সাম্প্রতিক সময়ে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এতে প্রায় ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকপক্ষ। বিদেশি ক্রেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। ফলে শীর্ষ কার্যাদেশের মৌসুমে বাজার ধরে রাখা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে উপায় না পেয়ে বিজিএমইএ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে তারা কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একদিকে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ও কাজের পরিবেশ ঘিরে অসন্তোষ, অন্যদিকে সময়মতো পণ্য সরবরাহ বজায় রাখার কঠিন চাপে পড়েছেন পোশাক খাতের শিল্পমালিকরা। ক্রেতাদের বড় একটি অংশের শীতকালীন ও আগামী বসন্তের নতুন কার্যাদেশ পাঠানোর এই সময়ে শিল্পাঞ্চলের এমন বিশৃঙ্খলা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলছে। তারা বলেন, নভেম্বর মাস পর্যন্ত শীতকালীন মৌসুমের পোশাক রপ্তানি চলমান থাকবে। এর মধ্যেই অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। তাই সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ না করতে পারলে আস্থা হারাবেন বিদেশি ক্রেতারা। পোশাক খাতের বার্ষিক মোট আন্তর্জাতিক রপ্তানি আদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে এই নির্দিষ্ট সময়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ায় ন্যায্য মজুরির দাবি যেমন যৌক্তিক, তেমনি কারখানার উৎপাদনশীলতা চলমান রাখাও জরুরি। তবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অসন্তোষের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা ইন্ধন রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে নতুন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। কিন্তু নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির অনিশ্চিত সরবরাহ, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন ব্যয়— সবমিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়াতে আগ্রহী নন। এতে চাপে পড়ছেন দেশের পোশাক রপ্তানিকারকেরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ আয় কমেছে ১.৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পোশাকের অংশীদারত্ব ১০.৫৩ শতাংশে উন্নীত হলেও ভিয়েতনাম ২১.৫০ শতাংশ বাজার হিস্যা নিয়ে এগিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ বড় বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান থাকলেও প্রতিযোগীদের সঙ্গে ব্যবধান এখনো উল্লেখযোগ্য।
ইউরোপের বাজারেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.৬৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে চীন, ভিয়েতনাম ও ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এ ছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশ ছিল ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬.৭৬ শতাংশে। বিপরীতে ভিয়েতনামের বাজার হিস্যা বেড়ে হয়েছে ৬.৫৩ শতাংশ।
এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে দেশের রপ্তানিকারকদের উৎপাদন ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান শিল্পসংশ্লিষ্টরা। অথচ ক্রেতাদের কাছ থেকে সেই অনুপাতে পণ্যের দাম পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ দামের পার্থক্যেও বড় অঙ্কের অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি চাপে রয়েছেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের অন্যতম একটি বড় পণ্য হলো শীতকালীন পোশাক। বিশ্ববাজারে বিশেষ করে ইউরোপ এবং আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে শীতকালীন জ্যাকেট, সোয়েটার, কার্ডিগান এবং হুডির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বাংলাদেশের সামগ্রিক তৈরি পোশাক রপ্তানি ৫.৮৮% বৃদ্ধি পেয়ে ১৭.০৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার বড় একটি অংশ জুগিয়েছে সোয়েটার এবং বটমওয়্যারের মতো বেসিক শীতকালীন পোশাকগুলো। ট্রাউজার, হুডি এবং বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম তন্তুর শীতকালীন পোশাকের রপ্তানি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, শীতকালীন পোশাক রপ্তানি প্রায় মোটামুটি শেষের দিকে। তবে নভেম্বর মাস পর্যন্ত এই মৌসুমের পোশাক রপ্তানি অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, বিদেশি ক্রেতারা এখন নতুন অর্ডার দেয়া শুরু করেছেন। এর মধ্যেই পোশাকশিল্পে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, যা কারোরই কাম্য ছিল না। ফলে ক্রেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।