Image description
ইসলামিক স্কলার মুফতি আলী হাসান উসামা বলেন, “আজ থেকে নয়, প্রায় দেড় যুগ আগেই জামায়াতের সব বই পড়েছি। জামায়াতের প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়, বরং সমালোচনা করার জন্যই বইগুলো পড়েছি। ভুল ধরার উদ্দেশ্যে আমি যে পরিমাণ পড়াশোনা করেছি, বাস্তবে অনেকেই দল করার জন্যও এতটা পড়াশোনা করেননি। তবে পড়তে পড়তে শেষ পর্যন্ত দেখেছি, জামায়াতের বিরুদ্ধে যেসব সমালোচনা ও আপত্তি করা হয়, তার অনেকগুলোই জুলুমের পর্যায়ে পড়ে। বাস্তবতার সঙ্গে সেগুলোর মিল নেই। এখন যদি কোনো বইয়ে সাহাবিদের ব্যাপারে ভুল বক্তব্য থাকলেই সেই বই বাদ দিতে হয়, তাহলে কওমি মাদ্রাসার অনেক বইও বাদ দিতে হবে। একই যুক্তিতে কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও সাহাবিবিদ্বেষের অভিযোগ উঠতে পারে। কিন্তু শুধু মুখের দাবিতে তো হবে না, এর পক্ষে দলিল দেখাতে হবে। এ জন্য আমি কয়েকটি দলিল তুলে ধরছি। বাকিটা আপনারা নিজেরাই বিবেচনা করতে পারবেন।”
 
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জুমার খুতবার আলোচনায় তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার মুতাওয়াসসিতাহ তৃতীয় বর্ষে ‘খেলাফতে বনু উমাইয়া’ নামে একটি বই পড়ানো হয়। বইটি আপনারা নিজেরাই পড়ে দেখতে পারেন। সাহাবিদের ব্যাপারে এতে কী ধরনের মন্তব্য রয়েছে, তা এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি না। সময়ের স্বল্পতার কারণে সে আলোচনায়ও যাচ্ছি না। তবে বইটির নাম বলে দিলাম। অন্যদিকে ‘খেলাফতের আশা’ বইটি তুলনামূলক ভালো। সেই বইয়ের ২২৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘হযরতের বিক্ষিপ্ত আক্রমণ’ শিরোনামে একটি অংশ রয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘হযরত মুয়াবিয়া এ ব্যাপক বিশৃঙ্খলা থেকে ফায়দা হাসিল করেন। হিজরি ৩৯ সালের শুরুতে যখন খেলাফতের অধিকৃত এলাকাগুলোতে ফেতনা-ফাসাদের আগুন জ্বলে উঠেছিল এবং আলীপ্রেমিকদের উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে যাচ্ছিল, তখন হযরত মুয়াবিয়া বিভিন্ন এলাকায় হিংস্র আক্রমণ শুরু করেন। মুয়াবিয়ার এসব আক্রমণের ফলে তার সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত না হলেও ইসলামী খেলাফতের ভিত দুর্বল হয়ে যায়। হযরত আলীর অধিকৃত এলাকায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে।’
 
“এখানে হযরত মুয়াবিয়ার আক্রমণকে ‘হিংস্র আক্রমণ’ বলা হয়েছে এবং এর ফলে ইসলামী খেলাফত ও হযরত আলীর শাসন দুর্বল হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাহলে এই বক্তব্যে কি হযরত মুয়াবিয়ার প্রশংসা করা হয়েছে, নাকি সমালোচনা করা হয়েছে? অথচ বইটি যখন পড়ানো হয়, তখন শিক্ষার্থীদের বয়স সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ বছর। এই বয়সে একজন শিক্ষার্থী এসব বক্তব্য পড়ে হযরত মুয়াবিয়া সম্পর্কে কী ধারণা পেতে পারে, সেটি বিবেচনা করা দরকার। যদিও পরবর্তী সময়ে পড়াশোনার মাধ্যমে আমরা বিষয়গুলো বুঝতে শিখি। বইটি সাধারণ কোনো প্রকাশনা নয়। এটি বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা বোর্ড বেফাকের সম্পাদনায় প্রকাশিত। বোর্ডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বসে সম্পাদনা করার পরও যদি এমন বক্তব্য থেকে যায়, তাহলে সম্পাদনার আগে বইটিতে কী ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু এ কারণে কি আমরা কওমি মাদ্রাসাকে সাহাবিবিদ্বেষী বলতে পারি? বইয়ে ভুল বক্তব্য থাকলেও সেই চিন্তা বা বিশ্বাস সবাই ধারণ করেন—এমন তো নয়। স্কুলে সুদসংক্রান্ত অঙ্ক পড়ানো হয়। কিন্তু সবাই তো সুদের পক্ষে বিশ্বাস ধারণ করেন না। বইয়ে কোনো বিষয় থাকলেই তার জন্য সবাইকে দায়ী করা যায় না।”
 
