Image description

প্রবাসে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে গত ৯ মাসে দেশে ফিরেছেন ১৬৮৭ জন নারী শ্রমিক, যাদের অর্ধেকেরও বেশি (৯৭৯ জন) ফিরেছেন শুধু সৌদি আরব থেকে। 

এছাড়া সম্প্রতি মক্কায় বাংলাদেশ সরকারকে না জানিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা, কূটনৈতিক তদারকি ও প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।  

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলছেন, দক্ষতা বাড়িয়ে গৃহকর্মের বাইরে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা দরকার। নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠাতে হলে প্রশিক্ষিত করেই পাঠাতে হবে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রবাসে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে গত ৯ মাসে দেশে ফিরেছেন ১৬৮৭ জন নারী শ্রমিক, যাদের অর্ধেকেরও বেশি (৯৭৯ জন) ফিরেছেন শুধু সৌদি আরব থেকে। 

 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলছেন, দক্ষতা বাড়িয়ে গৃহকর্মের বাইরে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা দরকার। নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠাতে হলে প্রশিক্ষিত করেই পাঠাতে হবে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তা ও বিকল্প শ্রমবাজার নিয়ে প্রশ্ন

ভাইবোনের খরচ জোগাতে গৃহকর্মী হয়ে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে মরুর দেশ সৌদি আরব গিয়েছিলেন সাভারের শিলা বেগম। তিনি এক সৌদি নাগরিকের বাসায় কাজ করতেন। তবে দেশটিতে যাওয়ার এক বছর না পেরোতেই গত এপ্রিলে দেশে ফেরেন তিনি।

প্রবাসে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে গত ৯ মাসে দেশে ফিরেছেন ১৬৮৭ জন নারী শ্রমিক, যাদের অর্ধেকেরও বেশি (৯৭৯ জন) ফিরেছেন শুধু সৌদি আরব থেকে। 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলছেন, দক্ষতা বাড়িয়ে গৃহকর্মের বাইরে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা দরকার। নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠাতে হলে প্রশিক্ষিত করেই পাঠাতে হবে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তা ও বিকল্প শ্রমবাজার নিয়ে প্রশ্ন

ভাইবোনের খরচ জোগাতে গৃহকর্মী হয়ে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে মরুর দেশ সৌদি আরব গিয়েছিলেন সাভারের শিলা বেগম। তিনি এক সৌদি নাগরিকের বাসায় কাজ করতেন। তবে দেশটিতে যাওয়ার এক বছর না পেরোতেই গত এপ্রিলে দেশে ফেরেন তিনি।


ফেরার কারণ হিসেবে শিলা বলেন, ‘ওরা তো মানুষ না। দিন-রাত কাজ করায়, ঠিকমতো খেতে দেয় না। ঘুমাতে হতো রান্নাঘরে। বাসা থেকে বের হতে দেয় না। জেলখানার মতো জীবন, বন্দি থাকতে হয়। সহ্য করতে না পেরে দেশ থেকে টাকা নিয়ে দেশে চলে আসি।’

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ৯৭৯ জন নারী কর্মী

বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মীদের সঠিক হিসাব নেই সরকার কিংবা কোনো সংস্থার কাছে। তবে যারা আউটপাস (ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্র) নিয়ে দেশে ফেরেন, তাদের হিসাব রাখে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক।

প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের আউটপাস রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ৯৭৯ জন নারী কর্মী। অর্থাৎ ৫৮.৬২ শতাংশ ফেরত পাঠানো হয়েছে দেশটি থেকে। এ ছাড়া, জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন, ভারত থেকে ৫২ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ১২৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭ জন, মার্চে ৩০ জন, এপ্রিলে ২৩৬ জন, মে মাসে ১৬৭ জন, জুনে ১৬৯ জন, জুলাইয়ে ৩৩১ জন, আগস্টে ৩০৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব থেকে পাঠানো হয়েছে ১০৩ জন এবং জর্ডান থেকে ৬৪ জন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত কাজ না পাওয়া, ঠিকমতো বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থতা, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা, শারীরিক নির্যাতন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাসহ নানা কারণে নারী কর্মীরা ফেরত আসেন।

