Image description
নাটোরের এমপি আজিজের পুত্র একই এলাকার ছাত্রদলের এক ছেলেকে মেরে ফেলেছে। যেই ছেলেকে মেরে ফেলেছে, ওর নাম শাকিল ইসলাম। আমি সমাজ ও রাজনীতির শিক্ষক। গত ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের সব চাইতে নামকরা পত্রিকাগুলোতে সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে কলাম লিখছি। যেহেতু বুর্জোয়া দলগুলোর ছত্র সগঠনগুলো আমি পর্যবেক্ষণ করি, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্লেষণটা করছি।
শাকিল কিন্তু বুঝতে পেরেছিল এমপি পুত্র তাঁকে হত্যা করতে পারে। নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে সে এমনকি লিখেছিলো ব্যাপারটা নিয়ে। মানে সে নিরপদবোধ করছে না। স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সে জানিয়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে
 
- পুলিশ-প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিল না কেন?
 
উত্তরটা সোজা। বাংলাদেশে মন্ত্রী-এমপি মানে সকল আইনের ঊর্ধে তাঁরা! পুলিশ-প্রশাসন তাঁদের ভয় পায়। ওই এমপি পুত্রের বিরুদ্ধে যদি কোন পুলিশ কিংবা প্রশাসন ব্যবস্থা নিত। তাহলে কী কী হতে পারতো আমি বলবো? যুগের পর যুগের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
 
এক, ওই পুলিশ কিংবা প্রশাসনের মানুষটাকে সরিয়ে দেয়া হতো। মানে বদলি করে দেয়া হতো।
দুই, কোন দাস সাংবাদিক দিয়ে ওই পুলিশের বিরুদ্ধে নানান সব রিপোর্ট করা হতো।
তিন, তাঁকে অন্য যে কোন বিরোধী দলের ট্যাগ দিয়ে ক্লোজ করা হতো। মানে ওএসডি করা হতো।
কারন ওই এলাকার এমপি আসলে সৌদি কিংবা আরব রাজা-বাদশাহদের চাইতেও বড় মহা-রাজা!
 
এবার আসি দ্বিতীয় আলোচনায়। ছাত্রদলের এই ছেলেকে এক এমপি পুত্র মেরে ফেলেছে। আমি এখন দেখতে পাচ্ছি ছাত্রদলের কেউ কেউ এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে মিনমিন করছে; মানে কী জানেন?
মানে হচ্ছে- "আহা আমাদের একজন সহযোদ্ধা চলে গেল" কিংবা - "রাজপথের সৈনিকের মৃত্যু নেই" অথবা - "রাজপথে তোমাকে মনে পড়বে শাকিল" ইত্যাদি।
 
অল্প -কয়েকজন ছাড়া আর কেউ প্রতিবাদ করে লিখছে না- আমরা এই বুর্জোয়াতন্ত্র মানি না। সারা জীবন আমরা আপনাদের ভ্যান-গার্ড হয়ে থাকবো। গাড়ির পেছনে পেছনে দৌড়াবো। আর দিন শেষে হয় আপনি কিংবা আপনার পুত্র এমপি হবে। আত্মীয়-স্বজনরা পদ-পদবি পাবে। এরপর আবার আমাদেরই মেরে ফেলবেন! এই এলিট-বুর্জোয়াতন্ত্র আমরা মানি না।
 
দেখেছেন কেউকে এইসব লিখতে? দেখেছেন ঢাকার কাউকে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে? বলতে- এর বিচার না হলে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দেব?
 
নাহ, এইসব কিছুই ওরা বলবে না। কারন বললে তো দল থেকেই বিদায় করে দেবে। নইলে ওই যে, অন্য দলের ট্যাগ লাগিয়ে দেবে!
 
