
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আর অস্বস্তি চায় না ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। কূটনৈতিক পর্যায়ে এহেন সিদ্ধান্ত থাকলেও দুই দেশের সম্পর্কে ‘ঠান্ডা লড়াই’ থামছে না।
সম্প্রতি ওমানের রাজধানী মাস্কাটে ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনের ফাঁকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠকের পর দিল্লিতে বাংলাদেশি দূতের নিয়োগ প্রস্তাব (এগ্রিমো) গ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি নতুন বার্তা দেয়। তবে ঢাকা-দিল্লির ‘ঠান্ডা লড়াই’ যে এখনো থামেনি, সেটি স্পষ্ট করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর।
চলতি সপ্তাহে নয়া দিল্লির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য উৎসবে দেওয়া বক্তব্যে জয়শঙ্কর বলেন, বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা ভারতের সঙ্গে কোন ধরনের সম্পর্ক চায়। ভারতের বিদেশমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পাল্টা বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। জয়শঙ্করের সুরেই তিনি বলেন, ভারতকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কেমন সম্পর্ক চায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় কাজ করা স্থানীয় কূটনীতিকরা বলছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য বেশ শক্তিশালী। কূটনীতিক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এ ধরনের বক্তব্য দুটি কারণে দিতে পারেন। প্রথমত, কেউ যখন খুব আত্মবিশ্বাসী হয় বা প্রতিপক্ষের কোনো একটা দুর্বলতা খুঁজে পায়। দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষ হয়তো কৌশলী হয়ে গেছে।
ঢাকার নির্ভরযোগ্য বেশ কয়েকটি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে ভারতের সঙ্গে আর যেন সম্পর্ক খারাপ না হয়, সেই নির্দেশনা রয়েছে। তবে দায়িত্বশীল উপদেষ্টা (পররাষ্ট্র) ছাড়াও সরকারের অন্য উপদেষ্টাদের ভারতবিরোধী বক্তব্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়কে অস্বস্তিতে ফেলছে। কোনোভাবে ভারতবিরোধী হইচই বন্ধ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় এক জৈষ্ঠ্য কূটনৈতিক বলেন, আমরা চেষ্টা করছি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যেন আর খারাপ না হয়। অন্যদিকে, দায়িত্বশীল উপদেষ্টার বাহিরে সরকারের কিছু উপদেষ্টার আচার-আচরণ ভিন্ন, এটা কিন্তু বিতর্কিত হয়ে গেল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমরা একটা মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করছি, সরকারের অন্য উপদেষ্টারা আরেকটা বার্তা দিচ্ছে। একইভাবে ভারতের দিক থেকেও এমনটা হচ্ছে। দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে দুই দেশেরই রাজনীতিবিদদের কথাবার্তায় সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব কিন্তু উপদেষ্টা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে গুড ওয়ার্কিং রিলেশন চায় বাংলাদেশ। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে বাংলাদেশ।
দক্ষিণ এশিয়ার ওপর ভালো জানাশোনা থাকা সাবেক এক রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রতিবেশী তো বদলানো যাবে না। প্রতিবেশীর সঙ্গে যতটা সম্ভব সুসম্পর্ক রেখেই চলতে হবে। সামনের বছরগুলোতে তাদের সঙ্গে আমাদের চলতে হবে। ভারতের কোনো ইস্যুতে আমাদের আপত্তি থাকলে সেটা কূটনৈতিক চ্যানেলে আমরা সংলাপ করে সমাধান করতে পারি। জয়শঙ্কর যেটা বলেছে, আমি মনে করি কূটনৈতিক চ্যানেলে তাকে মেসেজ দেওয়া উচিত। ওনার বক্তব্য অনেক স্ট্রং হয়ে গেছে। আমরাতো চাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে। আমরাতো বলি নাই, আমার খারাপ করতে চাই। সরকারের বাহিরে যারা আছেন তারা যা ইচ্ছে বলতে পারেন, কিন্তু সরকারে যারা আছেন তাদের আরও সাবধান হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।
সাবেক এ রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ভারত ইস্যুতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে বার্তা সেটি অন্য উপদেষ্টাদের জানানো উচিত বলে আমি মনে করি। অন্যদের কাছে এই বার্তা যদি না থাকে, ওনারা এটা ফলো করতে পারবেন না। অন্য কলিগদের বোঝাতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন, দায়িত্বশীল উপদেষ্টার বাহিরে সরকারের অন্য উপদেষ্টারা কোনো বার্তা দিলে প্রতিপক্ষ আপনার দুর্বলতা বুঝে ফেলবে। দুর্বলতা যদি প্রতিপক্ষ বুঝে যায় তাহলে তো কথাই নাই। জয়শঙ্করের এ ধরনের বক্তব্য অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে দিয়েছেন বলে আমার মনে হয়। আমাদের উচিত দায়িত্বশীল উপদেষ্টাকে তার বিষয় দেখভালে ছেড়ে দেওয়া। সবাই যদি বলতে চায় তাহলে কিন্তু বুমেরাং হবে। আর ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য এলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রতিবাদ জানাবে বা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
জয়শঙ্কর বলেছেন, বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা নয়াদিল্লির সঙ্গে কোন ধরনের সম্পর্ক চায়। এই দুই প্রতিবেশী দেশ খুবই বিশেষ ইতিহাস ধারণ করে, যার শিকড় ১৯৭১ সালে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। প্রতিদিন অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ একজন সবকিছুর জন্য ভারতকে দায়ী করে, আপনি খবরগুলো দেখেন তাহলে দেখবেন সেগুলো খুবই হাস্যকর।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আপনি এক পক্ষ থেকে বলতে পারেন না, আমি এখন আপনার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চাই। কিন্তু আমি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠি এবং সবকিছুর জন্য আপনাকে দায়ী করি, তাহলে তা ভুল হয়। এটা একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার, যা তাদের নিতে হবে। ভারত ঢাকাকে খুবই স্পষ্ট একটি ইঙ্গিত দিয়েছে। সেটি হলো ভারত দেখতে চায় এসব বন্ধ হয়েছে এবং স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরায় চালু হয়েছে। কিন্তু সীমান্তের ওপার থেকে ক্রমাগত আসা বিদ্বেষী বার্তায় অসন্তুষ্ট নয়াদিল্লি।
জয়শঙ্করের পাল্টা জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ভারত কেমন সম্পর্ক চায়, সে সিদ্ধান্ত ভারত নেবে। আমাদের খুব স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এ ব্যাপারে আছে। আমরা ভারতের সঙ্গে গুড ওয়ার্কিং রিলেশন চাই। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এই সম্পর্ক। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো অস্পষ্টতা নেই।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, বাংলাদেশের বিভিন্নজন সরকারের ভেতর থেকে কথাবার্তা বলছেন। আমি এটার (জয়শঙ্করের বক্তব্য) ন্যায়–অন্যায়, উচিত–অনুচিত বিচার করতে চাই না। এ রকম কথা আমাদের এখান থেকে বলছে, ওনাদের ওখান (ভারত) থেকেও বলছে। ওনাদের মুখ্যমন্ত্রী তো পারলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠিয়ে দেন। ওনাদের একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তো অহরহ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বলেই যাচ্ছেন। এগুলো চলতে থাকবে ধরে নিয়েই তো আমরা সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করছি। কাজেই আমাদের অবস্থান হলো আশপাশ থেকে দু–চারজন কী বলল না বলল, সেটাতে মনোযোগ না দিয়ে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করি।
৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অস্বস্তি দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার সাত মাস পার করলেও দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের টানাপড়েন থামছে না। বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করার কথা অন্তর্বর্তী সরকারের। এদিকে আগামী ডিসেম্বরেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। কোনো কারণে ডিসেম্বরে সম্ভব না হলে আগামী বছরে নির্বাচন হওয়ার কথা বলছে সরকারের সংশ্লিষ্টরা। তবে কি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় না আসা অবধি ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক এভাবে চলতে থাকবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর দেওয়া বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, দুই দেশের সার্বিক সম্পর্ক নির্বাচিত সরকার (বাংলাদেশে) এলেই তা স্বাভাবিক হবে।