পদ্মার এক পাশে রাজবাড়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ। নদী পার হয়ে মানিকগঞ্জ। আবার মানিকগঞ্জের কোল ঘেঁষে যমুনা। এ দুই নদীর জন্য আলাদা দুটি সেতু— দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু তৈরি না করে এক সেতু দিয়েই এই অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের চাহিদা মেটাতে চায় সরকার। ব্যয় কমানোর জন্যই দুই নদীর ওপর ওয়াই শেপে এক সেতু নির্মাণের ভাবনা। কিন্তু ব্যয় কমাতে গিয়ে সেতু থেকে রেলপথও বাদ দেওয়ার কথা চলছে। রেলপথ বাদ দিলে আটকে যাবে রেল সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎ।
মানিকগঞ্জকে ঢাকার সঙ্গে রেলপথে যুক্ত করার চিন্তা থাকলেও সেই রেলসংযোগ সেতুর সঙ্গে যুক্ত হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। রেলওয়ে অবশ্য সেতুতে রেললাইন রাখার পক্ষে। সংস্থাটির মতে, ভবিষ্যতে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ এখন থেকেই তৈরি রাখা প্রয়োজন।
এখনো চূড়ান্ত নকশা বা অনুমোদিত প্রকল্পের পর্যায়ে পৌঁছায়নি ভাবনাটি। সেতুর অবস্থান, দুদিকে সংযোগের ধরন, কাঠামো ও ব্যয় নির্ধারিত হবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে। রাজবাড়ীর কোন স্থান থেকে সেতুর সংযোগ শুরু হবে, তা-ও চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্য পথ নিয়ে তাদের প্রাথমিক ধারণা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
দুটি সেতুর বদলে একটির সম্ভাবনা
সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ভাষ্য, পৃথক দুটি সেতু নির্মাণ না করে একটির মাধ্যমে দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর উদ্দেশ্য পূরণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সেতুর মাঝামাঝি অংশ থেকে দুটি সংযোগ পথ আলাদা হয়ে যেতে পারে। একটি পথ ওপর দিয়ে, অন্যটি নিচ দিয়ে নেওয়ার ধারণাও রয়েছে। এতে প্রায় একটির ব্যয়ে দুটি সেতুর উদ্দেশ্য পূরণ সম্ভব কি না, তা যাচাই করা হবে।
প্রস্তাবিত সেতুতে আপাতত রেললাইন রাখার পরিকল্পনা নেই বলে আগামীর সময়কে জানিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী। তবে মানিকগঞ্জকে ঢাকার সঙ্গে রেলপথে যুক্ত করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। এই রেলসংযোগ প্রস্তাবিত সেতুর সঙ্গে যুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
পরিকল্পনাটির ধারণাগত ভিত্তি হিসেবে পুরনো আরিচা ফেরিঘাটের যোগাযোগব্যবস্থার উদাহরণ দিয়েছেন মন্ত্রী। ওই ঘাট থেকে ফেরি রাজবাড়ী ও পাবনার পৃথক ঘাটের দিকে চলাচল করত। সে ধরনের সংযোগের আদলে একটি অবকাঠামো থেকে দুদিকে যাতায়াতের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে দুটি গন্তব্যে সংযোগ তৈরি করলেই পৃথক দুটি সেতুর সমান সুবিধা পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ওয়াই আকৃতির কাঠামোর প্রকৌশলগত জটিলতা, নদীর গতিপ্রকৃতি, সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য, জমি অধিগ্রহণ ও যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। এসবের ভিত্তিতেই প্রকৃত ব্যয় ও অর্থনৈতিক সুবিধা নির্ধারণ করা সম্ভব।
রাজবাড়ী থেকে দুদিকে সংযোগ
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্য পথ হিসেবে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া এবং গোয়ালন্দ থেকে পাটুরিয়া— দুটি রুট নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্য পথের তালিকায় রয়েছে গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ঘাট, বগুড়া-জামালপুর সংযোগ, পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ এবং রাজবাড়ী-পাবনা রুট।
নতুন সমন্বিত পরিকল্পনায় রাজবাড়ী থেকে মানিকগঞ্জ এবং রাজবাড়ী থেকে পাবনায় সংযোগের ধারণা সামনে এসেছে। তবে এসব সম্ভাব্য পথের কোনোটি এখনো ওয়াই আকৃতির সেতুর চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট হিসেবে অনুমোদন করা হয়নি। সেতুর মূল অংশ কোথায় থাকবে, কোথায় শাখা তৈরি হবে এবং কোন নদী বা সংলগ্ন এলাকায় কী ধরনের কাঠামো প্রয়োজন হবে— তা সমীক্ষায় যাচাই শেষে নির্ধারণ করা হবে।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, সেতুর সূচনা গোয়ালন্দে হবে, নাকি দৌলতদিয়ায়— এ বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। সমীক্ষার ফল পাওয়ার পর সম্ভাব্য পথ ও কাঠামো নিয়ে আলোচনা করা হবে।
পরিকল্পনায় নেই রেললাইন
সেতুতে রেললাইন না থাকার অবস্থানে আপত্তির ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের মতে, সেতু একটি হোক বা দুটি— রেলওয়ে সেখানে রেললাইন রাখতে চাইবে। ভবিষ্যতে রেলপথের বিস্তার বাড়াতে এখন থেকেই সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার রেললাইন সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তাই প্রস্তাবিত সেতুতেও রেলপথের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এ বিষয়ে রেলওয়ে চিঠি দিয়ে সেতু বিভাগকে নিজেদের মতামত জানিয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত সেতুর ক্ষেত্রে শুধু সড়ক যোগাযোগের সুবিধা নয়, ভবিষ্যৎ রেল যোগাযোগের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়ার প্রশ্ন উঠেছে।
