বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে বহুল প্রচলিত পরিভাষা ‘ক্রসফায়ার’ মূলত ভারতে নকশালদের নিধনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট ‘এনকাউন্টার’ শব্দের এদেশীয় সংস্করণ বলে মন্তব্য করেছেন লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ১৯৭২ সালের সেই পুরোনো স্ক্রিপ্ট ধরে আজও দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো রোবটের মতো কাজ করে যাচ্ছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর দ্বিতীয় পর্বে প্রধান বক্তার বক্তব্যে মহিউদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন। জাদুঘরের মনসুন থিয়েটারে ‘রক্ষীবাহিনী ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ শীর্ষক এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে নকশাল নাম দিয়ে যাকে-তাকে ধরে মেরে ফেলার মহাকর্মযজ্ঞ চলছিল। পরবর্তীতে সেটির নাম দেওয়া হয় ‘এনকাউন্টার’। ভারতের মণিপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এটি এখনও নিয়মিত ঘটনা। সেই এনকাউন্টার সংস্কৃতিই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এসে ক্রসফায়ারে রূপ নেয়।
ক্রসফায়ারের বহুল প্রচলিত বয়ানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘স্ক্রিপ্টটা কী? প্রথমে বলা হয়, তার কাছে অস্ত্র আছে। সে ক্ষতিকর, সন্দেহভাজন ও বিপজ্জনক লোক। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করে অস্ত্র উদ্ধারে নিয়ে যাওয়া হলে তার সহযোগীরা আক্রমণ করে। তখন আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়। অথচ পুলিশের আত্মরক্ষার একটি আইনগত ক্রম আছে। অনুনয়-বিনয়, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং শেষে নিরুপায় হয়ে গুলি। কিন্তু ১৯৭২ সালে যে স্ক্রিপ্ট লেখা হয়েছে, এখনও সবাই রোবটের মতো সেটাই অন্ধভাবে অনুসরণ করছে।’
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশের সাবেক এক আইজিপি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্বীকার করেছিলেন, পুলিশ সদস্যরা ক্রসফায়ারকে মজা করে ‘খরচ ফায়ার’ বলে থাকেন। এটি ১৯৭২ সালেই শুরু হয়েছিল। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ও শামসুন্নাহার হলের মধ্যবর্তী রাস্তায় প্রায়ই অজ্ঞাতপরিচয় লাশ পড়ে থাকত। সরকার বদল হলেও রাষ্ট্রের নিপীড়ক খাসলতের পরিবর্তন হয় না। একই বাহিনীকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র একই পদ্ধতিতে কাজ চালায়। ফলে কখনোই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পায় না।
তিনি বলেন, তৎকালীন সরকার একদিকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চোরাচালান ও কালোবাজারি দমনের নামে একে প্রশাসনিক হাতিয়ার হিসেবে ন্যায্যতা দিত। অন্যদিকে ভিকটিমদের কাছে এটি ছিল এক ভয়ংকর নির্যাতনকারী প্রতিষ্ঠান।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সূচনা পুলিশের হাত ধরে হলেও রক্ষীবাহিনী গঠনের পর তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ১০-১১ হাজার সদস্যের রক্ষীবাহিনীর জলপাই রঙের পোশাকের সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোশাকের সাদৃশ্য থাকায় জনমনে ব্যাপক ভীতি ও সন্দেহের জন্ম হয়। জাসদ, সর্বহারা পার্টিসহ বামপন্থী দলগুলোর তৎপরতা থাকা অঞ্চলগুলোতে ত্রাস সৃষ্টি করতে এদের নামানো হতো।
রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ক্যাম্পে আটক ব্যক্তিদের ‘বাঁশ ডলা’ দেওয়া, নাভিতে চালের খুদ দিয়ে ডলে দেওয়া, মুখে গামছা বেঁধে সাবান-পানি ঢেলে ‘ওয়াটারবোর্ডিং’ করা এবং প্লায়ার্স দিয়ে নখ উপড়ে ফেলার মতো বর্বর পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো।
সিরাজ শিকদার হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে নূর খান লিটন বলেন, তাঁকে গ্রেপ্তারের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সাভারে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। ২০০২ সালে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এ অর্ধশতাধিক মৃত্যুর ঘটনায় দায়মুক্তি বাতিল হলেও আজ পর্যন্ত একটি মামলাও হয়নি। এ ছাড়া বিগত সাড়ে ১৫ বছরে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি গুমের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।