Image description

জাল রায় তৈরি করে তা সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ে দাখিল, ভুয়া সমন তৈরি এবং মামলার নথি গায়েবসহ গুরুতর পাঁচ অপরাধের প্রমাণ মিলেছে লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এমনকি নিজের বার্ষিক প্রতিবেদনে ভালো ফল আদায় করতে জেলা জজকে চাপ প্রয়োগের মতো অভিযোগের ও প্রমাণ পেয়েছে কমিটি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে গত ১৫ অক্টোবর এই বিচারককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে আইন মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে বিভাগীয় মামলা। বিভাগীয় মামলার তদন্ত চলাকালে বরখাস্তকৃত এই কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখার আদেশ জারি করা হয়েছে।

এদিকে গাজীপুরের একটি মার্কেট দখল নিতে বিচারক আরিফুলের ক্ষমতায় ‘অবিচারের’ শিকার হয়ে ১৮ মামলার ঘানি টানছেন নিজ চাচা শ্বশুরসহ অন্তত ১৫০ ব্যবসায়ী। এর মধ্যে চাচা শ্বশুরের নামেই ১০টি। ভাইয়ের মেয়ে জামাইয়ের ক্ষমতায় করা মামলায় ২৩ মাস জেলও খাটতে হয়েছে তাকে। বিষয়টি নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার তদন্তকালে গুরুতর এই অভিযোগটিও আমলে নেওয়ার দাবি উঠেছে।

জানা গেছে, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ আদালতের সিনিয়র সহকারী জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিচারক আরিফুল ইসলাম সেখানকার জেলা জজ ও দায়রা জজ মো. সোলায়মানের সঙ্গে কথোপকথন রেকর্ড করে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এরপর বিচারক আরিফুল পদোন্নতি পেয়ে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে প্রথমে ঢাকায় এবং পরে লালমনিরহাটে যোগদান করেন। এরই মধ্যে শরীয়তপুরের জেলা ও দায়রা জজ মো. সোলায়মান আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে শুরু হয় অনুসন্ধান কার্যক্রম। অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয় বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ইসমাইল হোসেনকে। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ৫৭ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে বিচারক আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত বলে তথ্য এসেছে।

প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ও অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে সত্য মর্মে প্রমাণিত অভিযোগসমূহ বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা, ২০১৭ এর বিধি ২(ক) অনুযায়ী ‘অদক্ষতা’ এবং বিধি ২(চ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর সংজ্ঞাভুক্ত মর্মে প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া, ভেদরগঞ্জ সিভিল জজ আদালতের সাবেক দেওয়ানি ১৬৭/২০২১ নং মামলাটি বর্তমানে বদলি সূত্রে নড়িয়া সিভিল জজ আদালতের দেওয়ানি ২৯৬/২০২৪ নং মামলা হিসেবে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা ওই মামলায় তার প্রচারিত মর্মে দাবি করে একটি মিথ্যা ও জাল রায় সৃজন করে তা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে, আইন ও বিচার বিভাগে এবং এই অনুসন্ধান কার্যক্রমে দাখিল করেছেন, যা পেনাল কোড, ১৮৬০ এর ৪৬৬ ও ৪৭১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ মর্মে গণ্য হতে পারে।’ বিচারক আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নানা অভিযোগ নিয়ে ৫৭ পৃষ্ঠার অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বিস্তারিত উঠে এসেছে। এতে আদালতের মূল নথি, আদেশ, দিনলিপি, দৈনিক কার্যতালিকা, প্রসেস ইস্যু রেজিস্ট্রার ও নথি গ্রহণের স্বীকৃতিপত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিচারক, আদালতকর্মী ও আইনজীবীদের সাক্ষ্যও বিশ্লেষণে এসেছে। প্রতিবেদনে মোট ৫টি অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে বলে তথ্য এসেছে।

