ্চিত করেছেন। তখনো পত্রিকার কোন ক্যাম্প অফিস হয়নি। সৈয়দ আবদাল আহমদ ভাই একদিন প্রেসক্লাবে আমার সাথে দেখা। তিনি বললেন, এনটিভি’র প্রধান বার্তা সম্পাদক রশিদ উন নবী ভাই আপনার ফোন নম্বর নিয়েছে। তিনি আপনাকে ফোন দেবেন। ফোন দিলে রিসিভ কইরেন।
 
একদিন পরই বাবু ভাই ফোন দিলেন। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, চিনতে পারছো আমাকে। কারণ, এর আগে বাবু ভাইয়ের সাথে কখনো আমার সরাসরি কথাবার্তা হয়নি। বললাম, আপনার নাম শুনেছি। আপনি যুগান্তরের নিউজ অ্যাডিটর ছিলেন। এখন এনটিভিতে আছেন। তখন বাবু ভাই বললেন, তোমার সাথে একটা বিষয়ে কথা বলতে চাই, কবে আসতে পারবে এনটিভিতে। কখন আসলে ভাল হয় জানতে চাইলাম। তোমার যখন সুবিধা হয় আসো, বললেন তিনি। পরের দিন সকাল ১০টায় যাবো ঠিক করলাম আমরা।
 
সে অনুযায়ী ১০টায় এনটিভি অফিসে গেলাম। রিসিপশনে গিয়ে বললাম বাবু ভাইয়ের সাথে অ্যপয়েন্টমেন্ট আছে ১০টায়। তারা ভেতরে বার্তা দিলেন। বাবু ভাই নিজেই রিসিপশনে এসে আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর রুমে। অনেক কথাবার্তা। তিনি জানালেন, আমার দেশ নামে একটি নতুন পত্রিকা হবে। আধুনিক ছাপার যন্ত্রপাতিসহ বড় মিডিয়া করার চিন্তা রয়েছে মালিক পক্ষের। কারা মালিক পক্ষ জানতে চাইলাম। মোসাদ্দেক আলী ফালুসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী রয়েছেন, জানালেন তিনি।
 
অনেক কথাবার্তার পর বাবু ভাই বললেন, আমরা তোমাকে চাই আমাদের সাথে। তখন আমি আরো কিছু বিষয়ে প্রশ্ন করে জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে বর্ণনা করলেন। এটাও জানালেন সম্পাদক হবেন আমানুল্লাহ কবীর ভাই।
 
তাঁর কথায় ও পরিকল্পনা শুনে আমি মনে মনে কনভিন্স হলাম। তবে বাবু ভাইকে বললাম চিন্তা করে জানাবো। তখন ছিল ২০০৩ সালের নভেম্বর মাস।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাবু ভাই আবারো ফোন দিলেন। বললেন, সময় করে আসো। আমরা একটা ক্যাম্প অফিস নিয়েছি। দেখে যাও। এটা এনটিভি যে ভবনে সেটার টপ ফ্লোরে। পরের দিনই গেলাম। গিয়ে দেখলাম অস্থায়ীভাবে তৈরি ৩টি ছোট রুম। একটিতে সম্পাদক আমানুল্লাহ কবির ভাই বসেন। একটিতে বাবু ভাই ও আরেকটিতে প্রস্তাবিত আমার দেশ-এর জি এম (জেনারেল ম্যানেজা) আবু সুফিয়ান বসনে। আবু সুফিয়ানের সাথে সহযোগিতার জন্য কামরুল ভাই। তিনি যুগান্তরে সম্পাদনা বিভাগে কাজ করতেন।
 
বাবু ভাই কুশল বিনিময় করে জানতে চাইলেন আমার সিদ্ধান্ত কি। আমি তখন সম্মতির কথা জানাই। তিনি খুশি হলেন। বললেন, তাহলে ভালই হলো। অ্যাপয়েনমন্টে লেটারটা নিয়ে যাও। তোমাকে দিয়ে রিপোটিং অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার উদ্ভোধন হোক। আমি তো সিভি আনি নাই। বললাম তখন।
 
সিভি পরে দিলেও চলবে। তোমাকে তো কাজ দেখে আমরা অফার করেছি। সিভি যোগদানের সময় দিলেই হবে। বাবু ভাই বললেন আমাকে।
ইতোমধ্যে সুফিয়ান সাহেবকে ডেকে আমার নাম ও ঠিকানা, পদবী ও বেতন-স্কেল লিখে দিলেন। বললেন, ওর অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার ইস্যু করেন।
সুফিয়ান সাহেব অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার লিখে রেডি করে নিয়ে আসলেন বাবু ভাইয়ের রুমে। তিনি আমার হাতে সেটা দিলেন।
 