কর্মকর্তারা আরও জানান, দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীরা কাজ নিয়ে নানা অভিযোগ করেন। কেউ কেউ নির্যাতন-নিপীড়নের নানা অভিযোগ করেন। যৌন নির্যাতনের শিকার কেউ কেউ ফিরছেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে। কাজের নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় সৌদি আরব থেকে প্রায় প্রতি মাসেই নারী গৃহকর্মীরা ফিরে আসতে বাধ্য হন।

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় মসজিদ এলাকায় ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে গত বুধবার দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তারা হলেন—নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আক্তার। তবে এ সিদ্ধান্তের আগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যমে খবর আসার পর সৌদি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে চিঠি দিয়ে তাদের বিষয়ে তথ্য ও বিস্তারিত জানতে চেয়েছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট। বৃহস্পতিবার জেদ্দার পররাষ্ট্র দপ্তরে এই চিঠি পাঠানো হয়।

বাংলাদেশকে না জানিয়ে দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় দেশে সৌদি আরবের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়েও। এমন পরিস্থিতিতে কিছুটা বেকায়দায় রয়েছে সরকার। এর মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তথ্য চেয়েছে সরকার।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলী) নজরুল ইসলাম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রদূতকে বৈঠকে ডেকে এর আগে সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো নোট ভার্বালের একটি কপি হস্তান্তর করা হয়েছে।

বৈদেশিক শ্রমবাজার বহুমুখী করলেও বাংলাদেশ এখনো সৌদি আরবনির্ভরই রয়ে গেছে। দেশের শ্রমবাজার হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক, বিশেষ করে সৌদি আরবকেন্দ্রিক। এ ছাড়া, যেখানে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ বৈদেশিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছে, বাংলাদেশ পাঠাচ্ছে সবচেয়ে বেশি অদক্ষ কর্মী।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, যার দুই-তৃতীয়াংশই অর্থাৎ ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন গেছেন সৌদি আরবে। আর চলতি বছর বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন, এর মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনই সৌদি আরবের।

নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে সৌদি পাড়ি দিয়েছিলেন দোহারের জাহানারা বেগম। কিন্তু শারীরিক নির্যাতন সইতে না পেরে দেশে ফেরত আসেন তিনি। জাহানারা বলেন, স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় ডিভোর্স (তালাক) হয়। ভাইদের পরিবারের বোঝা ছিলাম। সেজন্য নিজের যা ছিল সব বিক্রি ও ধারদেনা করে সৌদি আরব গিয়েছিলাম সুখের আশায়। কিন্তু জালিম মালিকের নির্যাতনের কারণে চলে এসেছি। আমার মালিকের চরিত্র খারাপ ছিল। কুপ্রস্তাব দিত, রাজি না হলে নির্যাতন করত।

শিলা-জাহানারার মতো ফিরে আসা নারী কর্মীদের অনেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করছেন। তবুও তারা বেঁচে তো দেশে ফিরেছেন। কারও কারও ভাগ্যে সেটিও জোটে না। তাদের স্বপ্ন কফিনবন্দী হয়েই দেশে ফিরে আসে। প্রতি বছর এরকম শতাধিক নারীর কফিন আসে দেশে। মৃত্যুসনদে কারণ লেখা থাকে হয় ‘স্বাভাবিক’, নয়তো ‘আত্মহত্যা’।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীর ৯৪ শতাংশই প্রবাসে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ

সৌদিতে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফিরছেন নারী কর্মীরা

প্রবাসে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে গত ৯ মাসে দেশে ফিরেছেন ১৬৮৭ জন নারী শ্রমিক, যাদের অর্ধেকেরও বেশি (৯৭৯ জন) ফিরেছেন শুধু সৌদি আরব থেকে। 

 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলছেন, দক্ষতা বাড়িয়ে গৃহকর্মের বাইরে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা দরকার। নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠাতে হলে প্রশিক্ষিত করেই পাঠাতে হবে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তা ও বিকল্প শ্রমবাজার নিয়ে প্রশ্ন

ভাইবোনের খরচ জোগাতে গৃহকর্মী হয়ে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে মরুর দেশ সৌদি আরব গিয়েছিলেন সাভারের শিলা বেগম। তিনি এক সৌদি নাগরিকের বাসায় কাজ করতেন। তবে দেশটিতে যাওয়ার এক বছর না পেরোতেই গত এপ্রিলে দেশে ফেরেন তিনি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ৯৭৯ জন নারী কর্মী

বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মীদের সঠিক হিসাব নেই সরকার কিংবা কোনো সংস্থার কাছে। তবে যারা আউটপাস (ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্র) নিয়ে দেশে ফেরেন, তাদের হিসাব রাখে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক।

প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের আউটপাস রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ৯৭৯ জন নারী কর্মী। অর্থাৎ ৫৮.৬২ শতাংশ ফেরত পাঠানো হয়েছে দেশটি থেকে। এ ছাড়া, জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন, ভারত থেকে ৫২ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ১২৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭ জন, মার্চে ৩০ জন, এপ্রিলে ২৩৬ জন, মে মাসে ১৬৭ জন, জুনে ১৬৯ জন, জুলাইয়ে ৩৩১ জন, আগস্টে ৩০৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব থেকে পাঠানো হয়েছে ১০৩ জন এবং জর্ডান থেকে ৬৪ জন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত কাজ না পাওয়া, ঠিকমতো বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থতা, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা, শারীরিক নির্যাতন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাসহ নানা কারণে নারী কর্মীরা ফেরত আসেন।

কর্মকর্তারা আরও জানান, দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীরা কাজ নিয়ে নানা অভিযোগ করেন। কেউ কেউ নির্যাতন-নিপীড়নের নানা অভিযোগ করেন। যৌন নির্যাতনের শিকার কেউ কেউ ফিরছেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে। কাজের নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় সৌদি আরব থেকে প্রায় প্রতি মাসেই নারী গৃহকর্মীরা ফিরে আসতে বাধ্য হন।

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় মসজিদ এলাকায় ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে গত বুধবার দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তারা হলেন—নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আক্তার। তবে এ সিদ্ধান্তের আগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যমে খবর আসার পর সৌদি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে চিঠি দিয়ে তাদের বিষয়ে তথ্য ও বিস্তারিত জানতে চেয়েছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট। বৃহস্পতিবার জেদ্দার পররাষ্ট্র দপ্তরে এই চিঠি পাঠানো হয়।

বাংলাদেশকে না জানিয়ে দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় দেশে সৌদি আরবের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়েও। এমন পরিস্থিতিতে কিছুটা বেকায়দায় রয়েছে সরকার। এর মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তথ্য চেয়েছে সরকার।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলী) নজরুল ইসলাম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রদূতকে বৈঠকে ডেকে এর আগে সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো নোট ভার্বালের একটি কপি হস্তান্তর করা হয়েছে।

বৈদেশিক শ্রমবাজার বহুমুখী করলেও বাংলাদেশ এখনো সৌদি আরবনির্ভরই রয়ে গেছে। দেশের শ্রমবাজার হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক, বিশেষ করে সৌদি আরবকেন্দ্রিক। এ ছাড়া, যেখানে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ বৈদেশিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছে, বাংলাদেশ পাঠাচ্ছে সবচেয়ে বেশি অদক্ষ কর্মী।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, যার দুই-তৃতীয়াংশই অর্থাৎ ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন গেছেন সৌদি আরবে। আর চলতি বছর বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন, এর মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনই সৌদি আরবের।

নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে সৌদি পাড়ি দিয়েছিলেন দোহারের জাহানারা বেগম। কিন্তু শারীরিক নির্যাতন সইতে না পেরে দেশে ফেরত আসেন তিনি। জাহানারা বলেন, স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় ডিভোর্স (তালাক) হয়। ভাইদের পরিবারের বোঝা ছিলাম। সেজন্য নিজের যা ছিল সব বিক্রি ও ধারদেনা করে সৌদি আরব গিয়েছিলাম সুখের আশায়। কিন্তু জালিম মালিকের নির্যাতনের কারণে চলে এসেছি। আমার মালিকের চরিত্র খারাপ ছিল। কুপ্রস্তাব দিত, রাজি না হলে নির্যাতন করত।

