Image description

দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় ঋণ কেলেঙ্কারির নাম ‘হল-মার্ক গ্রুপ’ ঋণ কেলেঙ্কারি। নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া এলসি ও জাল নথিপত্র তৈরি করে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে এই ঋণ নেওয়া হয়। হলমার্ক গ্রুপের সঙ্গে 'টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিশন লিমিটেড' এর পরিচালক তসলিম হাসান ও ব্যাংকের কর্মকর্তারা মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এ আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত। এ কেলেঙ্কারির ঘটনায় মোট ৩৪টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে বিগত ১৩ বছরে মাত্র ১০টি মামলার বিচার হয়েছে অধস্তন আদালতে। তবে যুগ পেরিয়ে গেলেও হলমার্ক গ্রুপের আরও ১০টি মামলা ও এই সিন্ডিকেটের সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আরও ১৪ মামলা মিলে মোট ২৪ মামলার বিচার এখনো অধস্তন আদালতেই শেষ হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতির মামলার বিচার ৬০ কার্যদিবসে নিষ্পত্তি করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। অথচ এক যুগের বেশি সময় পার হলেও হলমার্ক কেলেঙ্কারির ২৪টি মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হয়নি ভয়াবহ এ আর্থিক সিন্ডিকেটের অন্যতম তসলিম হাসানদের মতো জড়িত বাকি হোতারা। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির ঋণের অর্থ আদায় করা যায়নি এক যুগেও। অন্যদিকে রায় হওয়া মামলায় ১০ বছর সাজা হলেও কারাগারে থাকা চার ব্যাংক কর্মকর্তা ১৪ বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন। অন্য মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় এসব কর্মকর্তার কারামুক্তিও মিলছে না।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২০১৩ সালে মোট ৩৪ টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে ঢাকার দুই নাম্বার বিশেষ জজ আদালতে ১৪টি, এক নম্বর বিশেষ জজ আদালতে ১১টি, ছয় নম্বর বিশেষ জজ আদালতে ৪টি, পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে ৫টি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাগুলোর মধ্যে ছয় নাম্বার ও পাঁচ নাম্বারের সবগুলো মামলা এবং এক নাম্বার আদালতের ১টি মিলে মোট ১০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ২৪টি মামলা দুই কোর্টে এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

নিষ্পত্তি হওয়া এসব মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন ৯ জন। তারা হলেন- হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ (মৃত), তার স্ত্রী ও হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, তানভীরের ভায়রা হলমার্ক গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ, টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া, প্যারাগন গ্রুপের এমডি সাইফুল ইসলাম রাজা, সাইফুল হাসান, নকশী নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক ও আবদুল মতিন।

দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে জেসমিন ও তুষার কারাগারে আছেন। তসলিম হাসানসহ সিন্ডিকেটের বাকি হোতারা এখনো পলাতক রয়েছেন। যুগ পেরোলেও গ্রেপ্তার করা হয়নি তাদের। আরও জানা যায়, মোট ৩৪টি মামলার মধ্যে শুধু হলমার্কের গ্রুপের মামলা ১১টি। এর মধ্যে মাত্র একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, সেখানে এই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বাকি ১০টি মামলা ঢাকা বিশেষ জজ আদালত-১ এ বিচারাধীন। অন্যদিকে হলমার্ক গ্রুপের সঙ্গে জড়িত তসলিম হাসানের টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিট লিমিটেডসহ তার গ্রুপের বাকি প্রতিষ্ঠানের ১৪টি মামলা ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-২-এ বিচারাধীন রয়েছে।

এই আদালতের পেশকার মো. দেওয়ান আশিক কালবেলাকে বলেন, আমাদের কোর্টে হলমার্ক গ্রুপের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকে যুক্ত আসামিদের ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সব মামলার আসামি তসলিম হাসান ও ব্যাংকের একই কর্মকর্তারা। তসলিম হাসান শুরু থেকেই পলাতক আছেন। সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখা থেকে ঋণ জালয়াতির অভিযোগে এসব মামলা করা হয়েছে। সব মামলাই সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।’

