Image description
বার ও ওয়্যারহাউসে এনবিআরের অভিযান

বাংলাদেশে অবাধে মদ আমদানির সুযোগ নেই। তবে উচ্চ শুল্কে শর্তসাপেক্ষে আমদানিযোগ্য। কূটনীতিক এবং প্রিভিলেজ পারসনদের (বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি) জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় মদ আমদানির সুযোগ রেখেছে সরকার। সরকারের দেওয়া এই সুবিধার আওতায় মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মদের আমদানি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বছরের ব্যবধানে গড়ে প্রতিদিনের আমদানি দেড় হাজার লিটার থেকে বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার লিটারে পৌঁছেছে। প্রশ্ন উঠেছে, হুট করে এক বছরে এত ব্যবহারকারীর সংখ্যা কীভাবে বাড়ল? আর সরকারের এই শুল্ক সুবিধার মদ কারা পান করছেন? বা যারা পান করছেন তারা আসলেই কি এই সুবিধার উপযুক্ত কি না? আর শুল্ক সুবিধার এই অপব্যবহারের কারণে প্রতিনিয়ত রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এ ছাড়া ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডের অপব্যবহার বন্ধে তিন বছর আগে সফটওয়্যার চালু হলেও আইনি ফাঁকফোকরের কারণে এই অপব্যবহার আদতে বন্ধ হচ্ছে না বলেও মনে করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে শুল্ক সুবিধার মদ আমদানি হতো ১ হাজার ৫৫৫ লিটার। ২০২৬ সালে এসে বেড়ে তা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৭১ লিটার। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর শেষে শুল্ক সুবিধার মদ আমদানি হয়েছে ৯ লাখ লিটারেরও বেশি। বছর শেষে তা ১২ লাখ লিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এক বছরের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ দ্বিগুণ হওয়ার কারণে আরও বেশি প্রশ্ন উঠেছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশিদের নাম করে আনা মদের বড় একটি অংশই চলে যাচ্ছে সাধারণ বারগুলোতে। এতে ব্যাপক শুল্ক-কর ফাঁকি হচ্ছে। যার প্রমাণও মিলেছে। সম্প্রতি এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অভিযানে গুলশানের একটি বার থেকে বিপুল পরিমাণে অবৈধ মদ জব্দ করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আসলে এসব মদ কীভাবে বারগুলোতে আসছে। এর বাইরেও গুলশানের একটি ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসে অভিযান চালান এনবিআরের গোয়েন্দারা। নানা অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউস সিলগালাও করেন। এই সময়েও নতুন করে ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের অনুমোদন পেতে এনবিআরে তোড়জোড় চালাচ্ছে আরও দুটি প্রতিষ্ঠান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। অবৈধভাবে আসা মদ জব্দ করেছি। সরকারের শুল্ক-কর ফাঁকি বন্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া যারা সরকারের নিয়ম না মেনে এসব কর্মকাণ্ড করবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস মূলত আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও প্রটোকলের অংশ হিসেবে বিদেশি কূটনীতিক এবং প্রিভিলেজ পারসনদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় মদ, বিয়ার, সিগারেটসহ ভোগ্যপণ্য সরবরাহের জন্য বিশেষভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত গুদাম। আর শুল্কমুক্ত এসব পণ্যের ভোক্তা বিদেশি কূটনীতিক, বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা। এনবিআরের অনুমোদন নিয়ে এ ব্যবসা করছে দেশের ৫ বেসরকারি কোম্পানি। গত বছর ৫টি কোম্পানিকে ৪৬ লাখ ডলারের মদ আমদানির অনুমতি দেয় এনবিআর। সাধারণত এক টাকার মদ আমদানিতে গড়ে ৬ টাকা শুল্ক-কর দিতে হয়। আর এনবিআরের নিয়ম অনুযায়ী, বিশেষ করে হুইস্কি এবং ভদকার শুল্ক-কর হচ্ছে ৬৩৬ শতাংশ। আর এই মদই শুল্ক সুবিধায় আনে ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো।

