Image description

সংসারের অন্দরমহলে বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে জন্ম নেয় কত গল্প। কখনো ছেলের ওপর মায়ের অধিকার নিয়ে টানাপোড়েন, কখনো নতুন সংসারে বউয়ের নিজের জায়গা খুঁজে পাওয়ার লড়াই। আবার কখনো ভুল বোঝাবুঝি আর সন্দেহ থেকেই অশান্ত হয়ে ওঠে গোটা পরিবার। বাংলা সিনেমাও এই ঝগড়ার বাইরে থাকেনি। এই চেনা টানাপোড়েনই বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমায় পেয়েছে বাড়তি ঝাল-মসলা।

 

‘বাংলার বউ’, ‘দজ্জাল শাশুড়ি’, ‘বউ শাশুড়ির যুদ্ধ’, ‘স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ’, ‘মা বড় না বউ বড়’ কিংবা ‘হিংসা’— সিনেমার নামগুলোতেই যেন সংসারযুদ্ধের আগাম ঘোষণা! কোথাও শাশুড়ির অত্যাচারে অতিষ্ঠ বউ, কোথাও স্বামীকে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরাতে মরিয়া স্ত্রী, আবার কোথাও ভালোবাসতে চেয়েও ভুল বোঝাবুঝির শিকার হন শাশুড়ি।

 

বাংলার বউ, দজ্জাল শাশুড়ি: বউ কখনও প্রতিবাদী, কখনও নির্যাতিত

 

নতুন বউয়ের আগমন। ঘোমটা টেনে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখা মেয়েটির মনে নতুন সংসার নিয়ে কত স্বপ্ন! স্বামীকে ঘিরে নতুন জীবন, শ্বশুর-শাশুড়ির স্নেহ, পরিবারের সবার ভালোবাসা; সবকিছুর প্রত্যাশা থাকে তার। কিন্তু সেই সংসারেই যদি অপেক্ষা করে অপমান, নির্যাতন আর অবিশ্বাস? যদি শাশুড়ির চোখে বউ হয়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বী?

 

তখন নতুন বউয়ের স্বপ্নের সংসার ক্রমেই পরিণত হয় লড়াইয়ের ময়দানে। বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমায় এই গল্পেরই বহুল পরিচিত দুটি নাম ‘বাংলার বউ’ ও ‘দজ্জাল শাশুড়ি’।

 

 

পরিচালক এ কে সোহেলের ‘বাংলার বউ’ মুক্তি পায় ২০০৭ সালের ১ জানুয়ারি। ছবিতে অভিনয় করেছেন মৌসুমী, ফেরদৌস, রীনা খান, এটিএম শামসুজ্জামান, নিশু ও দুলারীসহ অনেকে। ছবির কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপও লিখেছেন পরিচালক নিজেই।

 

একই ধারার আরেকটি ছবি ‘দজ্জাল শাশুড়ি’। রকিবুল আলম রকিব পরিচালিত ছবিটি মুক্তি পায় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। এখানেও নির্যাতিত বউয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মৌসুমী। শাশুড়ির কর্তৃত্ব, অনমনীয় আচরণ এবং বউদের সঙ্গে বিরোধ পরিবারের পরিবেশকে অশান্ত করে তোলে।

 

শাবনূরের বউ শাশুড়ির যুদ্ধ, স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ

 

২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া বউ শাশুড়ির যুদ্ধ ছবিতে অভিনয় করেছেন শাবনূর, ফেরদৌস, রীনা খানসহ অনেকে। পরিচালক আজাদী হাসনাত ফিরোজের এই ছবিটি বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব নিয়ে নির্মিত বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

 

ছবিটির নামেই রয়েছে মূল সংঘাতের ইঙ্গিত। বিয়ের পর ছেলের জীবনে নতুন একজন মানুষের আগমন, পরিবারের পুরোনো সম্পর্কের সমীকরণে পরিবর্তন এবং সেই পরিবর্তন মেনে নেওয়ার টানাপোড়েন—এগুলোই বউ-শাশুড়ির গল্পের পরিচিত উপাদান। শাশুড়ির কাছে ছেলে নির্ভরতার কেন্দ্র, এছাড়া সংসারকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখতে শাশুড়ি সদা ততপর । অন্যদিকে বউও চান স্বামীর সংসারে নিজের সম্মানজনক জায়গা।

