Image description

হুমাইরা। বয়স ১০। চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে মারা যায় সে। হামে মৃত্যু হয় তার। মেয়েকে হারানোর প্রায় ছয় মাস পরও বাবা হুমায়ুন ইকবাল আহমেদের একটাই আক্ষেপ—সময়মতো টিকা পেলে হয়তো আজ বেঁচে থাকত তার মেয়েটা।

ইকবাল আহমেদের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা সদরের মাখালডাঙ্গা ইউনিয়নের দীননাথপুর গ্রামের নিমতলাপাড়ায়। তাঁর অভিযোগ, মেয়েকে হামের টিকা দেওয়ার জন্য একাধিকবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। কিন্তু কখনো বয়স হয়নি বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর সময় টিকার সংকট দেখা দেয়। পরে সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও তত দিনে হাম আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল হুমায়রা।

স্ট্রিমকে ইকবাল বলেন, ‘এর আগে দুই-তিনবার গেছি। বলছে, ৯-১০ মাসের আগে দেওয়া হবে না। আমার মেয়ের যখন হামের টিকা দেওয়ার সময় হলো, তখন টিকার সংকট ছিল।’

দেশে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ কর্মসূচির আওতায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী এক কোটি ৮৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু হুমাইরার বাবা জানান, বিশেষ এই কর্মসূচি শুরুর সময় তার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় সেই কর্মসূচির টিকাও পায়নি শিশুটি।

তিনি বলেন, ‘৫ এপ্রিল থেকে যখন টিকা দেওয়া শুরু হলো, তখন তো আমরা হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা চলতেছিল। ওই সময় তো আর টিকা দেবে না।’

বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে সাধারণ ঠান্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল শিশুটি। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রথমে নিউমোনিয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

প্রায় এক সপ্তাহ চিকিৎসার পর বাড়িতে ফিরলেও কয়েক দিনের মধ্যে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে হুমাইরা। এরপর একই হাসপাতালের অন্য চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয় তাকে। চিকিৎসা চলার একপর্যায়ে শরীরে ঘামাচির মতো লালচে দানা দেখা দেয়। বাড়তে থাকে জ্বর। পরে হাম শনাক্ত হলে শিশুটিকে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।

সেদিনের স্মৃতি তুলে ধরে ইকবাল বলেন, ‘আমি বাড়িতে খেতে এসেছিলাম। আমার স্ত্রী কান্না করে বলল, হুমাইরার গায়ে ঘামাচির মতো কী যেন উঠছে। শরীরও অনেক গরম। আমি খাওয়া ফেলে মোটরসাইকেল নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যাই।’

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নাজমুস সাকিব জানান, গত ১৫ এপ্রিল হামের উপসর্গ নিয়ে হুমাইরাকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৯ এপ্রিল হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো নমুনায় হাম শনাক্ত হয়।

তিনি আরও জানান, ২৩ এপ্রিল চিকিৎসা শেষে শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু পরদিন সকালে শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হলে আবার হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনেরা। ওইদিনই (২৪ এপ্রিল) মারা যায় শিশুটি।

তবে মেয়ের চিকিৎসা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে ইকবালের। তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তারকে বলেছি, স্যার, আপনার যদি না হয়, আমাকে বলেন। আমি ঢাকায় অথবা রাজশাহীতে নিয়ে যাই। রাজশাহী মেডিকেলে রেফার করার ব্যবস্থাও করেছিলাম। অ্যাম্বুলেন্স ঠিক ছিল। কিন্তু ডাক্তার বললেন, ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে। পরে আর নিয়ে যাওয়া হয়নি।’

বিয়ের তিন বছরের মাথায় প্রথম সন্তানকে হারানোর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, হুমাইরা ছিল তাদের একমাত্র সন্তান। মেয়ের মৃত্যুর পর পরিবারের জীবনটাই বদলে গেছে।

হুমাইরার বাবার এই অভিযোগ দেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ও টিকা সরবরাহের বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। নিয়মিত কর্মসূচিতে সাধারণত ৯ মাস বয়সে শিশুকে প্রথম ডোজ হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়। অন্যদিকে বিশেষ কর্মসূচিতে ৬ মাস বয়স থেকেই টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, হুমাইরা নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর সময় টিকা পায়নি। পরে বিশেষ কর্মসূচি শুরু হলেও অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেই সুযোগও আর কাজে লাগেনি।

টিকার বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, সরকার জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি এবং হামের মহামারির বিষয়টি স্বীকার করতে অনীহা দেখিয়েছে। পরিস্থিতিকে জরুরি হিসেবে স্বীকার না করলে সেই মাত্রায় প্রস্তুতি ও কার্যক্রম নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, সংক্রামক রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে শুধু হাসপাতালে শয্যা বা আইসিইউ বাড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, সময়মতো টিকা সরবরাহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সরকারের স্বাস্থ্য খাতের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘সরকারের আগ্রহ হাসপাতালের আইসিইউ, ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি ও শয্যা বাড়ানোর দিকে বেশি। অথচ রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত করার বিষয়গুলোতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।’