সারের ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। নতুন তালিকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের আপন ভাতিজার পাশাপাশি বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নাম এসেছে।
এ নিয়োগে দলীয় প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন বঞ্চিত আবেদনকারীরা। তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, গত ৭ অক্টোবর টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলায় নতুন সার ডিলারদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকেই নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। ডিলারশিপ না পাওয়া কয়েকজনের অভিযোগ, দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বজনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বানাইল ইউনিয়ন ওলামা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন টিটু ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যার কোনো দোকান নাই, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নাই, কোনো গোডাউন ঘর নাই, সে কীভাবে সারের ডিলার পায়?’
মির্জাপুর উপজেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক জুবায়েদ ইসলাম নিঝুমও এ নিয়ে ফেসবুকে দুটি পোস্ট দিয়েছেন। একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি সারের ডিলার নিয়োগে ব্যাপক দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এখানে (মির্জাপুর) এমপির ভাতিজা ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও ছেলে বিএনপির লোকজন ও নিকট আত্মীয়রা স্থান পেয়েছে।’
তালিকায় এমপির ভাতিজা, বিএনপি নেতা ও স্বজনরা
সার ডিলারের তালিকা ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, মির্জাপুর পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নে নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ডিলারশিপ পেতে উপজেলায় আবেদন করেন ১১২ জন। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যরা যাচাই-বাছাই করে ৪৫ জনের নাম জেলা পর্যায়ে পাঠান। পরে সেখান থেকে ১৫ জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত নিয়োগ তালিকায় স্থান পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন টাঙ্গাইল-৭ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর আপন ভাতিজা ও পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. মেহেদী হাসান সিদ্দিকী। উয়ার্শী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হায়দার আলীর ছেলে আলিফ, বানাইল ইউনিয়নে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাফার স্ত্রী আফরোজা সীমা এবং আনাইতারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইমরান খানও ডিলারশিপ পেয়েছেন।
এ ছাড়া বহুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি লাজলু মিয়া, ভাওড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফারুক হোসেন সম্রাটের ছেলে জুবায়েদ হাসান পিপু, মহেড়া ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমান, আজগানা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন এবং লতিফপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফজালুর রহমান দুলালের ছেলে গোলাম রব্বানী ডিলারশিপ পেয়েছেন। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সংখ্যাই বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগের জন্য আবেদন করেছিলেন ১ হাজার ২৭৭ জন। যাচাই-বাছাই শেষে ৩৯০ জনের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ১৩১ জনকে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন, অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
ডিলারশিপ না পাওয়া আবেদনকারীদের অভিযোগ, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। তারা নতুন করে তালিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
ডিলারশিপের জন্য আবেদন করা মির্জাপুর উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব সোহেল তাজ জাগো নিউজকে বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু ডিলারশিপ পাননি। দলীয় লোকজনকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকতে পারে।
তবে ডিলারশিপ পাওয়া সংসদ সদস্যের ভাতিজা ও পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মেহেদী হাসান সিদ্দিকী বলেন, সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেছিলেন। এর আগে তার কোনো সার ডিলারশিপ ছিল না। পৌরসভায় পাঁচজন আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
আনাইতারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইমরান খান বলেন, যথাযথভাবে আবেদন করেছেন তিনি। নিজেও একজন ব্যবসায়ী। আগে তার কোনো সার ডিলারশিপ ছিল না, অন্য ব্যবসা ছিল।
যা বলছে স্থানীয় প্রশাসন
এ বিষয়ে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কর্মকর্তাদের দিয়ে যাচাই করানো হয়েছে এবং তাদের মতামত নিয়েই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয়েছে। তাড়াহুড়োর কারণে কিছু ঘাটতি থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মতামতও ছিল এবং তিনি নিজেও উপস্থিত ছিলেন। সভায় অন্য কর্মকর্তারাও ছিলেন।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা খাতুন বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং কমিটির সদস্যদের সমন্বয়েই নামের তালিকা করা হয়েছে। গোডাউনসহ প্রয়োজনীয় সব বিষয় যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। কে বিএনপি করেন, কার ছেলে বা কে কোন দলের—এসব বিবেচনা করা হয়নি। কমিটির কেউ আর্থিক লেনদেন করেননি।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, সার ডিলার নিয়োগে সরকারি নীতিমালা ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। উপজেলা থেকে যাচাই-বাছাই করে তালিকা পাঠানোর পর জেলা পর্যায়ে তা পর্যালোচনা করে যাদের সঠিক মনে হয়েছে, তাদের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরে মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগ দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দলীয় পদ এক বিষয়, আর ডিলারশিপ পাওয়া আরেক বিষয়। যে কেউ আবেদন করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করা হবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, আবেদনকারীদের আবেদন যাচাই-বাছাই করেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে তার কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না। বেশির ভাগ আবেদনকারীই তাদের দলের লোক। যাকে দেওয়া হবে, তিনিই তাদের লোক। নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।