তিনি আরও বলেন, “এমনকি হানাফি মাজহাবের গুরুত্বপূর্ণ কিতাব ‘হেদায়া’র তৃতীয় খণ্ডের ১৯৭ পৃষ্ঠায়ও এ ধরনের বক্তব্য রয়েছে। দাওরায়ে হাদিসের আগের দুই বছর, অর্থাৎ ফজিলত দ্বিতীয় বর্ষে বইটি পড়ানো হয়। সেখানে বলা হয়েছে, স্বেচ্ছাচারী শাসকের পক্ষ থেকেও বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করা বৈধ, যেমন ন্যায়পরায়ণ শাসকের পক্ষ থেকেও তা বৈধ। এর দলিল হিসেবে বলা হয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম হযরত মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, অথচ হযরত আলী চতুর্থ খলিফা হিসেবে হকের ওপর ছিলেন। এখানে স্বেচ্ছাচারী শাসক হিসেবে কাকে বোঝানো হয়েছে? হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। আর হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হকের ওপর বলা হয়েছে। তাহলে এই বক্তব্যকে কি হযরত মুয়াবিয়ার প্রশংসা বলা যাবে, নাকি সমালোচনা? অথচ বইটি কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে রয়েছে।”
 
মুফতি আলী হাসান উসামা বলেন, “দারুল উলুম দেওবন্দের উচ্চতর পড়াশোনার সিলেবাসেও ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ নামে একটি বই রয়েছে। বইটির লেখক শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.)। এর অনুবাদ করেছেন দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদিস ও সদরুল মুদাররিসিন আল্লামা সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.)। সেখানে চারটি বড় ফেতনার আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ফেতনা হিসেবে হযরত মুয়াবিয়ার যুগের ফেতনার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মুয়াবিয়ার সব কাজ শরিয়তসম্মত ছিল না। কারণ, তিনি খলিফা ছিলেন না; তিনি রাজতান্ত্রিক বাদশাহ ছিলেন। তার শাসনপদ্ধতি পূর্ববর্তী খোলাফায়ে রাশেদিনের আদর্শের অনুরূপ ছিল না। তাহলে এই বক্তব্যে হযরত মুয়াবিয়ার প্রশংসা করা হয়েছে, নাকি তার সমালোচনা করা হয়েছে? এখন কি এ কারণে সবাইকে সাহাবিবিদ্বেষী বলা হবে? আপনাকেও সাহাবিবিদ্বেষী বলা হবে, আপনার বাবাকেও বলা হবে? এমনকি আপনি যে আলেমের শিষ্য, তার বিরুদ্ধেও কি একই অভিযোগ তোলা হবে?”
 
“বাংলাদেশে যাকে অনেকে ‘শাহবাগী হুজুর’ নামে চেনেন, সেই আল্লামা ফরিদউদ্দিন মাসুদ দারুল উলুম দেওবন্দের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তার মেধা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে তিনি শাহবাগে গিয়ে আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির দাবিও জানিয়েছিলেন এবং নাস্তিকদের সুরে সুর মিলিয়েছিলেন এমন সমালোচনাও রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে তার বিরুদ্ধে দালালির অভিযোগ উঠেছে। তার অনুসারীদের একটি বড় অংশের মধ্যেও ওস্তাদের কিছু প্রভাব পড়েছে বলে আমি মনে করি। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
 
বিগত সময়ে জামায়াতের বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, শাহবাগেও একসঙ্গে অবস্থান করেছেন। অর্থাৎ জামায়াতকে দমন করতে প্রয়োজনে শাহবাগের নাস্তিকদের সঙ্গেও সুর মেলানো হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধিতার কারণে নাস্তিকদের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়া কিংবা মুসলমানদের মধ্যে এমন বিভক্তি তৈরি করা উচিত নয়, যার ফলে এক পক্ষের বিরুদ্ধে সাহাবিবিদ্বেষের অভিযোগ উঠলে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ তোলা যায়। শুধু সাহাবিবিদ্বেষ নয়, বিভিন্ন বইয়ে নবী-বিদ্বেষী বক্তব্যও রয়েছে বলে আমি উদাহরণ দিতে পারি। ‘তাফসিরে জালালাইন’ নামের তাফসিরটি কওমি ও আলিয়া সব ধরনের মাদ্রাসায় পড়ানো হয়। সেখানে হযরত দাউদ (আ.)-এর বিষয়ে একটি বর্ণনা রয়েছে। ওই বর্ণনায় বলা হয়েছে, তার ৯৯টি স্ত্রী ছিল। এরপর উরিয়া নামের এক ব্যক্তির স্ত্রীর প্রতি তার আকর্ষণ তৈরি হয়। তিনি ওই ব্যক্তিকে স্ত্রীকে তালাক দিতে বলেন এবং পরে তাকে বিয়ে করেন। এভাবে তার ১০০টি স্ত্রী পূর্ণ হয়।”
 
