পটুয়াখালীর বাউফলে জমি দখলের চেষ্টা ও গাছ কাটার অভিযোগে ছাত্রশিবিরের এক ইউনিয়ন সভাপতির বিরুদ্ধে প্রকাশিত ভিডিওকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে বিরোধের ঘটনা ঘটেছে। ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচারের অভিযোগে ছাত্রশিবিরের তিন নেতাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়েছে। তবে মামলাটিকে মিথ্যা দাবি করে নিন্দা জানিয়েছেন ছাত্রশিবিরের এক সাবেক নেতা। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পর মামলাটির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) মামলার তদন্তের নির্দেশনা পাওয়ার পর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর আগে গত ৪ অক্টোবর দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার বাউফল উপজেলা প্রতিনিধি মো. মাসুম বিল্লাহ বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলাটি করেন। মামলার অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল পটুয়াখালী জেলা পুলিশের ইনভেস্টিগেশন বিভাগের মাধ্যমে সিআইডিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার আসামিরা হলেন কালাইয়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম ফাহিম, তার ভাই ছাত্রশিবির নেতা মো. আমিনুল ইসলাম এবং কালাইয়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মো. ইমরান খান। এ ছাড়া প্ররোচনাকারী ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে মো. আবুল কালাম হাওলাদার (৬৫) এবং অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ‘বাউফল নিউজ টুয়েন্টিফোর’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ‘শিবির নেতার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গাছ কাটার অভিযোগ’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রচার করেন সাংবাদিক মাসুম বিল্লাহ। একই অভিযোগে ‘খবর বাউফল’ ও ‘বাউফল টুডে’ নামের আরও দুটি ফেসবুক পেজেও ভিডিওটি প্রচার করা হয়। এ ঘটনার জেরে গত ১৭ আগস্ট রাত আনুমানিক ১০টা ৪৯ মিনিটে ছাত্রশিবির নেতা আমিনুল ইসলাম মুঠোফোনে সাংবাদিক মাসুম বিল্লাহকে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে কালাইয়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ইমরান খানের ফেসবুক আইডিতে প্রচারিত একটি ভিডিওতে সাংবাদিক মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ তোলেন ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি তরিকুল ইসলাম ফাহিম। সাংবাদিকের দাবি, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
মামলার বাদী সাংবাদিক মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা অভিযোগ তুলে ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়েছে। ভিডিওটি ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সত্য ঘটনার সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়া এবং তার সম্মানহানি করা। এর আগেও এই চক্রটি ফেসবুকে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছে। ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশায় তিনি আইনের আশ্রয় নিয়েছেন।
অন্যদিকে, কালাইয়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মো. ইমরান খান দাবি করেন, তরিকুল ইসলাম ফাহিম নিজের সম্পত্তির গাছ কেটেছিলেন। বিষয়টি ছিল তাদের পারিবারিক সমস্যা। ঘটনার সময় সাংবাদিক মাসুম বিল্লাহ সেখানে উপস্থিত হয়ে ভিডিও ধারণ করেন এবং ফাহিমের বক্তব্য নেন।
ইমরান খান বলেন, ফাহিম ঘটনাটিকে পারিবারিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে এবং সমঝোতার উদ্যোগের কথা জানিয়ে সাংবাদিককে ভিডিওটি প্রচার না করার অনুরোধ করেছিলেন। এ সময় মাসুম বিল্লাহ বিনিময়ে কিছু খরচ দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সাংবাদিক শিবির নেতাকে জড়িয়ে মিথ্যা অভিযোগের ভিডিও প্রচার করেন বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে সাংবাদিক একটি সাধারণ ডায়েরিও করেন বলে জানান ইমরান।
ইমরান খান আরও বলেন, পরে স্থানীয় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা মাসুম বিল্লাহ ও তরিকুল ইসলাম ফাহিমকে নিয়ে আলোচনায় বসেন। সেখানে বিষয়টি নিয়ে কোনো পক্ষ আর বাড়াবাড়ি করবেন না বলে সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া গাছ কাটার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট জমি জরিপ করিয়ে দেওয়ার জন্য মাসুম বিল্লাহ পাঁচ লাখ টাকা খরচ দাবি করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ-সংক্রান্ত অডিও রেকর্ড তাদের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন ইমরান খান।
তার দাবি, ছাত্রশিবিরের সভাপতি হিসেবে তরিকুল ইসলাম ফাহিম তার কাছে ভিডিও সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেছিলেন এবং তিনি সেই বক্তব্য প্রচার করেন। অভিযোগ তুলে ধরা তার নাগরিক অধিকার। সাইবার ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলাটিকে মিথ্যা দাবি করে নিন্দা জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাউফল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সব্যসাচী বলেন, সিআইডি সরেজমিনে তদন্ত করবে এবং আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করবে। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের মূল বিষয়গুলো উঠে আসবে। তদন্ত শেষে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
উল্লেখ্য, মামলা দায়েরের আগে সাংবাদিক মাসুম বিল্লাহ বাউফল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট করা ওই জিডির নম্বর ৯৭০। পরে গত ৪ অক্টোবর বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালে পিটিশন মামলা নম্বর ২৬২/২৬ দায়ের করেন তিনি।