সংগৃহীত ছবি
সংগৃহীত ছবি

 

দুই নারীর ছোটখাটো মতবিরোধও রূপ নেয় বড় সংঘাতে। শাবনূরের প্রতিবাদী ভূমিকা আর রীনা খানের জেদি শাশুড়ির ভূমিকায় অভিনয় সিনেমায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

 

এদিকে মান্না, শাবনূর, পূর্ণিমা, রাজ্জাক, ডলি জহুর, ডিপজল ও মিশা সওদাগর অভিনীত স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন এফ আই মানিক। ছবিটি মুক্তি পায় ২০০২ সালের ৫ এপ্রিল।

 

ছবিটির কাহিনিতে দেখানো হয়েছে প্রেম, দাম্পত্য ও সম্পর্কের টানাপোড়েন। মান্নার চরিত্র রাজু, শাবনূরের ভাবনা এবং পূর্ণিমার আশা—এই সম্পর্কের সমীকরণ গল্পে জটিলতা তৈরি করে। রাজ্জাক অভিনয় করেছেন হাসান সাহেবের চরিত্রে, আর ডলি জহুর রাজুর মায়ের ভূমিকায়। ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকটের সঙ্গে পরিবারের প্রত্যাশার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। স্বামী কাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন, কার কথা শুনছেন, কার অনুভূতিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন—এসব প্রশ্নই পারিবারিক সংকটকে বাড়িয়ে দেয়। ধনী পরিবারের মেয়ে শাবনূর স্বামীকে মায়ের থেকে আলাদা করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। কিন্তু সফল হয় না।

 

মা বড় না বউ বড়: প্রশ্নটি আসলে কার?

 

আমিন খান, নিপুণ, আলীরাজ, ডলি জহুর ও কাজী হায়াৎ অভিনীত মা বড় না বউ বড় ছবিটি মুক্তি পায় ২০০৯ সালের ২৬ জুন। বিয়ের পর ছেলের জীবনে মায়ের গুরুত্ব কি বিয়ের পর কমে যায়? আবার স্ত্রীকে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ কি মাকে অবহেলা করা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বহু পরিবারে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। মা মনে করতে পারেন, ছেলে বদলে গেছে। স্ত্রী ভাবতে পারেন, স্বামী তাঁকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অথচ সমস্যার মূল হয়তো কাউকে কম ভালোবাসা নয়; বরং নতুন সম্পর্কের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কের ভারসাম্য তৈরি করতে না পারা।

 

 

একসময় টেলিভিশন, ভিডিও ক্যাসেট ও স্থানীয়ভাবে প্রদর্শনীর মাধ্যমে এসব বাণিজ্যিক সিনেমা গ্রামবাংলার অনেক পরিবারের বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছিল। ঘরের ভেতরের পরিচিত ঘটনা যখন বড় পর্দায় আরও নাটকীয় হয়ে ধরা দিত, তখন তা দর্শকের আগ্রহ তৈরি করত সহজেই।

 

 

এখানে শাশুড়ি বা ছেলের বউ, কাউকেই আলাদা করে দোষারোপ করা যায় না। নতুন সংসারে নারীর প্রত্যাশা পূরণ আর শাশুড়ির সম্মান বজায় রাখাকে কেন্দ্র করেই সিনেমার মূল গল্প লেখা হয়েছে।

 

হিংসা: পারিবারিক দ্বন্দ্বের আরেক নাম

 

১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া হিংসা ছবিতে অভিনয় করেছেন শাবানা, জসিম, শাহনাজ, অমিত হাসান ও হুমায়ূন ফরীদি। ছবিটির নামের মধ্যেই রয়েছে সম্পর্কের অবনতি ও বিরোধের ইঙ্গিত। এখানে শাবানার শাশুড়ি কুটিল শাশুড়ির চরিত্রে অভিনয় করেন। পরে দেখা যায় শাবানাও একসময় শাশুড়ি হোন। কিন্তু তিনি কোনো কুটিলতার আশ্রয় নেননি। বরং তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি শাশুড়ি হতে চাইনি, মা হতে চেয়েছিলাম।’

 

কিন্তু শাবানার পুত্রবধূ তাকে ভুল বোঝে। এই ভুল বোঝানোর পেছনেও আছে শাবানার শাশুড়ির কারসাজি। এভাবেই এগিয়ে যায় সিনেমার গল্প।

 

বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্বের গল্পে এত জনপ্রিয়তা কেন?

