জাপান ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক দূরত্ব প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার। কিন্তু ঢাকার ব্যস্ত রাজপথ থেকে টেকনাফ বা তেঁতুলিয়ার মহাসড়ক— সর্বত্র এক অবিচ্ছেদ্য সুতায় বাঁধা পড়ে আছে দুই দেশ। আর সেই সুতার মূল রূপকার জাপানি অটোমোবাইল জায়ান্ট ‘টয়োটা’। চার চাকার জাপানি গাড়ির রাজত্বে বাংলাদেশ যেন এক জীবন্ত গবেষণাগার। কারণ আমদানির ইউনিট বিচারে বৈশ্বিক তালিকায় ১৫তম হলেও, কোনো দেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজপথে একক ব্র্যান্ড হিসেবে ‘টয়োটা’ ব্যবহারে বিশ্বে তৃতীয় শীর্ষ স্থানটি দখল করে আছে বাংলাদেশ। ফলে রাজপথে ব্যক্তিগত যানবাহনের প্রতি ১০টির অন্তত ৮টিই জাপানের তৈরি, যার সিংহভাগই টয়োটার বিভিন্ন ফ্ল্যাগশিপ মডেল।
এই গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্কের ঠিক এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণে কূটনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হচ্ছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। আগামী ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য টোকিও সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বাণিজ্য, কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসছে ‘মিরাকল কার’ টয়োটার ৬২ বছরের বন্ধুত্বের হাত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মূল এজেন্ডার কয়েকটির মধ্যে একটি থাকছে দেশের ট্রিলিয়ন টাকার অটোমোবাইল বাজারের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, শুল্ক কাঠামো এবং হাইব্রিড-ইভি যুগে জাপানি রিকন্ডিশন গাড়ির কৌশলগত অবস্থান।
জাপানের নীতিনির্ধারকরা যখন তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ গ্লোবাল অটোমোবাইল মাস্টারপ্ল্যান সাজাচ্ছেন, তখন দক্ষিণ এশিয়ায় জাপানি পার্টস, রি-কনফিগারেশন এবং ভবিষ্যৎ ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড ইকোসিস্টেম সম্প্রসারণে বাংলাদেশকে বিবেচনা করছে নির্ভরযোগ্য ‘কৌশলগত নোড’ হিসেবে। আগামী ২০৩০ সালকে লক্ষ্য রেখে জাপানের অটোমোবাইল খাত বৈশ্বিক রপ্তানি ও বিক্রির যে নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেটি মাথায় রেখে দেশে জাপানি ব্যবহৃত গাড়ির বাজার ২০৩১ সালের মধ্যে ২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যাবে— এমন তথ্য দিয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
সেখানে অারও বলা হয়, ২০২৬ সালে দেশের জাপানি গাড়ির বাজার বেড়ে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন বা ১৬৫ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত গাড়ির বাজার ৭ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পাবে।
সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অটোমোবাইল শিল্পে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক নতুন স্বর্ণালি অধ্যায়। জাপানি অটোমোবাইল ‘টয়োটা’ বাংলাদেশে নিজস্ব গাড়ি সংযোজন ও উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি টয়োটা গ্রুপের বাণিজ্যিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘টয়োটা তসুশো করপোরেশন’-এর ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিটানি এবং মবিলিটি বিভাগের সিইও শিগেইরু হারাদার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে এ বিনিয়োগ পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপরেখা তুলে ধরে। ২০২৭ সালে বাংলাদেশের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে টয়োটা বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের সঙ্গে, বাংলাদেশের জন্য’ উন্নয়ন দর্শনকে সামনে রেখে হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকেল (এইচইভি) উৎপাদন শিল্প (কারখানা) গড়ে তোলার কাজ শুরু হওয়ার কথা। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়ে এই কারখানা ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাবে।
স্থানীয়ভাবে টয়োটার উৎপাদন শুরু হলে বিশাল আমদানি শুল্ক সাশ্রয় হবে, যা দেশের বাজারে ব্র্যান্ড নিউ হাইব্রিড গাড়ির দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসবে। এ ছাড়া প্রকল্পটি দেশীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য সৃষ্টি করবে বিপুল কর্মসংস্থান ও জাপানি উচ্চতর প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ। পাশাপাশি, খুচরা যন্ত্রাংশের এক বিশাল ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠে দেশের অর্থনীতিতে যোগ করবে নতুন গতি।
এ প্রসঙ্গে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) মহাসচিব রবিউল আলম আগামীর সময়কে বলছেন, জাপানি অটোমোবাইল খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে নীতির স্থিতিশীলতা ও শুল্ক কাঠামোর সহজীকরণ অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন ও উচ্চ শুল্ক হারের কারণে টয়োটার মতো শীর্ষ অটোমোবাইল জায়ান্টগুলো দেশে নিজস্ব বড় সংযোজন প্ল্যান্ট স্থাপনে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। জাপান থেকে নতুন ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি (যেমন— হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক ভেহিকেল) আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক সুবিধা, বন্দর ও লজিস্টিকস জটিলতা কমালে আমদানিকারক ও স্থানীয় গ্রাহক— উভয়েই উপকৃত হবেন। প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিনিয়োগবান্ধব শুল্ক নীতি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে জাপানি অটোমোবাইল খাতের বিনিয়োগ ও সংযোজন শিল্পের প্রসার আরও ত্বরান্বিত হবে।
গ্লোবাল ইমপোর্ট র্যাংকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে নিবন্ধিত ব্যক্তিগত চার চাকার যানের ৭৫-৮০ শতাংশ এককভাবে জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর (টয়োটা, হোন্ডা, নিসান, মিতসুবিশি) দখলে। জাপান থেকে বছরে ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার ইউনিট রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি করছে বাংলাদেশ।
জানা গেছে, বাংলাদেশের চার চাকার যানবাহনের বাজারে জাপানি ‘টয়োটা’র বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল ষাটের দশকে। জাপান থেকে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম টয়োটা গাড়ি আমদানির সূচনা হয় ১৯৬৪ সালের ২০ এপ্রিল। প্রখ্যাত ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টয়োটা মোটর করপোরেশনের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ওই সময় দেশে আমেরিকান ও ইউরোপীয় বড় গাড়ির আধিপত্য ছিল। আকারে ছোট হওয়ায় শুরুতে গ্রাহকদের দ্বিধা থাকলেও পরে ‘টয়োটা করোনা’ কম জ্বালানি খরচ ও স্থায়িত্বের কারণে মাত্র ৫ বছরে বাজারের ৮০ শতাংশ দখল করে নেয় এবং ‘মিরাকল কার’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৮১ সালে ‘আফতাব অটোমোবাইলস’ দেশে টয়োটা ও হিনো গাড়ি সংযোজন শুরু করেন। ঐতিহাসিক এই উদ্যোগের পথ ধরেই দেশে টয়োটা আজ সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্র্যান্ড।
কোনো দেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজপথে একক ব্র্যান্ড হিসেবে ‘টয়োটা’ ব্যবহারে বিশ্বে তৃতীয় শীর্ষ স্থানটি দখল করে আছে বাংলাদেশ। প্রথম স্থানে আছে মঙ্গোলিয়া (৮৫-৯০ শতাংশ), দ্বিতীয় স্থানে নিউজিল্যান্ডে (৮০-৮৫ শতাংশ) চতুর্থ স্থানে পূর্ব আফ্রিকা (৭০-৭৫ শতাংশ) এবং পঞ্চম স্থানে আফ্রিকা ( ৬৮-৭২ শতাংশ) ব্যবহৃত গাড়িই সরাসরি জাপান থেকে আসে।
জানতে চাইলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে রিকন্ডিশন গাড়ির বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘দেশে যে টয়োটার কারখানা স্থাপন হবে সেটি যেমন ভালো, তেমনি এতে বাংলাদেশের লাভ কী হবে, সে হিসাবটি সামনে আসা দরকার।’