কারন ছাত্রদলের এই ছেলে-মেয়েগুলোও কোন না কোন মন্ত্রী-এমপির দাসত্ব কিংবা গোলামী করছে। এইসব বুর্জোয়া দলে নেতা না ধরলে পদ-পদবি জীবনেও পাওয়া যায় না। কারন গণতন্ত্র বলতে এইসব দলে কিছু নাই। আছে শুধু বুর্জোয়াতন্ত্র এবং দাসত্বের সম্পর্ক।
 
এখন ওই এমপি গতকাল রাতে বলেছে- শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা দেয়া হবে।
 
কী চমৎকার ব্যাপার স্যাপার। এই দেশে টাকা দিয়ে সব কিছুর ফয়সালা হয়ে যায়। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলার পর ওর দাম নির্ধারণ হয়। এই যে আমি এই কলামটা লিখছি, এর জন্য হয়ত শাকিলের মৃতদেহের দাম আরও কিছু বেড়ে যেতে পারে। কেন?
 
আমার লেখা লাখ লাখ মানুষ পড়ে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষও পড়ে। হ্যাঁ ভাই, এটাই বুর্জোয়াতন্ত্র। এটাই বাংলাদেশ। এই এমপি গতকাল রাতে বলেছে
- আমার পুত্র যদি দোষী হয়, ওর বিচার হোক।
 
একটা "যদি" আছে, বুঝতে পারছেন তো? এই দেশে এমন কোন পুলিশ কি আছে, যে এমপি পুত্রের বিরুদ্ধে চার্জসীট দেবে? এমন কোন বিচারক কি আছে, যে রানিং এমপির পুত্রের বিরুদ্ধে রায় দেবে?
এরপর এদের ভবিষ্যৎ কী হবে? যে কিনা নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের একটা কর্মীকে এভাবে মেরে ফেলতে পারে। সে তো এরপর ওই পুলিশ- বিচারক কিংবা তাঁদের পরিবারের রাতের ঘুম হারাম করে দেবে।
শেষ পর্যন্ত যারা এই লেখাটা পড়েছেন। এইবার বুর্জোয়াতন্ত্রের কফিনের শেষ পেরেকটা কীভাবে কাজ করে, সেটা বুঝে নিন। শাকিল যদি বেঁচে থাকতো এবং অন্য কোন এলাকায় যদি এমন ঘটনা ঘটতো কিংবা ধরেন সরকার দলের কেউ খারাপ কাজ করেছে বা এমন কিছু।
 
শাকিলকে তখন ওই খারাপ কাজের সাফাই গাইতে হতো। কিংবা এই আমরা যখন এর প্রতিবাদ করতাম বা করবো, আমাদের প্রোফাইলে এসে গালি দিয়ে যেতে হতো। অথচ সেই আমাদেরকে এখন শাকিলের জন্য কলম ধরতে হচ্ছে।
যেই এমপি নিজের পুত্রকে মানুষ করতে পারে নাই। দানব বানিয়েছে। সেই এমপি দেশ আর এলাকাকে দানব বানিয়ে ছাড়বে, সেটাই তো স্বাভাবিক।
ওর অন্য বন্ধুরা এখন বুকে পাথর চেপে রেখে মিনমিন করছে। এই যে আমি এই লেখাটা লিখলাম, ছাত্রদলের অফিসিয়াল পেয়েজে এই লেখা কি কেউ শেয়ার দেবে? ওরা কি ওদের গ্রুপে গ্রুপে এই লেখা শেয়ার করবে? করবে না! কেন করবে না।
 
কারন আমাদের তো কোন রাজনৈতিক পরিচয় নাই। ওই যে বললাম- ওদের কাজ গাড়ির পেছনে দৌড়ানো। বুর্জোয়া মন্ত্রী-এমপিদের নিরাপত্তা দেয়া। মিছিলে ১০, ২০, ৫০ জন মানুষ জোগাড় করা। এই বুর্জোয়াতন্ত্রে ওরা শাকিলের মত দাস হয়ে জন্মায় এবং দাস হয়েই কবরে যায়।