Image description

সরকারি চাকরিতে চাকরিজীবীর ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই-বাছাই করা নতুন কিছু নয়। নিয়োগ, পদোন্নতি, কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংয়ের সময়— এগুলো খতিয়ে দেখা হয়। কিন্তু স্কুল লাইফে কে বন্ধু ছিল, সে তথ্যও তালাশ করছে পুলিশ! মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার সদস্যদের বিষয়ে ২৬ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে পুলিশের স্কুলবন্ধু কারা ছিলেন, চাওয়া হয়েছে তাদের তথ্যও।

এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দল বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভূমিকা ও বর্তমান কর্মকাণ্ড যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ইউনিটে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের তালিকা করে তাদেরও করা হচ্ছে পর্যবেক্ষণ। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘পুলিশ সদস্যদের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি জটিল করে দেখার কিছু নেই। অনলাইন ডেটাবেজ তৈরির জন্যও অনেক সময় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।’

সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে— এ আশঙ্কায় আগে থেকেই বাহিনীর ভেতরে কঠোর শৃঙ্খলা ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে এসব পদক্ষেপ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) কামারুম মুনিরা আগামীর সময়কে বললেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে কিছু আলোচনা ও বক্তব্য আমাদের নজরে আছে। পুলিশ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। গোয়েন্দা নজরদারি, টহল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত আছে। কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে, সহিংসতা বা নাশকতায় জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।’ পুলিশ সদস্যদের ভেটিং ও ছুটি নিয়ে কড়াকড়ির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘ভেটিংয়ের বিষয়টি একেবারে গোপনীয়। এটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ করলেও করতে পারে। আমার জানার কথা নয়। মিডিয়াতেও জানানোর বিষয় নয়।’

চট্টগ্রাম নগর ও জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের কয়েক কর্মকর্তার সঙ্গে আগামীর সময়ের আলাপ হয়েছে এসব বিষয়ে। ডিসেম্বরে কী হতে যাচ্ছে, এ নিয়ে উদ্বেগ আছে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন অনেকেই। নগর পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যাদার অন্তত তিন কর্মকর্তা জানালেন, কারও নিয়মমাফিক ছুটি প্রয়োজন হলে নভেম্বরের মধ্যেই সেটা ভোগ করার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বরে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ছুটির আবেদন মঞ্জুর হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী আগামীর সময়কে বললেন, ‘ডিসেম্বর নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো উদ্বেগ নেই। আমরা এটা নিয়ে ভাবছি না। আমরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে আমাদের রুটিনওয়ার্ক করে যাব।’ ছুটি নিয়ে কড়াকড়ির বিষয়ে তিনি বললেন, ‘এখনো পর্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মেই ছুটি পাচ্ছেন সবাই।’

তবে সরকারের পক্ষ থেকে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা মোকাবিলায় কঠোর অবস্থানের কথা সম্প্রতি বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এরপর গত ২৫ অক্টোবর সুনির্দিষ্ট পুলিশ সদস্যদের তালিকা অনুযায়ী ভেটিংয়ের নির্দেশনা বিশেষ শাখা থেকে বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। এতে ২ নভেম্বরের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়। ব্যক্তিগত পরিচিতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য ছাত্রজীবনে কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ পোষণ করেন কি না, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটিয়েছিলেন কি না, বিগত (আওয়ামী লীগ) সরকারের সময় কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন— তার তথ্য জানতে চাওয়া হয়।

পাশাপাশি ২৬ ধরনের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও চাকরি-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তথ্যের মধ্যে রয়েছে— কর্মকর্তাদের বর্তমান ও পূর্ববর্তী কর্মস্থলের বিবরণ। শিক্ষাজীবনের বিস্তারিত তথ্য যার মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও সে সময়ের পরিচিত বন্ধুদের নাম ও নাম্বার। মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালক-শ্যালিকা, মামা, চাচা, ফুফু ও খালাসহ নিকটাত্মীয়দের বিস্তারিত পেশা। বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা। এ ছাড়া চাকরির ইতিহাস, কর্মস্থল, পদায়ন ও বিভাগীয় শাস্তি-সংক্রান্ত তথ্য।