Image description

পুতুল রাখাইন যখন ছোট ছিলেন, তখন সমুদ্র ছিল যেন দূরের এক রহস্য। ঢেউ ছোঁয়ার জন্য পুতুল আর তার বড় বোন লাচুকে ঘরের কাছের মাটির বাঁধ ধরে পুরো এক ঘণ্টা হেঁটে যেতে হতো।

মাটির পথটি এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছিল ঝাউবন, বুনো ঝোপঝাড় আর নারকেল গাছের বনের ভেতর দিয়ে। সেই পথটাই ছিল তাদের খেলার মাঠ—ছায়া, নোনতা বাতাস আর শৈশবের আনন্দে ভরা এক আলাদা জগৎ।

আজ পুতুলের বয়স ২৩, আর লাচুর ৩০। সেই এক ঘণ্টার পথ এখন পার হতে দশ মিনিটও লাগে না।

‘আগে সাগরে যেতে আমাদের প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটতে হতো। এখন বাঁধ থেকে যেতে মাত্র ১০ মিনিট লাগে। সাগর ক্রমাগত জমি গিলে খাচ্ছে, আমাদের ঘরের আরও কাছে চলে আসছে,’ পানির দিকে তাকিয়ে বলছিলেন পুতুল।

দুই বোন যেখানে লুকোচুরি খেলতেন, সেই নারকেল বাগানটি আজ সাগরে তলিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে পুরোনো বনটিও।

অবশিষ্ট মাটির পথ দিয়ে গ্রামের মানুষকে পারাপার করা ৩৫ বছর বয়সী ভ্যানচালক মুতালিবের মনে আছে, একসময় এই বন কতটা ঘন ছিল। তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে ক্ষুধার্ত ঢেউ এটাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। যেখানে একসময় ঘন বন দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে এখন কাদার ওপর কেবল কয়েকটি কঙ্কালসার গাছের গুঁড়ি জেগে আছে।’

পুতুলের জন্য সবচেয়ে কষ্টের বিষয় কেবল বিলীন হয়ে যাওয়া জমিটুকু নয়; কষ্টের বিষয় হলো, তার শৈশবের স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে রাখার মতো কোনো জায়গা আর নেই।

সমুদ্র যতই সামনে এগোচ্ছে, তা কেবল গাছপালা আর জমি কেড়ে নিচ্ছে না; পুতুলের শৈশবের চেনা পরিবেশ, তার খেলাধুলা, হাসি আর বেড়ে ওঠার জায়গাগুলোকে মুছে দিচ্ছে।

তিনি আশা করেন, কোনো এক দিন নিজের সন্তানদের বলবেন, ‘আমাদের নারকেল বাগানটি এখানে ছিল। এখানেই আমরা খেলাধুলা করতাম।’

কিন্তু তার ভয় হয়, ততদিনে তাদের দেখানোর মতো কিছুই আর থাকবে না। কেবল অসীম সমুদ্র দাঁড়িয়ে থাকবে—যেখানে জমা হয়ে থাকবে এক শৈশবের স্মৃতি, যা তারা আর কখনোই দেখতে পাবে না।

জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রায়ই সংখ্যা দিয়ে মাপা হয়—কতগুলো ঘরবাড়ি ধ্বংস হলো, কত ফসল নষ্ট হলো আর কত সম্পদ ভেসে গেল।

কিন্তু শৈশবের ঘর হারানোর কষ্ট, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, কিংবা একসময় মুখরিত থাকা উৎসবগুলোকে আস্তে আস্তে নিভে যেতে দেখার দুঃখ কোনো সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না।

পরিবারগুলো যখন অন্য জায়গায় চলে যায়, তখন শিশুরা তাদের মাতৃভাষা এবং ঐতিহ্যকেও ভুলে যেতে বসে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে নদী ও সমুদ্রভাঙন রাখাইন সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কেবল জমিই কেড়ে নিচ্ছে না; এটি ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছে তাদের স্মৃতি, সংস্কৃতি আর বেঁচে থাকার অনুভূতিকে।

৬০টি পরিবার থেকে মাত্র পাঁচে: নিভে যাওয়া এক গ্রাম

৬৫ বছর বয়সী ছোটেন রাখাইনের মনে পড়ে একসময় কতটা রমরমা ও প্রাণবন্ত ছিল তাদের গ্রাম। তার বাবার গোলা ভরা ছিল সোনালী ধানে, খোলা মাঠে গরু চরত, আর প্রতিবেশীরা একে অপরের সাথে দুধ ভাগ করে নিত।