মামলার উদাহরণ-১: হলমার্ক গ্রুপের সঙ্গে জড়িত থেকে দুর্নীতি করা সহযোগী প্রতিষ্ঠান তসলিম হাসানের টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিট লিমিটেড ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি থেকে একই বছরের ৫ এপ্রিলের মধ্যে ৪ কোটি ৫৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩১১ টাকা মূল্যের ১১টি ক্যাশ এলসির মাধ্যমে গার্মেন্টস যন্ত্রপাতি আমদানি করে; কিন্তু এর মূল্য পরিশোধ না করা সত্ত্বেও সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখা থেকে ‘নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট ডেবিট’ করে এর মূল্য পরিশোধ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী আমদানিকৃত মালপত্রের মূল্য ব্যাংক কর্তৃক পরিশোধ করা হলে পিএডি (পেমেন্ট অ্যাগেইনস্ট ডকুমেন্টস) সমন্বয় করতে হয়। আর পিএডি সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত মালপত্র ব্যাংকের কাস্টডিতে রাখতে হয়। কিন্তু এগুলো কিছুই করা হয়নি। সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিট লিমিটেড ভুয়া বিল ভাউচার তৈরির মাধ্যমে ও মিথ্যার আশ্রয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবানের অসৎ উদ্দেশ্যে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন। এ অভিযোগে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠান ও সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা মিলে মোট ১৮ জনকে আসামি করে রমনা মডেল থানায় দুদকের উপপরিচালক এস এম এম আখতার হামিদ ভূঁঞা বাদী হয়ে মামলা করেন।

পরে মামলাটি তদন্ত করে ২০১৪ সালের ৩০ জুন দুদকের উপপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী ১০ আসামির বিরুদ্ধে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৯ টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে দুদক আইনের ৫(২) ধারা ও দণ্ডবিধির ৪০৬/৪০৯/৪২০/১০৯ ধারার অপরাধ উল্লেখ করেন। সাক্ষী করা হয় ৬২ জনকে। আদালতের নথিতে দেখা যায়, গত ৮ অক্টোবর মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। সাইফুল ইসলাম নামে ২৭ নম্বর সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। আগামী ১০ নভেম্বর পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।

আসামিদের মধ্যে টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিট লিমিটেডের পরিচালক মো. তসলিম হাসান, সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ুন কবির ও জিএম ননী গোপাল নাথ পলাতক রয়েছেন। আর সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর মহিদুর রহমান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মাইনুল হক, উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) সফিজউদ্দিন এবং এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান কারাগারে রয়েছেন। চার্জশিটভুক্ত বাকি তিন আসামি মারা যাওয়ায় মামলা থেকে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

মামলার উদাহরণ-২: সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে শেরাটন শাখা থেকে তসলিম হাসানের ড্রেসমি ফ্যাশন লিমিটেড এক্সপোর্ট এলসি ছাড়া শুধু ১৯টি এফবিপি নম্বর ব্যবহার করে ১০ কোটি ৬৮ লাখ ৬৩ হাজার ৫৭২ হাজার টাকা তুলে নেয়। এ অভিযোগে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি অন্য মামলার মতো একই ব্যক্তিদের নামে দুদক ও মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেন দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মুজিবুর রহমান। আগামী ২২ অক্টোবর মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। এ মামলায় ৬২ সাক্ষীর মধ্যে ৪০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। ঠিক একইভাবে এই দুই মামলার মতো বাকি ১২টি মামলাতেও প্রধান আসামি তসলিম হাসান।

দুদক এসব মামলার চার্জশিটে উল্লেখ করেন, তদন্তকালে ব্যাংকের নিয়োজিত অডিট ফার্মের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হলমার্ক গ্রুপ, টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিট লিমিটেড ও এর সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়। অডিট করতে গেলে আসামি ডিএডি মাইনুল হক ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি টিমকে শাখায় যেতে না দিয়ে রাস্তা থেকে ফেরত আনেন। অডিট ফার্ম পরবর্তী সময়ে তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেন যে, যদি শেরাটন শাখায় ওই সময়ে অডিট করা হতো, তাহলে ওই সময়ের পর ছাড়কৃত ১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা লোপাট করার সুযোগ সৃষ্টি হতো না।

এ ছাড়া প্রতিবেদনে হলমার্ক গ্রুপের কর্মকর্তা ও মালিকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, হলমার্ক গ্রুপের ম্যাক্স স্পিনিং মিলস, আনোয়ারা স্পিনিং মিলস, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনাল, অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজ ও স্টার স্পিনিং মিলসের মালিকরা সবাই ভুয়া। এই কথিত মালিকরা সবাই হলমার্কের কর্মচারী। কাগজ-কলমে ছাড়া ম্যাক্স ও আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। এ ছাড়া তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেছেন।

যা বলছে দুদক-প্রসিকিউশন: হলমার্ক কেলেঙ্কারির ১০টিরও বেশি দুর্নীতি মামলা দুদকের পক্ষ থেকে পরিচালনা করছেন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শামসুদ্দিন মো. আবুল কালাম। ১৪ বছরেও এসব মামলার বিচার শেষ না হওয়ার বিষয়ে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘‘বিভিন্ন কারণে বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লেগে গেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন কোর্টে এসব আসামির মামলা রয়েছে। আসামিপক্ষ থেকে শুনানির লম্বা তারিখ চাওয়া হয়। কখনো আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যান। আবার অনেক মামলায় আসামিদের পক্ষে আইনজীবী থাকে না। আসামিরা নিজেই সাক্ষীর জেরা করেন। এতে তারা প্রফেশনাল আইনজীবী না বলে ‘আনপ্রফেশনাল প্রশ্ন’ করে আদালতের সময় নষ্ট করেন।’’

উদাহরণ টেনে রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, ‘টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের দুর্নীতির মামলায় চারজন কারাগারে। তাদের পক্ষে আগে আইনজীবী থাকলেও বর্তমানে নেই। আসামিরা নিজেরা জেরা করেন। আবার ঠিকই উচ্চ আদালতে যেতে হলে আইনজীবী দিয়ে নকল তুলে আবেদন করেন। এতে করে তাদের কারণে মামলার বিচার শেষ করতে সময় লেগে যাচ্ছে।’ দুদক পিপি আরও বলেন, “হলমার্কের কেলেঙ্কারি দেশের একটি ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারি। হলমার্ক গ্রুপের সঙ্গে ‘টি অ্যান্ড ব্রাদার্স’-এর পরিচালক তসলিম হাসান মিলে একটা সিন্ডিকেট এ আর্থিক কেলেঙ্কারি করে গেছে। এই কেলেঙ্কারির ঘটনায় বিভিন্ন আদালতে ৩৪টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। হলমার্ক গ্রুপের বিচার হলেও সহযোগী তসলিমদের বিচার শেষ করা যায়নি। পূর্বে এসব মামলার ধীরগতিতে এগিয়েছে। আমরা ৫ আগস্টের পর দুদক প্রসিকিউশনে নিয়োজিত হওয়ার পর দ্রুত সাক্ষী হাজির করে বিচার শেষ করতে কাজ করছি। আমরাও চাই দ্রুত দেশের এতবড় আর্থিক কেলেঙ্কারির বিচার শেষ হোক।'

১০ বছর সাজা, জেলে ১৪ বছর এদিকে হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে নিষ্পত্তিকৃত ১০ মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যাংক কর্মকর্তাদের একটি মামলায় সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর হয়েছে। কিন্তু ১৪ বছর ধরে জেলে রয়েছেন সোনালী ব্যাংকের সাবেক ৪ কর্মকর্তা। তারা হলেন—উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মাইনুল হক, উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) সফিজউদ্দিন এবং এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান। কারাগারে থাকা আসামি মাইনুল হক ও সফিজউদ্দিনের পক্ষের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১০টি মামলায় সাজা হয়েছে। যে মামলাগুলোয় হলমার্ক গ্রুপের আসামিদের যাবজ্জীবন হলেও ব্যাংক কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে ১০ বছর। একটি মামলায় ১০ বছর আর বাকি মামলায় ৭ বা ৫ বছর করে সাজা হয়েছে। কিন্তু চারজন ব্যাংক কর্মকর্তা জেলে আছেন ১৪ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। বাকি মামলাগুলোর অপরাধের ধরনও একই। ১০ বছরের বেশি সাজা হবে না।’ এ আইনজীবী বলেন, ‘আসামিরা তো ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। সবারই ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু ন্যায়বিচার আসলে সম্ভবই নয়। দুজন কারাগারে মারা গেছে। আর বাকিরা বিচার দেখে যেতে পারবেন কি না, সেটাই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।'

বিচার শেষ না হওয়ার বিষয়ে রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘দুদক কোনোদিন চায় না দ্রুত এসব মামলার বিচার হোক। কারণ যত তারিখ পড়বে তত দুদকের প্রসিকিউশনের আইনজীবীদের লাভ। তত টাকা পাবে। আপনাকে দেখাতে পারব, কোনো মামলায় আজ পর্যন্ত ১৪০ প্লাস তারিখ (সাক্ষ্যগ্রহণের) তারিখ পড়েছে। তার মধ্যে কি ৪০ জন সাক্ষী আনা সম্ভব ছিল না? ২০১২ সালে মামলা শুরু হয়ে ২০১৬ সালে চার্জশিট হয়েছে। ২০১৬ সালের পর থেকে ১১ বছরে তারা ৫০ জন সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। তার মানে তাদের (দুদক প্রসিকিউশন) তরফ থেকে গাফিলতি আছে।

মামলা পেছানো ও আসামিদের নিজ থেকে জেরার বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, বিশেষ জজ আদালতগুলো গঠনের পর তিন সপ্তাহ পরপর তারিখ দেয়। আর আর্থিক কারণে আসামিরা আইনজীবী না দিয়ে নিজেরা জেরা করেন। একজন ব্যাংকারের পক্ষে তো তার সংসারই চলে না। তারা আবার মামলা চালাবে কীভাবে? অনেকের বিরুদ্ধে ২৭টি, অনেকের ৩০টি, আবার অনেকে ৩৪টি মামলারই আসামি। সবার পক্ষে এখন আর আইনজীবীর ফি দেওয়া সম্ভব নয়। আসামিরাও চান দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হোক।’

সাজার চেয়ে জেল খাটার বিষয়ে সাবেক জেলা জজ ও বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব শাহজাহান সাজু কালবেলাকে বলেন, ‘যতবড় খারাপ আসামিই হোক দ্রুততম ও যুক্তিসংগত সময়ে বিচার না করতে পারা তার জন্য মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন। ১৪ বছর ধরে বিনা বিচারে এত লম্বা সময় জেলখানায় থাকবে, তার যৌক্তিকতা নেই। যে মামলাগুলোয় রায়ে ১০ বছর সাজা হয়েছে, সেসব মামলা থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(এ) ধারা অনুযায়ী ওই মামলাগুলোতে তারা এরই মধ্যে রিলিজ হয়ে গেছেন। অন্য মামলায় বিচারাধীন থাকায় হয়তো কারাগারে রাখা হয়েছে। তবে বাকি মামলাগুলোর অপরাধ বা ধরন একই হলে আসামি জামিন পাওয়ার হকদার। কারণ একই অপরাধে ভিন্ন সাজা তথা ১০ বছরের চেয়ে বেশি হবে না।’

ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারির বিচারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আসামিদের গ্রেপ্তার করার কাজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। পলাতক থাকলেই সাজা বসে থাকবে এমন নয়। আর বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে সাজার পাশাপাশি আর্থিক জরিমানাও করা যায়। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হওয়া অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকে। ১৪ বছর মামলা বিচারাধীন বলে সেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ এখনো হয়নি।’