‘মিথ্যা সমন তৈরি’ প্রতিবেদনের প্রথম অভিযোগটি টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জিআর মামলা নম্বর ১২৪/২০২১-কে ঘিরে। ওই মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার কথা বলে আরিফুল ইসলাম ২০২৪ সালের ১৬ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কর্মস্থলের বাইরে থাকার অনুমতি চেয়েছিলেন। তার আবেদনের ভিত্তি ছিল একটি আদালতি সমন। সেখানে ১৮ সেপ্টেম্বর তাকে সাক্ষী হিসেবে হাজির হওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। অনুসন্ধানে ওই সমনের সঙ্গে মামলার মূল নথির তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ছিল না। ওই দিন চার্জ শুনানির দিন নির্ধারিত ছিল। একজন আইনজীবীর মৃত্যুর কারণে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সেদিন চার্জ শুনানি হয়নি। এ ছাড়া ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে আরিফুল ইসলামের নামে সমন জারির কোনো আদেশ পাওয়া যায়নি।

প্রসেস ইস্যু রেজিস্টারেও সমনটির স্মারক নম্বর ও তারিখের সমর্থনে তথ্য মেলেনি। সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারে ওই নম্বরটি আগের এক তারিখে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। সমনটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে আদালতের দুই কর্মচারী তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। তৎকালীন বেঞ্চ সহকারী মহির উদ্দিন অনুসন্ধান কর্মকর্তার কাছে স্বীকার করেন, সমনে সাক্ষী হিসেবে আরিফুল ইসলামের নাম, ঠিকানা ও মামলার নম্বর তিনি লিখেছিলেন। তার দাবি, তৎকালীন অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুল মোহসীনের নির্দেশে তিনি সমনটি তৈরি করেছিলেন। অন্যদিকে তৎকালীন অফিস সহায়ক মো. শাহাদাত হোসেন জানান, সমনের স্মারক নম্বর ও তারিখ তিনি লিখেছিলেন। তবে সমনটি না দেখেই ওই তথ্য লিখেছিলেন বলে তিনি জানান। সমনে বিচারক হিসেবে যে স্বাক্ষর ছিল, সেটি নিজের বলে স্বীকার করেন মো. মাহমুদুল মোহসীন। 

তবে তিনি বলেন, আরিফুল ইসলামের নামে সমন জারির নির্দেশ তিনি দেননি। তার অজ্ঞাতসারে স্বাক্ষর নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। শরীয়তপুরের জেলা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হায়াতুল হক জানান, সমনটি যাচাই করে টাঙ্গাইলের আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সেখানে আরিফুল ইসলাম ওই মামলার সাক্ষী নন বলে জানা যায়। এরপর তাকে কর্মস্থলে ফিরে আসতে বলা হয়। আরিফুল ইসলাম ১৭ সেপ্টেম্বর কর্মস্থলে ফিরে যোগদানের আবেদন করেন। নথি ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত দেন, সমনটি ভুলক্রমে তৈরি হয়নি। বরং ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা মিথ্যা সমন ব্যবহার করে কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি নেওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা রয়েছে। সমন তৈরির সঙ্গে জড়িত দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে জাল দলিল তৈরি করে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটনের দায়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

‘নথি আটকে রাখা’ দ্বিতীয় অভিযোগটি চারটি দেওয়ানি মামলার নথি নিয়ে। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরিফুল ইসলাম রায় লেখার জন্য বেঞ্চ সহকারীর কাছ থেকে মামলাগুলোর নথি নিজের জিম্মায় নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তার স্বাক্ষরযুক্ত একটি লিখিত স্বীকৃতিপত্র পাওয়া যায়। বেঞ্চ সহকারী মো. হাবিবুর রহমান অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে জানান, নথিগুলো নেওয়ার সময় আরিফুল ইসলাম লিখিতভাবে সেগুলো নিজের জিম্মায় থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। অনুসন্ধানকালে আরিফুল ইসলামও স্বীকৃতিপত্রের লেখা ও স্বাক্ষর নিজের বলে মেনে নেন। আদালতের অন্যান্য কর্মচারীও নথিগুলো ফেরত না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। সেরেস্তাদার কাজী হাবিবুল্লাহ এবং হিসাবরক্ষক কাম সেরেস্তা সহকারী সনিয়া আক্তার অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে জানান, নথিগুলো দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছিল না। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর রায়ের সার্টিফায়েড কপি চেয়ে আবেদন জমা পড়লে নথি না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। অফিস সহায়ক জিয়াউর রহমান জুয়েল বলেন, তার সামনে আরিফুল ইসলাম নথিগুলো নিজের জিম্মায় থাকার কথা লিখিতভাবে স্বীকার করেছিলেন। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত বিচারক বেগম নাঈমা হক অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে জানান, নথিগুলো ফেরত না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে জেলা জজকে জানানো হয়েছিল।

