Image description
তাহসিফের মৃত্যু

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করেছেন তার বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম। রাজধানীর উত্তরখান থানায় দায়ের করা ওই মামলাতেই আটক দেখিয়ে জুনিয়র বন্ধু দীপের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। এই দীপকে ঘিরেই চলছে মামলার বহুমুখী তদন্ত। তাহসিফ নিখোঁজের দিন গত ২৭শে অক্টোবর রাতের টঙ্গী মাজার বস্তি ও উত্তরার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পাওয়া গেছে আরও চঞ্চল্যকর সব তথ্য। মাজার বস্তির সিসি ক্যামেরা বলছে- ওই রাতে নিহত তাহসিফের সঙ্গে দীপ একা ছিলেন না। তুরাগ পাড়ের মাঠে প্রবেশের সময়ে তাদের সঙ্গে আরও অন্তত ৪ থেকে ৫ জন উপস্থিত ছিলেন।

তাহসিফ সাউরির বাসার সিটিসিভি ফুটেজ ও তার পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২৭শে অক্টোবর জুনিয়র বন্ধু দীপের ফোনেই সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর দীর্ঘক্ষণ নিজের মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করেন। ওই মোটরসাইকেল নিয়েই দীপের সঙ্গে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক করবী-১৪ ভবনের কম্পাউন্ড ছাড়েন দু’জনে। আরেক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৮টা ৫৪ মিনিটের দিকে উত্তরার কুকরুকু রেস্টুরেন্টে বসে দীপকে নিয়ে খাবার খাচ্ছেন তাহসিফ। সেখানে বসেই নিজের বান্ধবী তাবাসসুমকে ফোন করে দেখা করার কথা বলেন তিনি। কুকরুকু রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাবাসসুমের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। এরপর আরেক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১০টা ১৭ মিনিটের দিকে বান্ধবীকে নিজের মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে সোনারগাঁ জনপথের পাশের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে’র সামনে আসেন তাহসিফ। তখনও তাদের সঙ্গে আলাদা মোটরসাইকেলে ছিলেন দীপ।

এরপর ভবনের সামনের রাস্তায় দুইটি মোটরসাইকেল পার্ক করে প্রথমে তাহসিফ তার বান্ধবীকে নিয়ে ভবনের লিফটের সামনে যান। ওই সময় মোটরসাইকেল থেকে নেমে দীপ ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের পাশে কালো টি-শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা আরও একজন যুবক দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওই সময়ে দীপের আসতে সময় লাগছে দেখে লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাহসিফ সামনের দিকে এগিয়ে আসেন। তাহসিফকে দেখে প্রথম লোকটিকে রাস্তার পাশে রেখেই কালো টি-শার্ট পরা লোকটিকে সঙ্গে নিয়ে দীপ ভবনের সিঁড়ি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর তাহসিফ, তার বান্ধবী ও দীপ তিনজনে লিফটে চেপে নেস্ট বারে প্রবেশ করেন। আর কালো টি-শার্ট পরা লোকটি লিফটির সামনে অপেক্ষায় থাকেন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, লিফটে প্রবেশের সময়ে তাহসিফ ও তার বান্ধবীর মুখে কিছু না থাকলেও দীপ হেলমেট পরে তার মুখ ঢেকে বারে প্রবেশ করেন। ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় বারে থাকার পর ঠিক রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে তারা বার থেকে বের হন। ওই সময়েও তাহসিফ ও তার বান্ধবী মোটরসাইকেলে ওঠে দীপের জন্য নিচে অপেক্ষা করতে থাকেন। পরে তিনজনে মোটরসাইকেলে চেপে উল্টো রাস্তা দিয়ে সামনে চলে যান। ওই নেস্ট বার থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরের টঙ্গী মাজার বস্তির রাস্তার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ঠিক ১২টা ১৭ সেকেন্ডের দিকে তিনটি মোটরসাইকেলে দীপসহ মোট ৬ জন মাজার বস্তির দিকে প্রবেশ করছেন। আর তাদের পেছন পেছন আসা চার নম্বর মোটরসাইকেলটি ঘুরিয়ে উল্টো দিকে চলে যায়।

এর ঠিক ৩৯ মিনিট পর ১২টা ৩৯ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে ওই একই রাস্তা দিয়ে তাহসিফ একা মোটরসাইকেল চালিয়ে মাজার বস্তিতে প্রবেশ করেন। এরপর আরেক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, মাজার গেটের সামনে দিয়ে রাত ১টার দিকে সামনের সারিতে তাহসিফ এক যুবকের সঙ্গে আর ঠিক তার পেছনে দীপ আরও তিন যুবকের সঙ্গে হেঁটে তুরাগ পাড়ের মাঠে প্রবেশ করছেন। ওই সময়ে রাস্তার পাশের দোকান থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়া দুই যুবককে ডাক দিয়ে তাহসিফ বলেন- ভাই কেমন আছো? কথা বলা ওই দুই যুবকও তখন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। তখন তারা মোট ৭ জন ওই তুরাগ তীরের মাঠে প্রবেশ করেন। আরেক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে হাতে হেলমেট নিয়ে মাঠ থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে একা হেঁটে আসছেন দীপ। তার কোমরে কালো রংয়ের একটা ব্যাগ।

দীপ কিছু দূর এগিয়ে যাওয়ার পর পাশের রাস্তা থেকে দীপের পেছন পেছন একটা সিএনজি অটোরিকশা আসতে দেখা যায়। ওই সিএনজি অটোরিকশার পেছন পেছন ওই একই রাস্তা দিয়ে দীপের পেছনে আরও দুই যুবক আসে। আর তাদের পেছনে ছিলেন এক নারী। এরপর মাজার বস্তির মোড়ের ওই একই সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১টা ২৯ মিনিটের দিকে দীপ ওই রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছেন। আর দ্বীপের পেছন পেছন আসা মোট তিনজন যুবক ও দুইজন নারী রাস্তার মোড়ের উপর দাঁড়িয়ে। তাদের কেউ ফোন করে কথা বলছে। বারবার তারা মাঠের দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করছিল আর ফোন ঘাঁটছিল। সিসিটিভি ফুটেজে এতটুকু বোঝা যায়, সেখানে কিছু একটা ঘটেছে।

তবে দীপ প্রথম দিন থেকেই বলছেন, তাহসিফের সঙ্গে তিনি ছাড়া আর কেউ ছিল না। এমনকি পিবিআইয়ের কাছেও বয়ান দিয়েছেন, ওই রাতে মাজার বস্তিতে তাহসিফের সঙ্গে তিনি একাই আসেন এবং তারা দু’জনই মাঠে প্রবেশ করেন। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ বলছে সেখানে দীপ ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। আর ওই রাতের পরদিনই মাজার বস্তির সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে তুরাগ নদ থেকেই ভাসমান অবস্থায় বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধার করেন টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। এরপর মোহাম্মদপুর বাবর রোডের বি ব্লকের ১৩সি/৫সি বাসার তিন তলা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। দুইদিনের জিজ্ঞাসাবাদ ও রাজধানীর-টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযানের পর দীপকে টঙ্গী নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে পিবিআই। বর্তমানে তাহসিফ হত্যার ঘটনা তদন্ত করছে নৌ-পুলিশ।

এ বিষয়ে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, তাহসিফ যেদিন রাতে নিখোঁজ হন, সেদিন তার সঙ্গে বন্ধু দীপ ছিলেন। দীপের ফোনেই তাহসিফ বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে আমরা যতটুকু জেনেছি, সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরো সময়ে তাহসিফের সঙ্গে দীপ উপস্থিত ছিলেন। তাই তাকে আমরা হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করি। সে অনেক তথ্য দিয়েছে। কিন্তু যার বেশির ভাগই ছিল এলোমেলো। তাই তাকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। তার দেয়া তথ্য মতেই মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। পরে যাচাই-বাছাই করে দেখেছি উদ্ধার হওয়া ওই মোটরসাইকেলটি মিরপুরের একটি শোরুম থেকে তাহসিফের নামেই কেনা হয়। পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, দীপ সেই রাতে তাহসিফের সঙ্গে একা থাকার কথা বললেও আমরা নিশ্চিত হয়েছি সেখানো আরও কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিল। আমরা সবকিছুই যাচাই-বাছাই করছি।

এদিকে শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়ে মামলা করেছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ২৭শে অক্টোবর আমার ছেলে কে এম তাহসিফ সাউরি আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার পর দীপ নামে তার এক জুনিয়রের ডাকে বাসা থেকে বাইরে যায়। রাত বেশি হলেও ছেলে ফিরে না আসায় তার মা বারবার ফোনে যোগাযোগ করলে সে জানায়, কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরবে। পরে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তার ফোন থেকে মায়ের ফোনে ভয়েজ মেসেজ পাঠায়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’। কিন্তু রাত পেরিয়ে পরের দিন বিকাল হলেও সে ফিরে আসেনি। এজাহারে আরও বলা হয়, ২৮শে অক্টোবর বিকাল আনুমানিক ৫টা ২০ মিনিটে উত্তরখান থেকে নৌ-পুলিশ ফোনের মাধ্যমে আমাকে জানায়, রাজারবাড়ী ঘাট উত্তরখান এলাকাতে তুরাগ নদ থেকে আমার সন্তানের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।

এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে ২৯শে অক্টোবর দুপুরে নৌ-পুলিশ আমার কাছে আমার সন্তানের মরদেহ হস্তান্তর করে। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় রীতি সম্পন্ন করে ২৯শে অক্টোবর বিকালে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়। মামলার এজাহারে এনায়েতুল করিম সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ছেলে কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর কারণ উদ্‌ঘাটনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আবেদন করেছেন। ওই মামলাতেই গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন মেজিট্রেট আদালতে হাজির করে মোট ৫টি গ্রাউন্ডে দীপের বিরুদ্ধে ৭ দিনের রিমান্ড চান টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। পরে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের শুনানি শুনে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ- পুলিশ কমিশনার মো. রেজাউল করিম বলেন, হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে গুম করার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেছেন তাহসিফের বাবা। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মূলত তদন্ত করছে লাশ উদ্ধার করা টঙ্গী নৌ-পুলিশের সদস্যরা। এ ছাড়াও আমাদের একাধিক টিম বিষয়টি নিয়ে মাঠে কাজ করছে।