তিনি বলেন, এ ধরনের বর্ণনা কি নবীর মর্যাদা বাড়ায়? তাফসিরের বইয়ে থাকলেও আমাদের ওস্তাদরা পড়ানোর সময় সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, তাফসিরের কিতাবে থাকলেই সব বর্ণনা নির্ভুল হয়ে যায় না। অনেক জাল বর্ণনাও বইয়ে থাকতে পারে। এগুলোকে বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। পবিত্র কোরআন সম্পর্কে বলা হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু কোনো তাফসিরের বইকে সেই পর্যায়ে রাখা যায় না। তাফসিরের বইয়ে ভুল থাকতে পারে। আমরা এসব বর্ণনা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু বইয়ে এমন বক্তব্য থাকার কারণে কি আমাদের নবী-বিদ্বেষী বলা যাবে? একইভাবে ‘তাফসিরে হক্কানী’তে হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি বিয়ের আগে রাহেল নামের এক নারীর প্রেমে পড়েছিলেন এবং পরে তাঁকে বিয়ে করেন। নাউজুবিল্লাহ! এ ধরনের বক্তব্য তো সাহাবিবিদ্বেষ নয়, নবী-বিদ্বেষী বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাহলে কোনো বইয়ে নবী বা সাহাবিদের বিষয়ে আপত্তিকর বক্তব্য থাকলেই কি সেই বই পড়া প্রত্যেক ব্যক্তিকে নবী বা সাহাবিবিদ্বেষী বলা যাবে? এক পক্ষের ক্ষেত্রে যে নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে, অন্য পক্ষের ক্ষেত্রেও তো একই নীতি প্রয়োগ করতে হবে।”
 
“তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, কোনো বইয়ে ভুল রয়েছে। কিন্তু দলের নেতারাই যখন ঘোষণা দেন যে তারা ওই বক্তব্য মানেন না, তখন কর্মীদের কেন সেই বক্তব্য মানতে হবে? আর ‘খেলাফত ও মুলুকিয়াত’ বইয়ের ভালো দিকগুলোও রয়েছে। আল্লামা তাকী উসমানী তার বইয়ের খণ্ডনে কিছু বিষয় স্বীকার করেছেন। সুতরাং মৌমাছি হোন, মাছি হবেন না। মৌমাছি ভালো জিনিস সংগ্রহ করে মধু তৈরি করে। আর মাছি নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত জায়গায় গিয়ে বসে। মজার বিষয় হলো, যখন ঐক্য থাকে, তখন এসব আপত্তি সামনে আসে না। কিন্তু কোনো কারণে ঐক্যে ফাটল ধরলেই ঈমান-আকিদাসহ নানা বিষয়ে আপত্তি সামনে আনা হয়। বিগত কয়েক দিন যখন মিল-মহব্বত ছিল, তখন এই বইগুলোতে সাহাবিবিদ্বেষী বক্তব্য ছিল না—এমন তো নয়। তখন যা ছিল, এখনো তা-ই আছে। আমার চোখে দেখা, সেই সময়ে মিল-মহব্বত তৈরির পেছনে তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল। তখনও বইগুলো সিলেবাসে ছিল, এখনো আছে। তাহলে তখন কেন এসব আপত্তি সামনে আসেনি?
 
আমি নিজেও আগে ‘খেলাফত ও মুলুকিয়াত’ বইটির সমালোচনা করেছি, এখনো করব। বইটির অনেক বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়ার সুযোগ নেই। এতে এমন কিছু ইতিহাসও রয়েছে, যার ঐতিহাসিক শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তবে এ নিয়ে আপত্তির যৌক্তিকতা বিবেচনা করতে হবে। বইয়ের ভুল বা আপত্তিকর বিষয় এক জায়গায়, আর ভালো বিষয়গুলো আরেক জায়গায়। এ কারণেই বিভিন্ন বই সিলেবাসে রাখা হয়, যাতে একটির সঙ্গে অন্যটি মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা পেতে পারে। যেমন ‘খেলাফত ও মুলুকিয়াত’-এর পাশাপাশি ‘আসহাবে রাসূলের জীবনকথা’র মতো বইও রয়েছে, যেখানে সাহাবিদের মর্যাদা ও সম্মান তুলে ধরা হয়েছে।”
 
শেষে তিনি বলেন, আমি এত দীর্ঘ উত্তর দিতে চাইনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, তাই উত্তর না দিলেও আবার সমস্যা হবে। আর অসম্পূর্ণ উত্তর দিলে ভুল বার্তা যেতে পারে। আশা করি, বিষয়টি পরিষ্কার করতে পেরেছি। ‘খেলাফত ও মুলুকিয়াত’ বই নিয়ে আপত্তি যার যার জায়গায় থাকবে, বইয়ের ভালো দিকগুলোও স্বীকার করতে হবে। এটি কোনো ওহি নয় যে এর প্রতিটি বক্তব্য নির্ভুল হবে। তাই এ নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। সবচেয়ে ভালো হয়, বইটি বাদ দিতে চাইলে এর চেয়ে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য একটি বই আপনারা লিখুন। কিন্তু নিজেরা কিছু লিখবেন না, আবার যেটি রয়েছে সেটিও পড়তে দেবেন না—এটি তো জটিল বিষয়। নিজেরা লেখালেখি করুন। ইনশা আল্লাহ, জাতি ভালো বিষয়গুলো গ্রহণ করবে, খারাপ বিষয়গুলো গ্রহণ করবে না।”