একথা গুলো বললাম পত্রিকাটির কোন পরিস্থিতিতে কিভাবে আমি যোগদান করেছিলাম সেটা জানলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে আতুর ঘর থেকেই আমি এ পত্রিকাটির যাত্রার সাথে ছিলাম। কারো দয়ায় বা তদবীরে এখানে চাকুরি করতে আসিনি।
 
অ্যপয়েনমেন্ট লেটার হাতে দিয়ে বাবু ভাই বললেন, এটা ঘরে রেখে দাও। মার্চ অথবা এপ্রিলে যোগদান করা লাগতে পারে। যখন বলবো তখন ইনকিলাবে একমাস আগে জানিয়ে দিও। নিয়ম হচ্ছে চাকুরি ছাড়ার একমাস আগে জানানো। কিভাবে ছাড়তে হবে সেটাও তিনি বলে দিলেন। তবে এখন কাউকে কিচু বলার দরকার নাই।
ঠিক এভাবেই রাখলাম। কেউ জানে না। এমন কি আমার বউকেও জানাই নাই। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে অস্থিত্বহীন আমার দেশ-এর অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার ঘরে।
ফেব্রুয়ারীর ১০ তারিখের দিকে মনে করলাম একবার যাই। গিয়ে দেখে আসি আমার দেশ-এর অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে। সেদিন ছিল ইনকিলাবে আমার অফ ডে। ক্যাম্প অফিসে গিয়ে দেখলাম অনেকেই আসা-যাওয়া করছেন। ইতোমধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে বড় বাজেটে আমার দেশ নামে একটি নতুন পত্রিকা বাজারে আসছে। কারা এখানে যোগ দিতে পারেন সেটাও বাতাসে ভেড়ে বেড়াচ্ছে। সাথে আমার নামটা কেউ কেউ বলছেন। তবে আমাকে জিজ্ঞেস করলে কৌশলী উত্তর দেই।
 
ওইদিন আমার দেশ ক্যাম্প অফিস থেকে বের হয়ে নিজে নামলাম। ইনকিলাবে চীফ রিপোর্টার মঞ্জু ভাই (মঞ্জুরুল আলম) ফোন দিলেন। কোথায় তুমি? দরাজ গলায় জিজ্ঞেস করলেন। আমি একটু ফার্ম গেটে এসেছি জরুরী কাজে। জবাবে জানালাম আমি।
 
আজকে তোমার অফ ডে ক্যান্সেল। দ্রুত অফিসে আসতে হবে। আজকে কেবিনেট মিটিং হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে শুনলাম। সে গুলো খোজ নিয়ে আসো। তোমাকে আজকে কেবিনেট মিটিং নিয়ে নিউজ লিখতে হবে। মঞ্জু ভাইয়ের হুকুম তামিল করার চেষ্টায় নেমে পড়লাম। কেবিেেনটের বিষয়ে দু/একজন মন্ত্রীকে ফোন দিয়ে জানার চেষ্টা করলাম। একাধিক সংবাদিককেও ফোন দিলাম। বেসিক ইনফরমেশন গুলো পেয়ে গেছি অফিসে যাওযার পথে।
 
অফিসে পৌছার পর মঞ্জু ভাই বললেন, আজকে এটা লিড হবে। ভল করে লেখ।
লেখার পর নিউজ জমা দিলাম। মঞ্জু ভাই পড়ে নিউজ অ্যাডিটরকে দিলেন। আমাকে বললেন জরুরী কথা আছে বসো। তাঁর রুমে তখন দু/একজন ছিলেন। তাদের বললেন, আপনারা একটু বাইরে যান। ওর সাথে জরুরী কিছু কথা আছে।
 
মঞ্জু ভাই আমার কাছে জানতে চাইলেন কোথায় চাকুরির জন্য অফার অথবা অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার আমি গ্রহন করেছি কি না। হঠাৎ মঞ্জু ভাইয়ের মুখে এটা শোনে আমি কিছুটা হতবাক। তখন বললাম হঠাৎ করে এ প্রশ্ন কেন! মঞ্জু ভাই বললেন, অ্যাডিটর সাহেব শোনেছেন তুমি নতুন কোন জায়গায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে গেছ। কনফার্ম হওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন আমাকে (মঞ্জু ভাইকে)।
আমি তখন বললাম জি, অফার পেয়েছি। আমার দেশ নামে নতুন একটা পত্রিকা আসছে। ওখান থেকে আমাকে অফার করা হয়েছে। এটা শোনে তিনি অম্ল-মধুর অনেক কথা বললেন। তারপর বললেন, তহালে আমরা ধরে নিচ্ছি তুমি আগামীকাল থেকে আমাদের সাথে আর নাই। অ্যাডিটর সাহেব বলে দিয়েছেন যদি চুক্তিবদ্ধ হয়ে থাকো তাহলে তুমি রিজাইন লেটার দিয়ে যাও। আমি তখন বললাম, আজ তো রাত হয়ে গেছে। অ্যাডমিটে কেউ নেই। আগামীকাল সকালে এসে রিজাইন লেটার দিয়ে দেব। এই বলে বিদায় নিলাম।
 