সমীক্ষায় এখনো অসম্পূর্ণ পদ্মার পথ
দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য কয়েকটি বিকল্প পথের প্রাথমিক ধারণা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সমীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান সার্ম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিয়া মোহাম্মদ কাইয়ুম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন এ তথ্য।
তিনি জানালেন, সমীক্ষার দরপত্র আহ্বানের সময় শুধু দ্বিতীয় যমুনা সেতুর কথা ছিল। পরে এর সঙ্গে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুও যুক্ত করা হয়। যমুনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পথ নিয়ে প্রাথমিক ধারণা তৈরি হলেও পদ্মার ক্ষেত্রে তা এখন পর্যন্ত প্রস্তুত হয়নি। এসব আলোচনা থেকে নিরপেক্ষভাবে সমীক্ষা সম্পন্ন করাই তাদের লক্ষ্য।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর পথ নির্ধারণে আগেও বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রথম পদ্মা সেতুর জন্য জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ২০০৩-০৫ সালের সমীক্ষায় চারটি পথ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। এগুলো হলো, পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ, দোহার-চরভদ্রাসন, মাওয়া-জাজিরা ও চাঁদপুর-ভেদরগঞ্জ। পরে মাওয়া-জাজিরার পথে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে ২০২২ সালের ২৫ জুন।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর অর্থায়নের উৎস নিয়েও একসময় আলোচনা ছিল। চীনের আগ্রহের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছিল। তবে নতুন সমন্বিত পরিকল্পনায় অর্থায়নের ধরন, মোট ব্যয় এবং পৃথক দুটি সেতুর তুলনায় সম্ভাব্য সাশ্রয়ের পরিমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
দ্রুত সমীক্ষা শেষ করার তাগিদ
দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। পরামর্শক দলে বাংলাদেশের সার্ম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের পাশাপাশি নেপাল, সুইডেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাব-কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করবে বাংলাদেশের টিলার।
চুক্তি অনুযায়ী, সমীক্ষা শেষ করার সময় ১২ মাস। তবে গুণগত মান বজায় রেখে ৮ থেকে ৯ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার অনুরোধ জানিয়েছে সেতু বিভাগ। সমীক্ষায় সম্ভাব্য পথ ও কাঠামোর পাশাপাশি কারিগরি, অর্থনৈতিক, আর্থিক, পরিবেশগত ও সামাজিক দিক মূল্যায়ন করা হবে। সেতুর সম্ভাব্য দৈর্ঘ্য, সংযোগ সড়ক, নির্মাণব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগের চাহিদাও বিবেচনায় থাকবে।
সমীক্ষা শেষ হওয়া মানেই নির্মাণকাজ শুরু নয়। এরপর প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ, অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি ও অনুমোদন, বিস্তারিত নকশা, জমি অধিগ্রহণ এবং ঠিকাদার নিয়োগের মতো নানা ধাপ রয়েছে। বিদেশি ঋণের প্রয়োজন হলে অর্থায়ন নিশ্চিত করতেও সময় লাগতে পারে।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে দুটি ছোট সেতুর পরিকল্পনা ছিল। এখন সেগুলো মিলিয়ে একটি সেতু করা হবে কি না, তা সমীক্ষা চলাকালে বলা ঠিক হবে না। সমীক্ষার তথ্য পাওয়ার পর সেতুর ধরন ও কাঠামো নিয়ে আলোচনা করা হবে।
সংযোগ সড়ক ও প্রকৌশলগত সক্ষমতাই বড় পরীক্ষা
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। এর নির্মাণ নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার কথাও জানিয়েছিল সেতু বিভাগ। তবে দুটি সেতুর উদ্দেশ্য একটি সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে পূরণের ধারণা সামনে আসায় প্রকল্পের পরিধি, ব্যয় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নতুন করে নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানের মতে, বড় সেতুর সুফল পেতে শুধু নদীর ওপর অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়। দুই প্রান্তের সড়ক, সংযোগ পথ এবং আশপাশের যোগাযোগব্যবস্থার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হয়। সেতুর পথ যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্ধারণ করা না হয়, বরং তুলনামূলক বেশি উপকারভোগী অঞ্চলকে বেছে নেওয়া জরুরি।
টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের মধ্যে প্রথম যমুনা সেতু উদ্বোধন করা হয় ১৯৯৮ সালে। ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতুতেও রেলপথ না রাখার পরিকল্পনা ছিল, যা পরে সংযোজন করা হয়। এতে ব্যয় বেড়ে যায় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।