 

বাংলা সিনেমায় বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্বের জনপ্রিয়তার বড় কারণ, এই গল্পের সঙ্গে দর্শকের বাস্তব জীবনের পরিচয় আছে। বিশেষ করে গ্রামবাংলায় বিয়ে, যৌথ পরিবার, সংসারের সিদ্ধান্তে শাশুড়ির ভূমিকা কিংবা নতুন বউয়ের মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা বহু পরিবারের চেনা ছবি। তাই পর্দায় শাশুড়ি-বউয়ের মনোমালিন্য, ছেলেকে নিয়ে টানাটানি কিংবা সংসারে নিজের জায়গা করে নেওয়ার লড়াই দেখলে অনেক দর্শকই হয়তো নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে পান।

সংগৃহীত ছবি
সংগৃহীত ছবি

 

তবে এসব গল্পে বউ সব সময় নির্যাতিত আর শাশুড়ি সব সময় অত্যাচারী নন। দুই পক্ষেরই ভুল থাকতে পারে; থাকতে পারে জেদ, অভিমান কিংবা নিজের অধিকার ধরে রাখার চেষ্টা। ‘বাংলার বউ’ ও ‘দজ্জাল শাশুড়ি’তে রীনা খানের কঠোর শাশুড়ির চরিত্রের বিপরীতে দেখা যায় মৌসুমীর অসহায়তা ও প্রতিবাদ। অন্যদিকে ‘হিংসা’য় শাবানা নিজে শাশুড়ি হওয়ার পরও কুটিলতার আশ্রয় নেন না, কিন্তু তাঁর পুত্রবধূ তাঁকে ভুল বোঝেন। সেই ভুল বোঝাবুঝির পেছনে রয়েছে শাবানার নিজের শাশুড়ির ষড়যন্ত্র। আবার ‘স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ’ ছবিতে শাবনূরকে দেখা যায় জেদি ও একগুঁয়ে নারীর চরিত্রে। স্বামীকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সফল হয় না সে।

 

এই ধরনের সিনেমায় নাটকীয়তার উপাদানও কম নয়। ছেলের প্রতি মায়ের টান, বউয়ের ভালোবাসা ও সম্মান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সংসারে কর্তৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা সব মিলিয়ে তৈরি হয় টানটান পরিস্থিতি। কখনো ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে বাড়তে বড় সংঘাতে রূপ নেয়, কখনো অন্যায়ের প্রতিবাদে ঘুরে দাঁড়ায় কোনো চরিত্র। দর্শকও গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। কারও কষ্টে মন খারাপ হয়, কারও অন্যায় দেখে রাগ জমে, আবার অন্যায়ের জবাব পেলে আসে স্বস্তি। রীনা খানের মতো অভিনেত্রীরা কঠোর ও নেতিবাচক শাশুড়ির চরিত্রে এমন শক্তিশালী অভিনয় করেছেন যে দর্শকের মনে সেই চরিত্রগুলো সহজেই দাগ কেটেছে।

 

একসময় টেলিভিশন, ভিডিও ক্যাসেট ও স্থানীয়ভাবে প্রদর্শনীর মাধ্যমে এসব বাণিজ্যিক সিনেমা গ্রামবাংলার অনেক পরিবারের বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছিল। ঘরের ভেতরের পরিচিত ঘটনা যখন বড় পর্দায় আরও নাটকীয় হয়ে ধরা দিত, তখন তা দর্শকের আগ্রহ তৈরি করত সহজেই।