Image description

রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের বিশাল ফারাক রয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রোববার (১ নভেম্বর) টিআইবির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই তথ্য জানানো হয়।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী একটি দলের বার্ষিক সম্ভাব্য ব্যয় ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা। তবে সদস্য চাঁদা থেকে তাদের সর্বোচ্চ আয় মাত্র ২৬ লাখ টাকা। একইভাবে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কার্যক্রম বিস্তৃত থাকলে বার্ষিক সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়ায় ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। কিন্তু সেখানে সদস্য চাঁদা বাবদ সম্ভাব্য আয় মাত্র ১৪ থেকে ৩৮ কোটি টাকা। ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত এ ব্যয় বছরে ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। বিপরীতে সদস্য চাঁদায় দলগুলোর সর্বোচ্চ আয়ের সম্ভাবনা মাত্র ১১৬ কোটি টাকা।

এ ছাড়া কোনো দলেরই নির্দিষ্ট আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালী বিধি নেই। এমনকি বাৎসরিক বাজেট প্রণয়ন বা নিরীক্ষিত প্রতিবেদন প্রকাশের কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই।

 

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন যৌথভাবে উপস্থাপন করেন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওসার আহমেদ, কাজী আমিনুল হাসান ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন। গবেষণায় ৪২ দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তথ্য প্রদান করেছে ৩২টি দল। এতে ২০০৮ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ এবং কিছু ক্ষেত্রে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দলগুলোর গঠনতন্ত্রে আর্থিক জবাবদিহি ও অনুদানের শর্ত অস্পষ্ট। ফলে দলগুলো ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের পৃষ্ঠপোষকতার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

প্রতিবেদনে আইনি ও নীতিমালার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, আরপিও অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা থাকলেও সাতটি দলের গঠনতন্ত্র সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। আরপিওর ধারা ৯০খ লঙ্ঘন করে প্রায় সব দল ‘সহযোগী’ বা ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ নামে ছাত্র, শিক্ষক ও পেশাজীবী সংগঠন পরিচালনা করছে। নতুন দল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নিয়ম-বহির্ভূত আর্থিক লেনদেন, পেশিশক্তি, সরকারি হস্তক্ষেপ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।

 

অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চায় দেখা গেছে, কাউন্সিলে ব্যালটের বদলে কণ্ঠভোটে শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। এ ছাড়া সিপিবি ও এবি পার্টি ছাড়া কোনো দলেই প্রধান পদের নির্বাচনে একাধিক প্রার্থীর চর্চা নেই। সিপিবি ব্যতীত অন্য কোনো দলের গঠনতন্ত্রে দলীয় প্রধানের মেয়াদের সীমাবদ্ধতা নেই।

গবেষণার আওতাভুক্ত ১০টি দলে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব রয়েছে এবং ১২টির প্রধান ১০ বছরের বেশি দায়িত্বে আছেন। পাশাপাশি ১৬টি দলের কাউন্সিল সভা অনিয়মিত ও পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের অনুমোদন মাত্র। এছাড়া তিনটি প্রভাবশালী দলের বিরুদ্ধে ‘মনোনয়ন বাণিজ্যের’ অভিযোগ রয়েছে এবং বিগত পাঁচ সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী প্রার্থীদের প্রাধান্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

 

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত অর্থনির্ভরতার কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার ও কালো টাকার প্রভাব দলগুলোকে ‘ক্ষমতা-কেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে’ পরিণত করেছে। দলে নারীদের অন্তর্ভুক্তি এখনো প্রতীকী পর্যায়ে রয়ে গেছে এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির অভাবে পরিবারতন্ত্র ও পুরুষতান্ত্রিকতা বাড়ছে।‘ তিনি দলগুলোকে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের আহ্বান জানান।

 

দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিতে আরপিও ও নিবন্ধন বিধিমালা সংশোধন এবং তথ্য অধিকার আইনে আনার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্ম দিয়ে লেনদেন নিরীক্ষা ও গোপন ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনসহ ১২ দফা সুপারিশ পেশ করেছে সংস্থাটি।

 

অনুস্থানে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান।