Image description
আওয়ামী সুবিধাভোগী ফখরুল এখন কমিশনের সচিব, দ্বৈত নাগরিক মাকছুদুর পরিচালক পদে বহাল

দেশের ১৭০টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেখভালকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরের সচিব পদে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ড. মো. ফখরুল ইসলাম। কমিশনের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মাকছুদুর রহমান ভূঁইয়া দ্বৈত নাগরিক হয়েও রয়েছেন বহাল।

এরই মধ্যে সচিব ফখরুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষার্থীরা। ফলে তাঁদের দুজনকে নিয়ে চরম অস্বস্তিতে রয়েছেন ইউজিসির নতুন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা।

সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১১ আগস্ট আন্দোলনের মুখে সরে যেতে বাধ্য হন ইউজিসির সাবেক সচিব ফেরদৌস জামান। আওয়ামী সরকারের গঠিত কমিশন যেহেতু তখনো বলবৎ ছিল, তাই তারা তাদের ঘরানার হিসেবে ফখরুল ইসলামকেই সচিব পদে বেছে নেয়। সে সময় জ্যেষ্ঠতাও মানা হয়নি। এরপর গত ৫ সেপ্টেম্বর নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলেও ফখরুল ইসলামকে সরানো হয়নি।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ কালের কণ্ঠকে বলেন, আমাদের কমিশন মনে করে, সচিবের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, এ ব্যাপারটি পরিষ্কার করার দায়িত্ব তাঁরই।

কমিশন সূত্র জানায়, ফখরুল ইসলাম ২০০৫ সালের ৩ জানুয়ারি সহকারী পরিচালক হিসেবে ইউজিসিতে যোগ দেন। এরপর ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল উপসচিব, ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর অতিরিক্ত পরিচালক এবং ২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। সর্বশেষ গত ১১ আগস্ট ইউজিসির সচিব পদে পদায়ন পান তিনি।

ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, কমিশনে পদোন্নতি পেতে চার বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কিন্তু ফখরুল ইসলামকে অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালক হতে একবারও চার বছর পূর্ণ করতে হয়নি। এমনকি তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি দেখিয়ে দুইবার সুবিধা নিয়েছেন, যা সুস্পষ্টভাবে বিধি লঙ্ঘন।

সূত্র জানায়, ফখরুল ইসলাম ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সাবেক সদস্য ড. মো. সাজ্জাদ হোসেনের ফেসবুক পোস্টের কমেন্টসে লিখেছেন, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।

বঙ্গবন্ধুর বাংলায় রাজাকারের ঠাঁই নাই। তিনি ২০১৯ সালের ১৭ জুন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ আলমগীরের সঙ্গে ধানমণ্ডি-৩২-এ শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শেখ হাসিনার গুণকীর্তন করে একাধিক দৈনিকে নিবন্ধও লিখেছেন। এমনকি বিভিন্ন প্রোগ্রামে বক্তৃতা শেষে তিনি জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলতেন, যার ভিডিও রয়েছে।

অন্যদিকে মাকছুদুর রহমান ভূঁইয়া ২০২২ সালের ১ মার্চ পরিচালক হিসেবে ইউজিসিতে নিয়মিত হন। অথচ তিনি দ্বৈত নাগরিক। তাঁর অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট নম্বর পিবি-৪১৫৪৭৫৯। তিনি আওয়ামীপন্থী শিক্ষক নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির একাধিকবারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়ার ভাই।

ইউজিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মাকছুদুর রহমান ভূঁইয়া এত দিন তাঁর ভাইয়ের জোরে চলতেন। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে সাহস পেত না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তিনি বহাল তবিয়তে আছেন।

মাকছুদুর রহমান ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১০-এর আগে আমি ও আমার পরিবার অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব নিয়েছি। আমি এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে ডিক্লারেশনও দিয়েছি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব যাঁদের আছে, তাঁদের সরকারি চাকরির সুযোগ নেই। কারণ সরকারি চাকরি যাঁরা করেন, তাঁরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাঁদের কাছে রাষ্ট্রের অনেক গোপনীয় বিষয় থাকে। দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সরকারি চাকরি করা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইউজিসির সচিবের প্রভাব অনেক বেশি। যেকোনো ফাইল তাঁর হাত ধরেই যায়। মূলত তাঁর কথার ওপরই ফাইল অনুমোদিত হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফখরুল ইসলাম এখন ছড়ি ঘোরাচ্ছেন জুলাই আন্দোলনের পক্ষের কর্মকর্তাদের ওপর। এরই মধ্যে বিএনপি-জামায়াত ঘরানার অনেক কর্মকর্তাকেই তিনি কম গুরুত্বের বিভাগগুলোতে পদায়ন করেছেন, যা নিয়ে কমিশনে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন দপ্তরে আওয়ামী সুবিধাভোগী সচিব ও আমলাদের অপসারণের দাবিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষার্থীরা গত সোমবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ করেছেন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় সংস্কারকাজ নস্যাৎ এবং শেখ হাসিনার এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তারা অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে। এর ফলে সচিবকে নিয়ে ইউজিসিতে অস্বস্তি আরো বেড়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে ইউজিসি সচিব ড. ফখরুল ইসলামকে একাধিকবার কল করলেও তিনি তা ধরেননি।