Image description

গাজীপুরের টঙ্গীতে কওমি মাদ্রাসায় ছয় বছরের শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষককে চড় দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন শিশুটির বাবা। এরপর তার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছেন কওমিপন্থীদের একটি অংশ। তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তার শাস্তির দাবিতে টঙ্গীতে জমায়েতেরও আয়োজন করা হয়েছে।

সুপরিচিত ইসলামি বক্তা ও ওয়াজকারীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, শিশুটিকে ‘সামান্য চুমু’ দেওয়া গুরুতর অপরাধ নয়। একজন বক্তা বলেছেন, ‘বলাৎকার, ধর্ষণ করলে মানুষ কাফের হয়ে যায় না।’

ইসলামি পরিভাষায় শিরক মানে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে তুলনা এবং কাফের মানে ইসলামের মৌলিক সত্যকে অস্বীকারকারী।

শিশুটির বাবা শুক্রবার দুপুরে একাধিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হুমকিমূলক মন্তব্য করা হচ্ছে। এতে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

তবে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ভয় আমার অভিধানে নেই! আমাকে হুমকি দিয়ে দমিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখো না। মনে রেখো, আমি বাংলাদেশ।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব টাইমসকে বলেন, ‘বিএনপি সরকারকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা ইউনূসের মতো মবতন্ত্র অ্যালাউ করবে নাকি করবে না।’

অন্তর্বর্তী সরকার ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ও জঙ্গি মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দিয়ে শক্তিশালী করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, বিএনপি সরকারের উচিত এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। যারা হুমকি দিচ্ছে, তাদের আগে গ্রেপ্তার করতে হবে।

কওমিপন্থীদের ‘সামান্য চুমু’র বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ‘সামান্য চুমুর জন্য তো সৌদি আরবে দুইজনকে ফাঁসি দিয়ে দিল।’

যেভাবে সামনে আসে ঘটনা

টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার ক্বারীউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় ঘটনাটি ঘটে। গত ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মুসলেউদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন শিশুটির বাবা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বাবার জেরার মুখে মুসলেউদ্দিন শিশুটিকে অশালীনভাবে স্পর্শ করার কথা স্বীকার করছেন। বিষয়টি কাউকে জানালে শিশুটিকে মারধরের হুমকিও দেন তিনি।

 

ক্ষুব্ধ বাবা একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে মুসলেউদ্দিনকে চড় মারেন। এতে মাদ্রাসাশিক্ষক মেঝেতে পড়ে যান। পরে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। শিশুটির বাবা মামলা করলে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোসেন বলেন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কওমি মাদ্রাসায় ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। এসব ঘটনায় প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে গত কয়েক মাসে অভিভাবকদের মধ্যে প্রতিবাদের প্রবণতা বেড়েছে। তারা একাধিক মাদ্রাসায় গিয়ে জবাবদিহি চেয়েছেন। কেউ কেউ সন্তানদের মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। কোথাও অভিভাবক ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

অন্যদিকে, কওমিপন্থীদের একটি অংশ এসব অভিযোগকে ঢালাও বলে উপেক্ষা করছে। কিছু আলেমের বক্তব্য, মুসলমান হিসেবে মাদ্রাসায় যৌননিপীড়নের ঘটনা গোপন রাখা সংবাদকর্মীদের ইমানি দায়িত্ব। কেউ কেউ এসব অভিযোগকে মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ বলেও দাবি করেছেন।

ক্বারীউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার ঘটনা সামনে আসার পর কওমিপন্থীদের একটি অংশ সরাসরি অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ‘তৌহিদি জনতা’ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠী বিভিন্ন ঘটনায় নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে সমালোচিত হয়েছে। এবার শিশুটির বাবার চড় মারার ঘটনায় তারা তার সমালোচনা করছে। তাদের প্রশ্ন, এভাবে কেন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হবে?

শানে সাহাবা জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশন শিশুটির বাবার শাস্তির দাবিতে জমায়েতের ডাক দিয়েছে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মুফতি শামীম মজুমদার জানিয়েছেন, তাদের নেতাদের পাশাপাশি পাঁচ শতাধিক আলেম তাদের পাশে আছেন।

 

শামীমের দাবি, তারা টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। শিশুটির বাবাকে আইনের আওতায় আনার আশ্বাসও পেয়েছেন।

তবে, শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সংগঠনটির প্রধানের দাবি সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি মো. আরিফুর রহমান। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘শিশুটির বাবার প্রাণনাশের হুমকির বিষয়টি আমরা অবগত ছিলাম না। তিনি যদি আদালতের শরণাপন্ন হয়ে নিরাপত্তা হেফাজত চান, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব। ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই বজায় রেখে চলতে হবে।’

সামাজিক মাধ্যমে হুমকি ও অভিযুক্তের পক্ষে প্রচার

কওমিপন্থীদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটির বাবাকে প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে। গাজীপুরের আলাউদ্দিন জামিয়া মাদ্রাসার হাদিসের শিক্ষক মুফতি ইসহাক মাহমুদ কামালপুরী শিশুটির বাবার ছবি পোস্ট করে তাকে ‘বদমায়েশ’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘অলরেডি ঘোষণা করা হয়েছে, একে যেখানেই পাওয়া যাবে গণধোলাই আর জুতাপেটা করা হবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মীয় বক্তা শেখ ফয়জুল্লাহ আরকামী নিজের ফেসবুক আইডিতে শিশুটির বাবাকে ‘কুলাঙ্গার’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এত বড় স্পর্ধা মাদ্রাসার ভিতরে এসে মব সৃষ্টি করবে! ফাইটিংফিট বডি নিয়ে হিংস্র কায়দায় হামলে পড়বে একজন নিরীহ শিক্ষকের ওপর! তাকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি। তার বিচারের আওয়াজ তোলা একান্ত কর্তব্য।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘একদিন এক জায়গায় দাপট দেখিয়েছে, আরেকদিন আরেক জায়গায় দেখাবে, তাই প্রতিরোধ করতে হবে… টঙ্গীর ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে বসে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিন। বসে থাকলে চলবে না।’

ইসলামি বক্তা আবদুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাকের ফেসবুক পাতায় প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাকে ধর্মীয় সভায় বক্তব্য দিতে দেখা যায়। টঙ্গীর ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বলাৎকার-ধর্ষণ করলে মানুষ কাফের হয়ে যায় না, কিন্তু শিরক করলে মানুষ কাফের হয়ে যায়।’

শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শানে সাহাবা জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশনের একটি পোস্টে শফিকুল ইসলাম নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, ‘শানে সাহাবার হাতকে শক্তিশালী করুন। একটি শিশুকে চুমু… এত বড় অপরাধ?’

পোস্টে অনেকে মন্তব্য করেছেন, ‘একজন হুজুরের গায়ে হাত তুলছে, আল্লাহর গজব পড়বে! একটা চুমুই তো দিয়েছে, তাতে কী?’

মো. মিনহাজুর রহমান নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রশ্ন করা হয়েছে, ‘আসো চুমু দিই কথাটি কীভাবে যৌন নিপীড়ন হয়?’

শেখ বারাতুল ইসলাম দাবি করেছেন, মেয়েশিশুটি পরীক্ষায় ভালো করায় তাকে আদর করার কথা বলেছিলেন মাদ্রাসাশিক্ষক। তার অভিযোগ, আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাশিক্ষক, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের হেনস্তা ও চরিত্রহনন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরে তাদের নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার নজিরও রয়েছে।

জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা জোবায়ের আহমেদ তাশরিফ ফেসবুক পেজে ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছেন, শিক্ষক শিশুটিকে চুমু দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তার বক্তব্য, ‘আর চুম দিলেই দিল কথার কথা, তাই বলে এভাবে পিটাবি?’

মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

টঙ্গীর মাদ্রাসার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বলাৎকার, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসছে। এসব ঘটনায় অভিভাবক ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে।

গত বুধবার ঢাকার সাভারে ১৩ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগে একটি মাদ্রাসা ও অভিযুক্ত শিক্ষকের বাড়িতে ভাঙচুর চালান এলাকাবাসী। অভিযুক্ত শিক্ষকের স্ত্রী ও ছেলেকে উদ্ধার করতে গিয়ে জনতার ঘেরাওয়ের মুখে পড়ে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার রাতে পাবনা সদর উপজেলার দড়ি ভাউডাঙ্গা কদমতলা গ্রামের নুরে মদিনা মহিলা মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। শুক্রবার সকালে উত্তেজিত জনতা মাদ্রাসাটিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পরে শিক্ষক আবু ইউসুফকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় তারা।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির টাইমসকে বলেন, তাদের পর্যবেক্ষণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অধিকাংশ ঘটনা মাদ্রাসায় ঘটছে। ছেলে শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ ও বলাৎকারের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে দেখা যাচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রধান নির্বাহী ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের ঘটনা নতুন নয়; আগে থেকেও ছিল, এখন হয়তো বেশি প্রকাশ পাচ্ছে।’

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের চেয়ে বাস্তবে এ ধরনের ঘটনা বেশি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘কারণ অনেক ঘটনা গোপন থাকে।’

আন্তর্জাতিক ইসলামি গবেষক মারিয়াম শেইবানিও মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন নিয়ে গবেষণা করেছেন। একটি নিবন্ধে তিনি বলেছেন, ধর্মীয় শিক্ষক বা নেতার বিরুদ্ধে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার অজুহাতে আলোচনা বন্ধ করা বা অভিযোগ চাপা দেওয়া সমস্যাকে আরও বাড়ায়।

আরেক ইসলামি চিন্তাবিদ ফারাজ রব্বানি যৌন নিপীড়নকে অন্যের ওপর জুলুম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এ অপরাধের দায় নির্যাতনকারীর, নির্যাতিত ব্যক্তির নয়।

এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মীর হুযাইফা আল মামদূহ টাইমসকে বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে যেকোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও গণপিটুনি বা সংঘবদ্ধ হামলার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ধর্মীয় নেতাদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষ্য, ‘মাদ্রাসার লোকদেরই এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। তাদের বলতে হবে, আমরা পুরোপুরি এর বিরুদ্ধে। যারা এ ধরনের কাজ করবে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।’

এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘আবাসিক মাদ্রাসার অনেক শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসে; পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির ঘাটতি ঝুঁকি বাড়ায়।’

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্নিগ্ধা রেজওয়ানা বলেন, শিশুর যৌন শোষণকে শুধু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ভাবে দেখলে চলবে না। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ বিষয়টি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে।