Image description

সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম রুট বন্ধের পর অন্য গন্তব্যে ফ্লাইট চালু হলেও বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর টিকিটের দাম অনেক বেড়ে গেছে। চাকরিতে যোগদানের বাধ্যবাধকতা ও ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে টিকিট কিনছেন।

সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুথিদের হামলা শুরুর আগে ঢাকা-সৌদি আরবের রুটগুলোতে ওয়ানওয়ে টিকিটের দাম এর আগে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা ছিল, এখন ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো।

ঢাকা থেকে ইউরোপ-আমেরিকা বা অন্য রুটের তুলনায় সৌদি রুটে ভাড়া এমনিতেই বেশি। তার ওপর এখন আরও বেশি আদায় প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সোমবার পর্যন্ত ঢাকা থেকে ১২৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। আর এতে আটকে পড়েছেন ১৯ হাজার ৩৭৭ জন যাত্রী। তাদের একটি বড় অংশই বাড়তি দর দিয়ে হলেও বিকল্প রুটের টিকিট কাটার চেষ্টা করছেন, আর এর সুযোগ নিচ্ছে এজেন্সিগুলো।

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমান বাংলাদেশ আটকে পড়া যাত্রীদের কোনো ধরনের বাড়তি টাকা ছাড়া বিকল্প জেদ্দা ও মদিনা রুটে যাত্রীদের পৌঁছে দিচ্ছে। দেশীয় ক্যারিয়ার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও জেদ্দা রুটের মাধ্যমে কিছুসংখ্যক যাত্রীকে সৌদি আরব পৌঁছে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কেউই বাড়তি টাকা রাখছে না।

তবে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর এমন কোনো উদ্যোগ নেই। এমিরেটস ঢাকা থেকে ফ্লাইট চালাচ্ছে না। তারা সবাইকে টাকা রিফান্ড করে দিচ্ছে।

জসিম উদ্দিন নামের এক যাত্রীর টাইমস বাংলাদেশকে বলেন, তার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কাতার এয়ারওয়েজ তাকে টাকা দেওয়ার কথা বলেছে। পরে অন্য এয়ারলাইন্সে টিকিট কাটতে গিয়ে তিনি দেখেন ভাড়া বেশি।

কুমিল্লার লালমাই থেকে আসা আতিকুল ইসলাম ইন্ডিগোর ফ্লাইটে টিকিট কেটেছিলেন। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এখন তাকে অন্য এয়ারলাইন্সে বেশি দামে টিকিট কাটতে হচ্ছে।

একই জেলার তিতাস থেকে আসা আইনুদ্দিনের ফ্লাইটও ছিল ইন্ডিগোতে। তাদের গন্তব্য জেদ্দা হলেও ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় কিছুটা অবাক হয়েছেন।

শীর্ষস্থানীয় অনলাইন এজেন্সি গো জায়ান আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকা থেকে মদিনা রুটে সবচেয়ে ভাড়া সময়ভেদে দেখাচ্ছে ৫৮ হাজার ৯২২ থেকে ৬৪ হাজার ৫৯৫ টাকা।

 
 
 

এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ভাড়া আরও বেশি, ৬৯ হাজার ৮৮০ থেকে ৭২ হাজার ৮৪৫ টাকা। অন্যদিকে ওমান এয়ারে ভাড়া দেখাচ্ছে ৭৬ হাজার ৬৭১ টাকা।

ঢাকা থেকে জেদ্দা রুটে গো জায়ানে আগামী ১ নভেম্বরের সবচেয়ে কম ভাড়া দেখাচ্ছে ৫৪ হাজার ৯১৯ টাকা (ইন্ডিগো)। এয়ার ইন্ডিয়া ৫৮ হাজার ৭৮১ টাকা, ইজিপ্ট এয়ার ৫৯ হাজার ৮৩৭ টাকা, কাতার এয়ারওয়েজ ৬৪ হাজার ৮১৪ টাকা, গালফ এয়ার ৬৭ হাজার ০৪৮ টাকা, ওমান এয়ার ৬৯ হাজার ৯৭২ টাকা, ফ্লাই দুবাই ৭২ হাজার ২৪৮ টাকা, এমিরেটস ৭৪ হাজার ৫১ টাকা, সৌদি এরাবিয়া এয়ারে ৭৮ হাজার ৮৭১ টাকা, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স ৮৯ হাজার ২৬ টাকা, এয়ার ইন্ডিয়া ৯০ হাজার ৯০১ টাকা।