শিলা-জাহানারার মতো ফিরে আসা নারী কর্মীদের অনেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করছেন। তবুও তারা বেঁচে তো দেশে ফিরেছেন। কারও কারও ভাগ্যে সেটিও জোটে না। তাদের স্বপ্ন কফিনবন্দী হয়েই দেশে ফিরে আসে। প্রতি বছর এরকম শতাধিক নারীর কফিন আসে দেশে। মৃত্যুসনদে কারণ লেখা থাকে হয় ‘স্বাভাবিক’, নয়তো ‘আত্মহত্যা’।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীর ৯৪ শতাংশই প্রবাসে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে ৮২ শতাংশ কর্মীকে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নারীদের ভীতি কমাতে ১৩টি দেশে আইনি সহায়তা চালু করা হয়েছে, সৌদিতে সেফ হোম চালু আছে।

জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, উগান্ডার মেয়েরা সৌদিতে যায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে। তারা থাকে ডরমিটরিতে, তারা যে বাসায় কাজ করে সেখানে থাকে না। তারা চুক্তিপত্র বোঝে, কী লেখা আছে, কত ঘণ্টা কাজ করতে হবে, বেতন কত, কবে দেওয়া হবে, কী সুবিধা আছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আমাদের যে মা-বোনেরা যান, তারা গ্রাম থেকে আসেন। আমরা যদি বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করি, তাহলে আরেক ঝামেলা আছে। অনেকগুলো বাস্তবতার সম্মুখীন আমাদের হতে হয়। আমরা চেষ্টা করছি নিয়মিত ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে। আমাদের নারী কর্মীরা যেন কর্মপরিবেশ থেকে শুরু করে নিরাপত্তা পান, তা নিশ্চিত করতে আমাদের আরও কাজ করতে হবে।

অভিবাসন ও শরণার্থী-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের শ্রমবাজার খাতকে সম্প্রসারিত করতে হবে। কোনো কোনো দেশে সেটা হচ্ছে। জর্ডানে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশি নারীরা কাজ করেন কিন্তু সৌদি আরবে না। সৌদি আরবে তারা সামন্ততান্ত্রিক চিন্তাধারায় থাকেন, বিশেষ করে যারা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন তাদের ক্ষেত্রে অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। কাজেই আমাদের অন্য খাতকে সম্প্রসারিত করতে হবে। সেই অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে; শুধু তৈরি পোশাক নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও। এমনকি পুরুষদের করার মতো কাজ যেগুলো, সেগুলো নারীরাও করতে পারেন, যেমন—কনস্ট্রাকশনের কাজ হতে পারে। নারীদের কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার, যাতে পুরুষদের পাশাপাশি এসব খাতে নারীরা কাজ করতে পারেন।’

আসিফ মুনীর বলেন, ‘আস্তে আস্তে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজ কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে। আমরা হুট করে বাজার বন্ধও করে দিতে পারি না। হুট করে বন্ধ করে দিলে নারীরা একেবারেই যেতে পারবেন না। গৃহকর্মীর কাজ কমিয়ে আনা গেলে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার ঝুঁকি এমনিতেই কমে আসবে। তবে এটার জন্য আমাদের প্রশিক্ষিত নারী কর্মী লাগবে। একটি জরুরি বিষয় হচ্ছে, বাসা-বাড়িতে কাজ করার ক্ষেত্রে যেটা হয়, ২৪ ঘণ্টা বা ৭ দিনই প্রায় গৃহবন্দি থাকতে হয়। কিন্তু নারীরা যদি এমন একটি সেক্টরে কাজ করেন যেখানে অন্যান্য পুরুষ ও নারী কর্মী আছেন এবং ডরমিটরিতে তিনি থাকতে পারছেন, তবে তা ভালো হয়। এটি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে আসা উচিত।’

এই অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘রিক্রুটিং এজেন্সিকে যখন এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকতে হবে, নারীরা যেন কোনো মালিকের বাসা-বাড়িতে বন্দী না থাকেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে। সে জন্য হোস্টেল বা ডরমিটরির মতো জায়গায় তাদের থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অন্যরা যেখানে থাকে তাদের সঙ্গে যদি থাকতে পারেন, তাহলে কিছুটা হলেও নিরাপত্তার জায়গা নিশ্চিত হবে।’

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী পাঠানো শুরু হয়। নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিলে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরব। সেই সময় থেকে দেশটিতে কর্মী পাঠাচ্ছে সরকার। বিভিন্ন সময়ে নারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে দেশটিতে কর্মী পাঠানো বন্ধের আলোচনাও হয়েছে।