মামলাগুলোর আইনজীবীরাও সাক্ষ্য দিয়ে জানান, তারা রায়ের সার্টিফায়েড কপি পাননি। নথি না পাওয়ার কারণে রায়ের কপি সংগ্রহের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনে আরিফুল ইসলাম অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে বলেন, তিনি নথিগুলো রায়সহ ফেরত দিয়েছিলেন। এর পক্ষে তিনি রায়ের কপি দাখিল করেন। তবে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মনে করেন, রায়ের কপি দাখিল করলেই মূল নথি ফেরত দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয় না। স্বাক্ষরযুক্ত স্বীকৃতিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের বিপরীতে নথি ফেরতের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে মামলাগুলোর নিষ্পত্তির তারিখের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা বলেছেন, আরিফুল ইসলামের নিজের স্বীকৃতি অনুযায়ী নথিগুলো তার জিম্মায় ছিল। ফলে আগের দুটি মামলার রায় লেখা ও নথি ফেরতের সময়কাল নিয়ে অসংগতি রয়েছে।

‘রায় নিয়ে অসংগতি’ অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তৃতীয় অভিযোগটি ভেদরগঞ্জ সিভিল জজ আদালতের দেওয়ানি মামলা নম্বর ১৬৭/২০২১ নিয়ে। বিচারক আরিফুল ইসলামের দাবি ছিল, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি মামলাটির রায় প্রকাশ্য আদালতে ঘোষণা করেছিলেন এবং মামলাটি খারিজ করেছিলেন। পরে জেলা জজ মো. সোলায়মান নথি তলব করে রায়ের কপি ছিঁড়ে ফেলেন। কিন্তু অনুসন্ধানে মামলার আদেশ, দিনলিপি ও দৈনিক কার্যতালিকার মধ্যে গুরুতর অসংগতি পাওয়া যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখের আদেশে মামলাটি ২৪ সেপ্টেম্বর রায় প্রচারের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ১৮ সেপ্টেম্বর বাদীপক্ষ মামলার আরজি সংশোধন, একজন সাক্ষীকে ফের তলব এবং মামলাটি রায়ের পর্যায় থেকে প্রত্যাহারের আবেদন করে। আদালত ৩৪ নম্বর আদেশে আবেদনগুলো মঞ্জুর করেন। মামলাটি রায়ের তালিকা থেকে প্রত্যাহার করে ফের সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নির্ধারণ করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর সাক্ষীর ফের জবানবন্দি নেওয়া হয়। ফলে ওইদিন মামলাটি রায়ের জন্য নির্ধারিত ছিল না। তবু দিনলিপি ও দৈনিক কার্যতালিকায় দুই পক্ষের উপস্থিতিতে খারিজ হয়েছে বলে লেখা ছিল। মূল নথিতে ২৪ সেপ্টেম্বরের কোনো রায়ের আদেশ পাওয়া যায়নি।

এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর জেলা জজ আদালতের বদলি মিস মামলা ৮৯/২০২৪-এর আদেশে দেওয়ানি ১৬৭/২০২১ মামলাটি নড়িয়া সিভিল জজ আদালতে পাঠানো হয়। সেখানে মামলাটি ২৯৬/২০২৪ নম্বর পায়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নথি গ্রহণ ও স্থানান্তরের রেজিস্টার অনুযায়ী ২৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে জেলা জজ আদালতে নথি গ্রহণ করা হয়। পরে নড়িয়া আদালতে পাঠানো নথিতে কোনো রায় পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট বিচারক সাক্ষ্য দেন। বাদী ও বিবাদীপক্ষের আইনজীবীদের কেউ অনুসন্ধানে বলেননি যে, ২৪ সেপ্টেম্বর তাদের উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। আরিফুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি সেদিন রায় ঘোষণা করে নথি বেঞ্চ সহকারীর কাছে দিয়েছিলেন। তবে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা বলেন, তার এই বক্তব্যের পক্ষে দিনলিপি ও দৈনিক কার্যতালিকার কপি এবং দাখিল করা কথিত রায়ের কপি ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য সমর্থন পাওয়া যায়নি। রায় না দিয়েও দিনলিপি ও দৈনিক কার্যতালিকায় মামলাটি খারিজের তথ্য লেখা এবং পরে রায় দাখিলের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। এ ধরনের কাজ দণ্ডবিধির ৪৬৬ ও ৪৭১ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা (বিচারক আরিফুল) আরও দাবি করেছেন যে, অভিযোগকারী তার দেওয়া ওই রায়টি নথি থেকে ছিঁড়ে ফেলেছেন, যা অনুসন্ধানে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

‘কথোপকথন রেকর্ড’ চতুর্থ অভিযোগটি ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবরের একটি কথোপকথন নিয়ে। সেদিন বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন বা এসিআর নিয়ে কথা বলতে জেলা জজ মো. সোলায়মানের খাস কামরায় গিয়েছিলেন আরিফুল ইসলাম। কথোপকথনের একপর্যায়ে দেওয়ানি ১৬৭/২০২১ মামলার রায় ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ তোলেন তিনি। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে জেলা জজের বক্তব্যের পাশাপাশি আরিফুল ইসলামের নিজের বক্তব্যের অসংগতিও তুলে ধরা হয়েছে। আরিফুল ইসলাম অনুসন্ধানে দাবি করেন, কথোপকথনটি কে রেকর্ড করেছিলেন, তা তিনি জানেন না। ১৭ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে কেউ একটি পেনড্রাইভে রেকর্ডিংটি পাঠিয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো একটি অভিযোগে আরিফুল ইসলাম নিজেই উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি নিজের মোবাইল ফোনে কথোপকথনটি রেকর্ড করেছিলেন এবং পেনড্রাইভে সেটি সংযুক্ত করেছিলেন। এ বক্তব্যের সঙ্গে অনুসন্ধানে দেওয়া তার ব্যাখ্যার মিল ছিল না। সাক্ষীদের বক্তব্যেও ওইদিনের কথোপকথনের সময় আরিফুল ইসলামের মোবাইল ফোন টেবিলে থাকার তথ্য উঠে আসে। এসব তথ্য বিবেচনায় অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত দেন, জেলা জজের অজান্তে কথোপকথন রেকর্ড করার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। রেকর্ডিং কীভাবে তার কাছে এসেছে, সে বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে দেওয়া বক্তব্যও অসংগতিপূর্ণ।

রেকর্ডিং ও সংবাদ প্রচার পঞ্চম অভিযোগটি ওই রেকর্ডিং ও পরবর্তী সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর কালবেলা পত্রিকায় ‘মাথা গরম জেলা জজ/রায়ের কপি ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। একই দিন ইউটিউব ও ফেসবুক চ্যানেলেও এ বিষয়ে ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। আরেকটি দৈনিকে ৩০ অক্টোবর, ১ নভেম্বর ও ৫ নভেম্বর জেলা জজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আরিফুল ইসলাম অনুসন্ধানে বলেন, এসব সংবাদ সম্পর্কে তিনি জানতেন না এবং সংবাদমাধ্যমগুলো তার বক্তব্য নেয়নি। তবে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা তার এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ অক্টোবরের কথোপকথনের পর রেকর্ডিংয়ের সূত্রে জেলা জজের বিরুদ্ধে রায় ছিঁড়ে ফেলা, নথি তলব ও অনিয়মের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মনে করেন, জেলা জজের বিরুদ্ধে রায় ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং মূল নথি ও মামলার কার্যক্রম বিশ্লেষণে ওই অভিযোগ সমর্থিত হয়নি। রেকর্ডিং ব্যবহার করে জেলা জজের বিরুদ্ধে প্রমাণহীন অভিযোগ প্রচারের বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছেন তিনি।