শেয়ার ট্রিপে মদিনা রুটে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সে আগামী ২৭ অক্টোবর ঢাকা থেকে সবচেয়ে কম ভাড়া দেখাচ্ছে ৮০ হাজার ১৬৫ টাকা। একই প্ল্যাটফর্মে আগামী ৩১ অক্টোবরের ফ্লাইটে এয়ার এরাবিয়া ভাড়া দেখাচ্ছে ৯৭ হাজার ৮৭৫ টাকা। একই তারিখে কাতার এয়ারওয়েজ ১ লাখ ২৭৫ টাকা ভাড়া দেখাচ্ছে। এয়ার এরাবিয়া ৯৮ হাজার ২৭৫ টাকা, ওমান এয়ার ১ লাখ ৩ হাজার ৮৮২ টাকা, এমিরেটসে ১ লাখ ৪ হাজার ৮০৭ টাকা।

অনলাইন এজেন্সি টাকা বেশি নিলেও তারা বেশি টাকা নিচ্ছেন না, এমনটাই দাবি করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সাবেক সভাপতি মনজুর মুর্শেদ। তিনি টাইমসকে বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন রুটে তারা ৫৫ হাজার টাকার বেশি রাখছেন না।

বাস্তবে অনেক বেশি টাকা রাখছে–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন একটা বিশেষ পরিস্থিতি চলছে। তাই হয়ত কেউ কেউ সামান্য বেশি টাকা রাখছে। যুদ্ধাবস্থা স্বাভাবিক হলে টিকিটের মূল্যও ঠিক হয়ে যাবে।’

সৌদি প্রবাসীরা অভিযোগ করেছেন, ট্রাভেল এজেন্সিগুলো টাকা বেশি রাখলেও অতিরিক্ত টাকার রসিদ দেয় না। আবার তারাও বিকল্প টিকিট পেয়ে গেলে তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন। কারণ সময়তো সৌদি আরব পৌঁছাতে না পারলে তার চাকরিটাই থাকবে না।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে প্রায় চার দশক মার্কেটিংয়ে কাজ করা ফারুক আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘অতীতে ইরাক-ইরান, ইরাক-কুয়েত, লিবিয়া যুদ্ধসহ যেকোনো ধরনের বিপর্যয়ে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স যাত্রীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করে গিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিমান মুনাফার কথা চিন্তা করেননি। কিন্তু বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো এই চিন্তা করে না।’

এক প্রশ্নের তিনি বলেন, ‘শুধু টাকা রিফান্ড করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বিপদে পড়া যাত্রীদের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করাটাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।’

এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো উচিত বলেও মত দেন তিনি।

৭ নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না

গত ১৩ অক্টোবর বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্সগুলোকে যে ৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছে, সেগুলোও পালন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে।

চিঠিতে যাত্রীদের পুনরায় টিকিটি বুকিং ও অর্থ ফেরতে সহায়তা ও বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা, ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব ও সময়সূচির পরিবর্তন সম্পর্কে যাত্রীদের মোবাইল ফোনে এসএমএস, ফোনকল, ই-মেইল, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানানোর কথা বলা আছে।

ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি, টিকিট বুকিং, অর্থ ফেরত ও অন্যান্য ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার নির্দেশও আছে। বিমানবন্দরে পৌঁছে যাওয়া যাত্রীদের জন্য বসার জায়গা, পানি, হালকা খাবারসহ প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতেও বলা হয়েছে।

তবে বাস্তবে যাত্রীদের কেউই কোনো ধরনের আগাম নোটিফিকেশন পান না।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রী মঈনুদ্দিন বলেন, বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আধাঘণ্টা পর এসএমএস পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে ঢোকার পর বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীদের পানি, খাবার তো দূরের কথা ভালো ব্যবহারটাও আমরা পাই না।’