সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক গত ২২ আগস্ট সড়ক পরিদর্শন কর্মসূচির নামে গাজীপুর রাজেন্দ্রপুরের ডাকবাংলোয় সারাদিন কাটান, যা ছিল অনেকটা পিকনিকের মতোই। তবে সেটি আদতে পিকনিকও ছিল না। বাস্তবে তা ছিল সড়ক বিভাগের বিভিন্ন স্তরের প্রকৌশলীদের বদলি বাণিজ্যের কর্মযজ্ঞ। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের একধিক কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ডাকবাংলোয় বসেই পুরো সড়ক বিভাগের বদলি-পদায়নের একটা তালিকা তৈরি করা হয়। এবং সেই অনুযায়ী পরের দিন বদলি-পদায়নের আদেশ জারি হয়। এই বদলি-পদায়নে বড় অংকের অর্থের লেনদেন হয়। যার একটি অংশ নগদেও সেখানে সম্পন্ন হয়।
তবে বড় লেনদেনগুলো হয় ‘ক্যাশ চেক’ এবং মৌখিক কমিটমেন্টের ওপর ভিত্তি করে।
সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ এবং শীর্ষনিউজ ডটকম-এ গত ৫ অক্টোবর “সড়ক পরিদর্শনের নামে রাজেন্দ্রপুর ডাকবাংলোয় বসে লেনদেন: সচিবের নেতৃত্বে সড়ক বিভাগে বড় অংকের বদলি বাণিজ্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদ নেতাদের লোভনীয় পদায়ন” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানেও এসব ঘটনার সত্যতা উদঘাটিত হয়েছে। সড়ক সচিব ড. মো. জিয়াউল হক শীর্ষকাগজ ও শীর্ষনিউজ সম্পাদককে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তার দপ্তরে চা-এর দাওয়াত দিয়েছিলেন।
তবে, তিনি নিজে এসব ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করতে পারেননি, সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাও দিতে পারেননি।
রহস্যজনক ব্যাপার হলো, এর পরপরই সড়ক সচিব জিয়াউল হকের স্ত্রী ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য পদ থেকে এক লাফে বিমান সচিব পদে পদায়ন পেলেন। তিনি ছিলেন ডাম্পিং পদায়নে। সেখান থেকে বিমান সচিব পদে পদায়ন! এমনিতেই এটি মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য কেনাকাটা, বিমানবন্দর নির্মাণসহ বড় বড় বিনিয়োগ ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়ের মৌসুম চলছে এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আর এ মুহূর্তেই ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদায়ন পেলেন। নূরুন্নাহার চৌধুরীর হঠাৎ এই ‘অস্বাভাবিক’ পদায়নকে স্বামীর ‘বদলি বাণিজ্যের পারফরম্যান্স’র পুরস্কার হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘অস্বাভাবিক’ বলা হচ্ছে এই কারণে যে, বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেই ড. নুরুন্নাহার চৌধুরীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের (নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়) সচিব পদ থেকে সরিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য পদে ডাম্পিং পদায়নে দেওয়া হয়েছিল গত এপ্রিল মাসে। সচিব হিসেবে তিনি মোটেই ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারছিলেন না, এ কারণেই ডাম্পিং-এ দেওয়া হয় তখন। এমনকি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিরও অভিযোগ উঠেছিল। অথচ কোনো কারণ ছাড়াই এখন হঠাৎ আবার এই অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিমান সচিব পদে পদায়ন দেওয়া হলো!
