Image description

প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক, তারপর কলেজ— শিক্ষার প্রতিটি ধাপে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। কোনো কোনো স্তরে তারা ছেলেদের পেছনেও ফেলেছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার দরজায় পৌঁছাতেই বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৩৯ জন। কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় এ সংখ্যা আরও কম, ৩০ জনেরও নিচে। ডিপ্লোমা পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর অংশ নেমে এসেছে ২৩ দশমিক ৮২ শতাংশে।

শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের যে অগ্রযাত্রা, উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় তা আর একই গতিতে এগোচ্ছে না। শুধু শিক্ষার্থী হিসেবেই নয়, শিক্ষকতা এবং প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরিতেও নারীর অংশগ্রহণে রয়েছে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান। অর্থাৎ শিক্ষার পথ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই সামনে আসছে নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে নানা বাধা। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস)  শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে নারীশিক্ষার এই বৈপরীত্য।

পরিসংখ্যান বলছে, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে মেয়েরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের অংশগ্রহণ এখনো ৪০ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় তাদের উপস্থিতি আরও সীমিত। ফলে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মেয়েদের অগ্রগতি থাকলেও উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের প্রস্তুতিতে সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যাচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজনীন ইসলামের মতে, এর পেছনে রয়েছে সুযোগ ও পরিবেশগত নানা কারণ। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের অভাব, বাল্যবিয়ে, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি— সবকিছুই মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ১২ বছরের শিক্ষাজীবন শেষ করে একটি মেয়ে কেন উচ্চশিক্ষায় গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, তা চিহ্নিত করা সরকারের দায়িত্ব বলেও মনে করেন তিনি।

মাধ্যমিক-কলেজে মেয়েদের অগ্রযাত্রা

গত এক দশকের পরিসংখ্যান বলছে, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। ২০১৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থীর ৫৩ দশমিক ৩১ শতাংশ ছিল মেয়ে। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশে। অর্থাৎ এক দশকে এ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর অংশ বেড়েছে ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

কলেজ পর্যায়ে অগ্রগতির চিত্র আরও স্পষ্ট। ২০১৫ সালে কলেজের মোট শিক্ষার্থীর ৪৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ ছিল নারী। ২০২০ সালে তা বেড়ে হয় ৫০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে নারী শিক্ষার্থীর অংশ দাঁড়ায় ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশে। এক দশকে বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

শুধু অংশগ্রহণের হার নয়, বেড়েছে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ২০১৫ সালে কলেজে নারী শিক্ষার্থী ছিলেন ১৭ লাখ ৯ হাজার ১৭১ জন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৩ লাখ ৮১ হাজার ১২৩। অর্থাৎ এক দশকে কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭২ হাজার।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠতেই বদলে যায় চিত্র

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর অংশ গত এক দশকে বেড়েছে ঠিকই, তবে তা এখনো মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকের অনেক নিচে। ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ ছিলেন নারী। ২০২০ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ১৯ শতাংশে। ২০২৫ সালে তা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এক দশকে নারী শিক্ষার্থীর অংশ বেড়েছে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১৭৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ১১ লাখ ১৩ হাজার ৯৮২ জন। তাদের মধ্যে নারী ৪ লাখ ৩৮ হাজার ২৬২ জন। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৩৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ নারী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান মনে করেন, শিক্ষার এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়ার পথে মেয়েদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সীমিত সুযোগ, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের সংকট, বাল্যবিয়ে এবং পারিবারিক দায়িত্বের মতো বিষয় এ ব্যবধান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে মাধ্যমিক বা কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ঠিক কতসংখ্যক মেয়ে ঝরে পড়ছে, কিংবা কোন কোন কারণে তারা উচ্চশিক্ষায় যেতে পারছে না, সে বিষয়ে ব্যানবেইসের পরিসংখ্যানে সরাসরি ব্যাখ্যা নেই। এজন্য স্তরভিত্তিক উত্তরণের হার, ঝরে পড়ার প্রবণতা, অঞ্চলভেদে সুযোগ এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারিগরি শিক্ষায় আরও পিছিয়ে নারীরা

সাধারণ শিক্ষায় মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১০ হাজার ৫২১টি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯৪ জন। তাদের মধ্যে নারী ৪ লাখ ৩ হাজার ৪৫৮ জন। অর্থাৎ এ খাতের মোট শিক্ষার্থীর ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ নারী। ডিপ্লোমা পর্যায়ে ব্যবধান আরও বেশি। সেখানে নারী শিক্ষার্থীর অংশ মাত্র ২৩ দশমিক ৮২ শতাংশ।

শিক্ষকতায়ও পিছিয়ে নারী

শিক্ষার্থী হিসেবে নারীর অংশগ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় রয়েছে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি-বেসরকারি ১৭৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক ৩৪ হাজার ৮৩১ জন। তাদের মধ্যে নারী ১০ হাজার ৬১৮ জন, যা মোট শিক্ষকের ৩০ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের অংশ ২৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ৩৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের অংশ ২৬ দশমিক ১৮ শতাংশ।

তবে প্রাথমিক শিক্ষায় চিত্রটি ভিন্ন। প্রাথমিক শিক্ষা তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের (আইপিইএমআইএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক ৩ লাখ ৭১ হাজার ৯২৮ জন। তাদের মধ্যে নারী ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৫ জন। অর্থাৎ নারী শিক্ষকের অংশ প্রায় ৬৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ। পুরুষ শিক্ষক ১ লাখ ২৩ হাজার ২০৩ জন, যা মোট শিক্ষকের প্রায় ৩৩ দশমিক ১১ শতাংশ।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের বিষয়টি এ পর্যায়ে নারী শিক্ষকের অংশ বেশি থাকার অন্যতম কারণ।

সরকারি চাকরিতেও ক্যাডারভেদে ভিন্ন চিত্র

শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নারীদের অগ্রযাত্রা সব জায়গায় সমান নয়। বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্তির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডার এবং বিশেষ বিসিএসে নারীরা তুলনামূলক ভালো করলেও প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ ক্যাডারে তাদের অংশগ্রহণ কম।

৪৪তম বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশে প্রশাসন ক্যাডারের ১৫৯টি পদের বিপরীতে নারী সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মাত্র ৯ জন। পুলিশ ক্যাডারে ৬৪ জনের মধ্যে নারী চারজন এবং পররাষ্ট্র ক্যাডারে ১৩ জনের মধ্যে নারী তিনজন। এ ছাড়া আনসার ক্যাডারে একজন, নিরীক্ষা ও হিসাবে পাঁচজন এবং কর ক্যাডারে তিনজন নারী সুপারিশ পেয়েছেন।

এই বিসিএসে মোট ৯৩৪ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন ২৪৯ জন। সাধারণ ক্যাডারের ৪৪৯টি পদের মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ৮৫টি। অন্যদিকে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে ৮৮৫টি পদের মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ১৬৪টি।

বিশেষ বিসিএসে অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ৩৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৪ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীরা ৪৭ শতাংশের বেশি সুযোগ পেয়েছিলেন। ৪২তম বিশেষ বিসিএসেও নারী সুপারিশপ্রাপ্তির হার ছিল ৪৯ দশমিক ২ শতাংশের কাছাকাছি।

ক্যাডারভেদে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয় কৃষি ও শিক্ষা ক্যাডারে। কৃষি ক্যাডারের ৮৫টি পদের বিপরীতে নারীরা পেয়েছেন ৪৩টি। শিক্ষা ক্যাডারের ইংরেজি, অর্থনীতি, বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিষয়ের বিভিন্ন পদেও নারীরা তুলনামূলক ভালো করেছেন।