তখন ‘পাড়া’ বলতে বোঝাত একসাথে থাকা, একসাথে কাজ করা, বিপদের দিনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, উৎসবের জন্য চাঁদা তোলা আর বিয়ে বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সবাই মিলে আনন্দ করা।

তার লক্ষ্মী পাড়া গ্রামে একসময় ৬০টি রাখাইন পরিবার একটি বড় পরিবারের মতো বাস করত।

তারা কঠিন সময়ে একে অপরকে সাহায্য করত আর একসঙ্গে উৎসব উদযাপন করত। আজ সেখানে মাত্র পাঁচটি পরিবার পড়ে আছে।

যে বিষয়টি তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় তা কেবল সম্পদের ক্ষতি নয়; বরং চেনা মুখগুলোর হারিয়ে যাওয়া আর সেই নিবিড় সামাজিক বন্ধন ভেঙে যাওয়া, যা একসময় গ্রামের জীবনকে সার্থক করে তুলেছিল।

এই করুণ চিত্র কেবল লক্ষ্মী পাড়াতেই নয়।

কারিতাস বরিশালের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় ৩০৬টি এবং রাঙ্গাবালীতে ৩৬টি রাখাইন পরিবার অবশিষ্ট রয়েছে। তালতলী ও বরগুনা সদরে বাস করছে আরও ২৬৬টি পরিবার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের মো. সাইদুর রহমানের ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৪৭-৪৮ সালে দক্ষিণ-মধ্য উপকূলীয় অঞ্চলে রাখাইনদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি—তখন ১৬৮টি পাড়ায় ৫ হাজার ১৯০টি পরিবার বাস করত।

বছরের পর বছর ধরে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই সংখ্যা নেমে এসেছে আনুমানিক ৪৭টি পাড়ায় মাত্র ৫১৫টি পরিবারে।

গবেষণায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপকে এই ভিটেমাটি হারানোর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

ছোটেন নিজ চোখে দেখেছেন এই সাংস্কৃতিক পতন। তিনি একসময় তার এলাকার একটি সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব দিতেন; ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, নৌকা বাইচ আর সামাজিক-ধর্মীয় উৎসবের মাধ্যমে মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতেন। বুদ্ধ পূর্ণিমা, সাংগ্রাইয়ের জল উৎসব (সাংগ্রেং পোয়ে), প্রবারণা পূর্ণিমা আর বিয়েতে একসময় বিশাল জমায়েত হতো।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তখন এত পরিবার ছিল যে আমরা প্রত্যেকে সামান্য করে টাকা দিলেও জমকালো উৎসবের আয়োজন করা যেত। এখন আমাদের সংখ্যা এত কমে গেছে যে, সবাই মিলে চেষ্টা করলেও আর আগের মতো বড় করে অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় না।’

 

একটি সম্প্রদায় যখন ছোট হয়ে আসে, তখন তাদের উৎসবগুলো কেবল আকারেই ছোট হয় না—অংশ নেওয়ার মতো শিশু কমে যায়, বড়দের কাছ থেকে শেখার মতো তরুণ থাকে না। দেখা দেয় খাবার তৈরি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক বানানো, পুরোনো গান গাওয়া ও আচার-অনুষ্ঠান পালনের মানুষের অভাব। যে পরিবারটি চলে যায়, তার সাথেই এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে যুক্ত থাকা শিকড় দুর্বল হয়ে পড়ে।

আর ছোটেনের জন্য সবচেয়ে নিঃশব্দ কষ্টটি হয়তো সহ্য করা সবচেয়ে কঠিন: যে গ্রামটি একসময় আনন্দে ভেসে যেত, তা ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পরিণত হচ্ছে যেখানে এর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার মতো মানুষ আর প্রায় নেই বললেই চলে।

নদীর পেটে বিলীন গ্রাম এখন স্মৃতি: নোনা মাটি, ঘোলাটে ভবিষ্যৎ

৬০ বছর বয়সী মাতেন রাখাইনের তিন সন্তান। আজ তারা তিনটি আলাদা জায়গায় থাকেন। তিনি তাদের চলে যাওয়ায় বাধা দেননি। তার গ্রাম থেকে মানুষ যেভাবে ধীরে ধীরে চলে গেছে, তাতে মাতেন বুঝতে পেরেছেন যে কেবল জন্মভূমির মায়াই একটি পরিবারকে সেখানে ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা আর ভরসা করার মতো একটি ভবিষ্যৎ প্রয়োজন।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের অনেক রাখাইন পরিবার কৃষি, মাছ ধরা আর চারপাশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে ছিল। কিন্তু মাতেন বলেন, জীবন দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসের সাথে এখন যুক্ত হয়েছে অস্বাভাবিক গরম, অনিয়মিত বৃষ্টি আর মাটির চরম লবণাক্ততা।