‘গাজীপুরে মার্কেট দখল নিতে মামলাবাজি’ এদিকে বিচারিক অনুসন্ধানের বাইরে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই বিচারকের বিরুদ্ধে। একাধিক গণমাধ্যমে গাজীপুরের একটি মার্কেট দখল নিতে তার আপন চাচা শ্বশুরসহ অন্তত ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলাবাজি চালিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের সন্তান আরিফুল বিয়ে করেছেন গাজীপুরে। জেলার চান্দনায় চাচা শ্বশুরের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। সেই সম্পত্তির ওপর নির্মিত মার্কেট দখলে নিতে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে গাজীপুর, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও যশোরে অন্তত ১৮টি মামলা করিয়েছেন। মামলার মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, মানব পাচার, গণধর্ষণ, ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ। আরিফুল ইসলামের চাচা শ্বশুর মার্কেট মালিক তৌহিদুল ইসলাম মজিবর ও মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এসব অভিযোগ করেছেন।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় বাসন ভূমি অফিস-সংলগ্ন হাজি হোসেন পাইকারি মার্কেটের মালিক তৌহিদুল ইসলাম মজিবর। আউটপাড়া মৌজায় পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিতে মার্কেট ও বাড়ি নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি। মার্কেটটিতে দেড় শতাধিক কাপড় ব্যবসায়ী দোকান নিয়ে ব্যবসা করছেন। ২০০০ সালে মজিবরের বাবা জমি ভাগ করে দুটি পৃথক দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন।

২২৫৭৯ নম্বর দলিলটি মজিবর ও তার পাঁচ বোনের নামে এবং ২২৫৮০ নম্বর দলিলটি রেজিস্ট্রি হয় তার বড় ভাই আবু সাঈদের নামে। নিজের অংশের জমিতে মজিবর প্রায় ১৫০টি দোকান নিয়ে মার্কেট গড়ে তোলেন। বড় ভাইও তার অংশে আলাদা মার্কেট গড়ে তোলেন। পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে বড় ভাই বৃদ্ধ বাবাকে ঘর থেকে বের করে দিলে মজিবর ও তার স্ত্রী বাবার দেখভালের দায়িত্ব নেন। মজিবরের অভিযোগ, ২০১১ সালে তার বাবার মৃত্যুর পর থেকে বড় ভাই মার্কেট দখলের পাঁয়তারা শুরু করেন। এই বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ হয় যখন বড় ভাই তার মেয়েকে বিয়ে দেন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। 

ক্ষমতার এই নতুন জোর পেয়ে বড় ভাই মার্কেট দখলের লড়াইয়ে যুক্ত করেন ম্যাজিস্ট্রেট জামাতাকে। এরপর আরিফুল ইসলাম তার পদ ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে মজিবরকে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করতে থাকেন। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এসব মামলার কারণে মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ী কারাগারে গেছেন। এ ছাড়া তাদের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এসব ঘটনায় ব্যবসায়ীরা সুবিচার চেয়ে আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রধান বিচারপতিসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন। 

এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত বিচারক আরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এটা পারিবারিক ব্যাপার, কোর্টে মামলা চলছে। এখানে বিচারকের হাত দেওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। কোর্টে যা ফয়সালা হবে, মামলা অনুযায়ী সেভাবে পরে সিদ্ধান্ত হবে।’ আরিফুল ইসলাম সোহেলের স্ত্রী মোশাররেফা মোহাম্মদ (রীম) গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘ওয়ারিশসূত্রে জমির মালিক আমি। মার্কেটের মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান।’ তিনি বলেন, ‘কিছু জায়গায় আমার সৎ চাচা আমাদের অংশ বুঝিয়ে না দিয়ে বেদখল করে আছেন। কিছু দোকানদার, মাস্তান ধরে এসব অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন। আমাদের হক বুঝিয়ে দিচ্ছেন না।’