পরের দিন রিজাইন লেটার দিলাম। ২০০৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী থেকে ইনকিলাবে ছাড়লাম। ১১ ফেব্রুয়ারী বাবু ভাই ফোন দিলেন। তিনি বললেন অফিস আসো আজই। যাওয়ার পর বললেন, শুনলাম ইনকিলাব থেকে তোমাকে রিজাইন করতে হয়েছে। আজই এখানে যোগদান করো। যোগদান লেটারে স্বাক্ষর করে যাও। তোমার বেতন আজকে থেকেই কাউন্ট হবে। সেদিন আমার দেশ-এ যোগদান করি। তখনো পত্রিকা অস্থিত্বহীন অবস্থায়। পরবর্তীতে পত্রিকা বের হয়েছে ২০০৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। এরমধ্যে অনেক কাহিনী রয়েছে। সেটা এখানে আর বললাম না।
পর্ব দুই
 
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী জরুরী আইন জারি হয়। পত্রিকার চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী ফালু ভাই গ্রেফতার হন। পত্রিকার পরিচালন এনায়তুর রহমান বাপ্পি গ্রেফতার হন। ওরিয়ন গ্রুপের ওবায়দুল করিম পলাতক। ওরিয়ন গ্রুপের ওবায়দুল করিম এবং তাঁর ভাই পরিচালক হিসেবে মালিকানায় ছিলেন।
 
পত্রিকার পরিচালকদের কেউ কারাগারে। কেউ পলাতক। আমার দেশ-এর এমডি ফালু ভাইয়ের বড় ভাই আলহাজ্জ হাসমত আলী। তিনি খুবই ভদ্র মানুষ। তিনি আয়ের উৎস ছিলেন ফালু ভাই ও অন্যান্য পরিচালক বৃন্দ।
এই অবস্থায় পত্রিকাটি আর্থিক সঙ্কটে পড়ে। ২০০৪ সালের মার্চ মাস থেকে বেতন-ভাতা অনিয়ম শুরু হয়। এপ্রিল থেকে পুরোপুরি বন্ধ বলা চলে। কিন্তু যতটুকু আয় হয় তা দিয়ে কোনরকমে কাগজ কালি কেনা চলে। বেতন-ভাতা দেওয়ার অবস্থা নেই। তখন সম্পভব মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকা লাগতো বেতন-ভাতায়।
 
বেতন-ভাতা বন্ধ অবস্থায় অনেক চড়াই-উৎরাই। এক পর্যায়ে আমরা নিজেরা দায়িত্ব নেই। নিজেদের মধ্যে সিনিয়রদের নিয়ে কমিটি করে পত্রিকা পরিচালনা করি। মালিকপক্ষ পত্রিকা বিক্রি করে দেবেন ঘোষণা দিলেন। ইতোমধ্যে ২০০৮ সালের জুন মাস চলে এসেছে। এক বছরের বশি বেতন বকেয়া। আমরা নাছোড়বান্দা, খেয়ে না খেয়ে পত্রিকা জীবীত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
 
এই অবস্থায় উপদেষ্টা সম্পাদক বিবিসিখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদ স্যার মাহমুদুর রহমানের কাছে গেলেন। তিনি তাঁকে বুঝিয়ে পত্রিকাটির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ করলেন (আতাউস সামাদ স্যার বিভিন্ন প্রসঙ্গে একাধিকবার বিষয়টি আমাকে বলেছেন)। প্রথমে মাহমুদুর রহমান রাজি হননি। আতাউস সামাদ স্যারের অনুরোধে সাংবাদিকদের কষ্টের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাজি হলেন। তাঁর সুহৃদ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে সহযোগি হিসেবে নিলেন। তারাও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। প্রথম মূল উদ্দেশ্য পত্রিকাটির দায়িত্ব নিয়ে প্রায় চার শতাধীক সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর বেকারত্ব দূর করা। আর্থিক দুরাবস্থা থেকে রেহাই দেওয়ার চেষ্টা করা।
 
এই অবস্থায় পত্রিকার দায়িত্ব নিলেন ২০০৮ আগষ্ট মাসের শুরুর দিক থেকে। পত্রিকার দায়িত্ব নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি বেতন-ভাতা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। সে অনুযায়ী ২০১০ সালের ১ জুন গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর ওয়াদা রক্ষা করেছিলেন।
 
সুতরাং যারা পত্রিকার মালিকানা ও সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে আজেবাজে বলেন, তাদের প্রতি অনুরোধ বিষয় গুলো একটু জেনে তারপর লিখেন।