সড়ক সচিবের ‘বদলি বাণিজ্য’ সম্পর্কিত শীর্ষকাগজের প্রকাশিত গত ৫ অক্টোবরের ওই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছিল, রাজেন্দ্রপুর ডাকবাংলোয় যেসব লেনদেন হয়েছে তারমধ্যে মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ পেয়েছেন সচিব এবং সড়কের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তবে মূল অংশটি চলে গেছে অদৃশ্য স্থানে। অদৃশ্য স্থান বলতে প্রভাবশালী মহলকেই বোঝানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, সেই প্রভাবশালী মহল সচিবের ওপর খুশী হয়েই সচিবের স্ত্রীকে বিমান সচিব পদে পদায়নের ব্যবস্থা করেছেন। যদিও সচিব জিয়াউল হক এবং তার স্ত্রী নূরুন্নাহার চৌধুরী উভয়েই চরম আওয়ামী ও ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তা হিসেবেই চিহ্নিত। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরে এরা সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে নাজেহালও হয়েছেন। বহুল আলোচিত সায়লা ফারজানার ‘মায়াবতী’ গ্রুপের অন্যতম সদস্য এই নূরুন্নাহার চৌধুরী। তার স্বামী ড. মো. জিয়াউল হক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত ছিলেন। শেখ হাসিনার ‘ক্যাশিয়ার’ জিয়াউল হক এখন কার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করছেন সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত ৫ অক্টোবর “সড়ক পরিদর্শনের নামে রাজেন্দ্রপুর ডাকবাংলোয় বসে লেনদেন: সচিবের নেতৃত্বে সড়ক বিভাগে বড় অংকের বদলি বাণিজ্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদ নেতাদের লোভনীয় পদায়ন” শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর সরকারের উচ্চ মহলে এ নিয়ে ব্যাপাক তোলপাড় হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটির বিষয়ে নিজের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য সড়ক সচিব জিয়াউল হক শীর্ষকাগজ সম্পাদককে তাঁর দপ্তরে চা-এর দাওয়াত দেন। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা নোবেল দে এ ব্যাপারে সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ৮ অক্টোবর দুপুরে সচিবের দপ্তরে সাক্ষাৎ হয়। সচিব জিয়াউল হক প্রকাশিত প্রতিবেদন বা এর কোনো তথ্যের প্রতিবাদ না করে শুধুমাত্র বলেন, আত্মীয়-স্বজন সবারই থাকতে পারে। আপনারও আত্মীয়-স্বজন নিশ্চয়ই সব জায়গায় আছে। এ কথাটির মাধ্যমে তিনি মূলতঃ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক ড. মো. ওয়ালিউর রহমানের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। উল্লেখ্য, শীর্ষকাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকৌশলী ওয়ালিউর রহমানের সঙ্গে সচিবের আত্মীয়তার সম্পর্ক, তাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং ওয়ালিউর রহমানের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল।
এরপরেই সচিব প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে না গিয়ে নিজের অতীত-বর্তমান তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন। তিনি নিজেকে একজন মেধাবী, সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং সৎ কর্মকর্তা বলে দাবি করেন। এই পর্যায়ে শীর্ষকাগজের পক্ষ থেকে সচিবকে প্রশ্ন করা হয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব পদে প্রায় এক বছর কাজ করছেন, এর আগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে এখানে কর্মরত ছিলেন- এই সময়ে আপনার অর্জন কী? আওয়ামী লীগ আমলে সড়ক যোগাযোগ খাতে ব্যাপক দুর্নীতি-লুটপাট হয়েছে, এটা বহুল আলোচিত। বিগত সময়ের সেইসব অনিয়মের বিরুদ্ধে আপনি সচিব হিসেবে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন? জবাবে তিনি জানালেন, সড়ক অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা-প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সড়ক যোগাযোগ খাতে আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি-লুটপাটের তথ্য উদঘাটন ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি? এ প্রশ্নের তিনি ‘না’ সূচক জবাব দেন। তবে সড়ক অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে নিজ উদ্যোগে যেসব ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন, এরও সুনির্দিষ্ট বা বিস্তারিত কিছু তিনি বলতে পারেননি। এ বিষয়ে তথ্যের জন্য পরবর্তীতে ১৩ অক্টোবর সচিবের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। সচিবের পরিবর্তে তার পিএস ফাহমি মো. সায়েফ এসব তথ্যের জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। আদতে সড়ক সচিব জিয়াউল হক নিজ উদ্যোগে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন, এ রকমের উল্লেখযোগ্য কোনো নজির নেই। বরং তিনি নিজেকে সৎ কর্মকর্তা বলে দাবি করলেও এর অন্তরালে দুর্নীতিবাজদেরই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, এমন অসংখ্য নজির রয়েছে। তাঁর সততার মুখোশ পুরোপুরি খুলে পড়েছে গত ২২ আগস্টের রাজেন্দ্রপুরের ঘটনায়ই। এছাড়া আরও অনেক তথ্য শীর্ষকাগজ কর্তৃপক্ষের হাতে ইতিমধ্যেই এসেছে।
শীর্ষনিউজ