তিনি জানান, গত বছর শিলাবৃষ্টিতে অনেক মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যান্য জায়গায় নোনা পানির কারণে জমিতে চাষবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনকি কৃষিকাজ করেও এখন আর নিশ্চিতভাবে বেঁচে থাকা যায় না।

কলাপাড়ার ৩৭টি পরিবারের ওপর চালানো একটি জরিপ ও সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে করা গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর অর্ধেকেরই প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। অধিকাংশের ব্যাংকে কোনো সঞ্চয় ছিল না।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে কীভাবে লবণাক্ততা আর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা উপকূলীয় জমির ফসল ফলানোর ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে কিছু জমিতে বছরে মাত্র একবার ধান চাষ করা যাচ্ছে আর অন্য ফসল ফলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

মাতেনের কাছে জমি হারানোর অর্থ কেবল চাষবাস বন্ধ হওয়া নয়। নদীর ওপারে চরে থাকা একটি পুরোনো রাখাইন গ্রামের কথা তার মনে পড়ে। তার কথা অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকের দুর্যোগের পর নদীভাঙনে সেটি নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। সেখানে একসময় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি রাখাইন পরিবার বাস করত।

আজ তার বর্তমান গ্রামে মাত্র ১১টির মতো পরিবার টিকে আছে, যার কিছু অংশও নদী গিলে খেয়েছে। ছোটেন রাখাইনও তার নিজের এলাকায় একই রকম পতনের কথা স্মরণ করেন।

 

হারিয়ে যাওয়া এই গ্রামগুলোর যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা কেবল মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে: যেখানে একসময় প্রতিবেশীর বাড়ি ছিল, যে পথটি বৌদ্ধ বিহারের দিকে যেত, উৎসবের সময় যে উঠানে মানুষ জমে উঠত, আর যেখানে একসময় শিশুরা খেলাধুলা করত।

গবেষণাতেও এই ক্ষতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষক পিয়েল পার্থ ২০১৮ সালে ‘প্রতিচিন্তা’ সাময়িকীতে প্রকাশিত তার গবেষণায় পটুয়াখালীর কলাপাড়ার লালুয়া ইউনিয়নের ‘ম্রাইবুনিয়া’ নামে একটি পুরোনো রাখাইন গ্রাম বিলুপ্ত হওয়ার কথা লিখেছেন।

মানুষ যখন কাজের খোঁজে ও নিরাপদ জীবনের আশায় চলে যায়, তখন তারা কেবল ঘরবাড়ি আর জমিই ফেলে যায় না। তারা ফেলে যায় প্রতিবেশী, যৌথ স্মৃতি আর যুগের পর যুগ ধরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্য।

আর যখন সেই সামাজিক বন্ধনগুলো ভাঙতে শুরু করে, তখন ক্ষতির আঁচ জমির সীমানা ছাড়িয়ে সম্প্রদায়ের মূল অস্তিত্বকেই আঘাত করে।

যে ভোজ আর বসে না

৫২ বছর বয়সী মাথুসের শৈশবে কোনো রাখাইন ঘর কখনোই নীরব ছিল না। শাল আর গর্জন কাঠের তৈরি উঁচু উঁচুমুখী বিশাল ঘরে বেড়ে ওঠার কথা স্মরণ করেন তিনি।

একই ছাদের নিচে ২০ বা ৩০ জন আত্মীয়—দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, মামা-মামি আর ভাইবোনেরা মিলে একসাথে থাকতেন। আজ সেই কাঠের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় নির্জন নিঝুম ঘর, যেখানে মাত্র একজন বা দুজন বয়স্ক মানুষ কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন।

মাথুস স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘যদি কেউ খালে মাছ ধরত, তবে পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে এক বাটি করে মাছ পাঠানো হতো। ধান কাটার মৌসুমে নারীরা নতুন ধান ভেঙে চিঁড়ে তৈরি করতে কাঠের ঢেকির চারপাশে জড়ো হতেন। আমরা এটাকে বলতাম ‘চিঁড়ে উৎসব’। আমরা পুরো গ্রামকে দাওয়াত দিতাম। এটা কেবল খাওয়াদাওয়ার বিষয় ছিল না; এটা ছিল একে অপরকে ভালোবেসে ধরে রাখার আমাদের নিজস্ব উপায়।’