মদ যারা পান করছেন, তাদের সঠিক সংখ্যা এনবিআরের হাতে নেই বলেও জানিয়েছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, প্রতি বছর এসব ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি প্রাপ্যতা বাড়ানো হয়। ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডের বেচা-বিক্রিতে স্বচ্ছতা আনতে তিন বছর আগে একটি সফটওয়্যার চালু করে এনবিআর। ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট কোম্পানিগুলো দেখভাল করলেও সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ এনবিআরের হাতে। ফলে সফটওয়্যারে হিসাব থাকলেও তার যথার্থতা নিয়ে সন্দিহান খোদ কর্মকর্তারা। যার কারণে এই খাতে সরকারের দেওয়া সুবিধার অপব্যবহার হচ্ছে। এর বাইরে আরেকটি শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে বলেও জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, প্রতিটি কূটনৈতিক পাসপোর্ট বা প্রিভিলেজ পাসপোর্টের বিপরীতে ২০০ ডলার করে প্রতি মাসে প্রাপ্যতা দেওয়া হচ্ছে। আর এখানে ট্যারিফ ভ্যালু ধরা হয়েছে মাত্র ৫ ডলার। এতে প্রিভিলেজ পাসপোর্টধারীরা প্রতি মাসে প্রায় ৪০ লিটার বা বোতল মদ পান শুল্ক সুবিধায়। আসলে কি একজন মানুষ ত্রিশ দিনে ৪০ লিটার মদ পান করতে পারেন বা করেন? এই নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এ ছাড়া কিছু প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে একজন বিদেশির কাপড়-চোপড় থেকে শুরু করে ব্যবহারের সামগ্রী খাবার-দাবারসহ সব বিষয় উল্লেখ করে প্রাপ্যতা দেওয়া হয় ডলারে। পরিমাণে প্রাপ্যতা না দিয়ে ডলারে প্রাপ্যতা দেওয়ার কারণেও শুল্ক সুবিধায় আমদানি হওয়া মদের অপব্যবহার হচ্ছে বলেও জানান এনবিআর কর্মকর্তারা।

এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শুভংকরের ফাঁকি হচ্ছে পরিমাণের পরিবর্তে ডলারে প্রাপ্যতা নির্ধারণ করা। এই কারণে শুল্ক সুবিধার অপব্যবহার বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া পাসবুক নিয়েও অনিয়মের সুযোগ রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদেশিদের পাসপোর্ট ব্যবহার করে অসাধুরা শুল্ক সুবিধায় মদ আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবহারও করে থাকে। এ ছাড়া বিদেশিদের যাবতীয় খরচ হিসাব করে মোট ডলারে প্রাপ্যতা দেওয়া হচ্ছে। অপব্যবহার বন্ধে আলাদা আলাদাভাবে মদের জন্য ডলার বা পরিমাণ উল্লেখ করলে এই অপব্যবহার কমে আসতে পারে। আর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিদেশিদের ব্যবহারের সুযোগ নিতে পারে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। তিনি আরও বলেন, শুল্কমুক্ত মদ খোলাবাজারে যাওয়া ঠেকাতে ব্যবহারকারীদের সঠিক পরিসংখ্যান দরকার। এ ছাড়া ডলারে আমদানির প্রাপ্যতা দেওয়ার বিষয়েও নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান এই এনবিআর কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর বন্ডের কমিশনার ড. নাহিদা ফরিদী কালবেলাকে বলেন, আমাদের মূল কাজই হচ্ছে অবৈধ আমদানি যুক্তিসংগত পরিমাণে কমিয়ে রাখা। ওভার ইনভয়েসিং করে বিদেশে টাকা পাচার, শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য এনে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া এসব বন্ধ করতে পারলে বিদেশি মুদ্রাও সেভ হবে। সেই সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।