সেই উৎসব আজ হারিয়ে গেছে। এলাকায় কাজের সুযোগ না থাকায় তরুণরা দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে চলে গেছে। কেউ কেউ সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে চলে গেছে এমন এক জায়গার খোঁজে, যেখানে মানুষ দেখতে এখনো তাদের মতো এবং তাদের ভাষায় কথা বলে।

এক দশকেরও বেশি সময় আগে সরকার রাখাইনদের গান, তাঁতশিল্প আর নাচকে বাঁচিয়ে রাখতে কলাপাড়া-কুয়াকাটা এলাকায় একটি ‘রাখাইন কালচারাল একাডেমি’ তৈরি করেছিল।

আজ সেই ভবনটি তালাবদ্ধ, ধুলোবালি ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মাথুস বলেন, ‘সরকারি অবহেলার কারণে এটি প্রায় ১২ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। যেখানে আমাদের সন্তানদের আমাদের নাচ, আমাদের বর্ণমালা আর আমাদের বাঁশি শেখার কথা ছিল, তা আজ ভারী লোহার তালার পেছনে পচে নষ্ট হচ্ছে। মনে হয় এটি আমাদের ভুলে যাওয়ারই এক প্রতীক।’

হারিয়ে যাওয়া বর্ণ আর ভাষা

৩২ বছর বয়সী বাবু চামল তার বাবাকে শিশুদের রাখাইন লিপির সেই সুন্দর, বাঁকানো অক্ষরগুলো লেখা শেখাতে দেখে বড় হয়েছেন। এখন চামল সেই লেখার ঐতিহ্যকে হারিয়ে যেতে দেখছেন।

নিজের ভাষায় কোনো প্রাথমিক স্কুল না থাকায় এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক না থাকায় ছোট রাখাইন শিশুদের কেবল বাংলা মাধ্যমেই পড়তে হচ্ছে। যদিও তারা এখনো বাড়িতে রাখাইন ভাষার কিছু শব্দ বলে, তবে অনেকেই তাদের পূর্বপুরুষদের বইয়ের একটি বর্ণও পড়তে পারে না।

চিন্তিত কণ্ঠে চামল বলেন, ‘আমাদের ভাষা এখন ফিসফিসানিতে পরিণত হচ্ছে। শিশুরা এখনো তাদের দাদি-নাানিদের সাথে কথা বলতে পারে, কিন্তু তারা আমাদের ইতিহাস, আমাদের কবিতা বা আমাদের প্রার্থনা পড়তে পারে না। আর এক প্রজন্মের মধ্যে আমাদের লিখিত ভাষাই চিরতরে হারিয়ে যাবে।’

ভাষার ভুলের মাশুল যখন নিজের ভিটেমাটি

ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়; উপকূলীয় বাংলাদেশে এটি নিজের ভিটেমাটি ধরে রাখা আর তা হারানোর মধ্যবর্তী ব্যবধান তৈরি করে দিয়েছে।

কারিতাস বরিশালে কর্মরত মং মিয়া রাখাইন এই ভাষাগত না-বোঝার করুণ ফলাফলের কথা স্মরণ করেন। তিনি জানান, ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর সরকার ‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি’ (সিপিপি)-র মাধ্যমে বিপদের পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু প্রতিটি সাইরেন আর রেডিওর খবর কেবল বাংলা ভাষায় দেওয়া হতো।

মং মিয়া বলেন, ‘আমাদের বয়স্ক মানুষেরা লাউডস্পিকারে বলা বাংলা কথাগুলো বুঝতে পারতেন না। বিশাল ঢেউ যে আসছে, তা তারা বুঝতেই পারেননি। আকাশ কালো হয়ে যাওয়া আর হাঁটু পর্যন্ত পানি না আসা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করেছিলেন। তারপর কোলে কেবল বাচ্চা আর কোটের নিচে কয়েকটা মুরগি নিয়ে তীব্র আতঙ্কে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছিলেন।’

সেই হুড়োহুড়ির মধ্যে হাতের লেখা জমির দলিল, পুরোনো দিনের করের রশিদ আর পারিবারিক সম্পত্তির কাগজপত্র ভরা মেটালের বাক্সগুলো সাগরে ভেসে যায়।

সেই হারিয়ে যাওয়া কাগজপত্রই পরে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। দলিল হারিয়ে যাওয়া এবং বয়স্ক মানুষেরা জটিল সরকারি বাংলা পড়তে না পারার সুযোগ নেয় অসাধু জমিগ্রাসীরা। জাল কাগজপত্র বানিয়ে আর আইনি সুযোগ নিয়ে রাখাইনদের হাজার হাজার একর জমি চুপচাপ নিজেদের নামে করে নেওয়া হয়।

গবেষক পিয়েল পার্থ এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। যখন প্রবীণ রাখাইন গ্রামবাসীরা তাদের পৈতৃক  জমির অধিকার দাবি করতে সরকারি অফিসে যেতেন, তখন কর্মকর্তারা তাদের এই বলে তাড়িয়ে দিতেন যে মূল ভূমির রেকর্ড বইটি বন্যায় নষ্ট হয়ে গেছে।

এমনকি অসাধু জমিগ্রাসীদের হাত থেকে পবিত্র স্থানগুলোও রক্ষা পায়নি। ঢাকায় কারিতাসের সাথে কাজ করা প্রমিলা রাখাইন জানান, নদীর তীরের কিছু শ্মশান পানিতে তলিয়ে গেলেও অন্যগুলো স্থানীয় প্রভাবশালীরা জাল টিপসই ব্যবহার করে দখল করে নিয়েছে।

মাতেন বলেন, ‘আপনি ধনী বা দরিদ্র যাই হোন না কেন, প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য প্রতিটি পরিবারের এই শ্মশানটুকু প্রয়োজন। ‘কাউকে আদালতে না টেনে আনলে আপনি আপনার বাবা-মাকে দাহ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে যখন সংশয় থাকে, তখন সেই কষ্ট মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।’

একটি বাড়ি আবার বানানো সম্ভব; একটি সংস্কৃতি কি সম্ভব?

একসময় একটি উঠানকে ঘিরে ২০ থেকে ৩০ জন মানুষ একসাথে বসে খেতেন। আজ কিছু ঘরে মাত্র দুই বা তিনজন মানুষ পড়ে আছেন। একসময় যেখানে শত শত মানুষ জমা হতো, সেখানে কাজের খোঁজে তরুণরা ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বিদেশে চলে যাওয়ায় উৎসবগুলো এখন নিঝুম হয়ে গেছে।

গ্রামগুলো থেকে গেছে, কিন্তু সেগুলোকে যারা প্রাণবন্ত করে রাখত, সেই মানুষ আর ঐতিহ্যগুলোর অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের রাখাইন সম্প্রদায়ের কাছে এই লড়াই কেবল জোয়ারের পানি, নোনা পানি বা ঝড়ের বিরুদ্ধে নয়। এটি তাদের অস্তিত্ব আর শিকড়কে ধরে রাখার লড়াই।

সমুদ্র যতই এগিয়ে আসবে, পুতুল হয়তো আবারও তার ঘর সরাতে বাধ্য হবেন। ছোটেনের পরিবার হয়তো অন্য কোনো পেশায় চলে যাবে, আর মাতেনের সন্তানরা হয়তো অন্য কোথাও নতুন সংসার পাতবে।

কিন্তু হারিয়ে যাওয়া গ্রাম, পৈতৃক শ্মশান, শৈশবের প্রিয় গাছপালা, একসাথে বসে খাওয়া কিংবা হাসিখুশিতে ভরা কোনো উৎসব অন্য কোথাও আর চাইলেই বানিয়ে নেওয়া যায় না।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘মনের বন্ধু’র মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সোনিয়া আক্তার সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বাস্তুচ্যুতি এবং সাংস্কৃতিক চর্চা কমে যাওয়া মানুষের একাকীত্ব, হতাশা এবং নিজস্ব পরিচয় হারানোর ভয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়।

লেখক, গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, এই ক্ষতিকে কেবল জমি আর জীবিকার মধ্যে না রেখে শিক্ষা, ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে হবে।

তারা দুজনই নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার ওপর জোর দেন।

রাখাইন সম্প্রদায়কে রক্ষা করার অর্থ কেবল তাদের ভিটেমাটি বাঁচানো নয়। এর অর্থ হলো পরবর্তী প্রজন্ম যাতে এখনো তাদের ভাষায় কথা বলতে পারে, তাদের নিজস্ব উৎসব পালন করতে পারে এবং তাদের পূর্বপুরুষের ভূমির সাথে টান অনুভব করতে পারে তা নিশ্চিত করা।

মানুষ অন্য কোথাও নতুন ঘর বাঁধতে পারে, কিন্তু একটি সম্প্রদায় যখন তার স্মৃতি, ঐতিহ্য আর নিজস্বতার অনুভূতি হারিয়ে ফেলে, তখন সেগুলোকে নতুন করে ফিরিয়ে আনা একটি ঘর বানানোর চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।