Image description

দেশি-বিদেশী বিনিয়োগে বাংলাদেশ এখন অপার সম্ভাবনার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শ্রম সহজলভ্যতাসহ বিনিয়োগের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বস্তিদায়ক অবস্থা। বিদেশীরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। বিশেষ করে চীন বিনিয়োগের লক্ষ্যে একপায়ে খাড়া। বর্তমান বিশ্বে চীন একমাত্র দেশ, যারা পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে বিনিয়োগ করছে। চীনের বিনিয়োগে পাকিস্তান, শ্রীলংকা, থাইল্যা-, ইরাক, ব্রাজিলসহ আফ্রিকার অনেক দেশ অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে।

বাংলাদেশেও চীন বিনিয়োগ করেছে এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় ব্যপকহারে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপি’র একান্ত বৈঠক সে বার্তা দেয়। অথচ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধার মুখে পড়ছে সে উদ্যোগ। দিল্লির চেতনাধারী আমলাদের কূটকৌশলের মারপ্যাচে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার আট মাসেও চীনা বিনিয়োগে গতি আসেনি। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে ভারতীয় এজেন্ট এমন ভাবে শক্ত অবস্থান নিয়েছে যে বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময় চীনের সঙ্গে টিকা ক্রয় চুক্তি করার পরও সে সিদ্ধান্ত ফাইলবন্দী করে রেখে ভারত থেকে টিকা কিনতে প্রায় সাড়ে ৫শ কোটি টাকা অগ্রীম দেয়া হয়েছিল। পরর্বতীতে ভারত চুক্তি অনুযায়ী টিকা দেয়নি; অথচ টিকার ওই সংকটময় মুহুর্তে চীন এগিয়ে এসে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল, বিপুল পরিমান করোনা টিকা দিয়েছে। শুধু চীন নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন করা হয়েছিল। সে সম্মেলনে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা।

অথচ আমরাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত বিদেশী বিনিয়োগ আসেনি। দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীরা বলছেন, চীন চাইলেই বাংলাদেশে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্রই পাল্টে দিতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীলদের কঠোর অবস্থান। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও এখনো প্রশাসনে মাকরশার জালের মতো বিস্তার করে রয়েছে ভারতের চেতনাধারী আমলারা। তারা দিনে সরকারি অফিস করলেও রাতে দিল্লির পরামর্শ গ্রহণ করেন। ফলে সরকারের দায়িত্বশীলদের চীনের বিনিয়োগ আনতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমলার জাল ছিন্নভিন্ন করতে হবে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান ইনকিলাবকে বলেন, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, সমন্বয়হীনতা ও স্বচ্ছতার অভাব ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে এবং সম্ভাব্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, বিধিবিধান সহজীকরণ, অনুমোদন প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু করছাড় বা প্রণোদনা দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কোম্পানি নিবন্ধন, কর, ভ্যাট ও কাস্টমস-সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন ইনকিলাবকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন ও সেবা একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীকে আলাদাভাবে দপ্তরে দপ্তরে যেতে না হয়।

চীনের কাঁচামাল আর যন্ত্রপাতি। মানসম্মত পণ্য সুলভমূল্যে কিনতে পারায় সেদেশ থেকে বিভিন্ন শিল্পের প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি বাড়ছে। আর এতে শিল্পের চাকা ঘুরছে বাংলাদেশে। দেশটির কাঁচামালে উৎপাদিত পণ্যে সমৃদ্ধ হচ্ছে স্থানীয় বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা। অন্যদিকে উৎপাদিত রপ্তানিমুখী থেকে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা। সহজলভ্য, শর্তহীন ও সুলভে পণ্য আনায় দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও বিনিয়োগে রীতিমতো রূপান্তর ঘটিয়ে চলেছে। সুই-সুতা থেকে যুদ্ধবিমান-সাবমেরিন পর্যন্ত এখন আসছে চীন থেকে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল ও অসংখ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় জাতীয় প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী, ভারী সরঞ্জাম ও বিশেষ ইস্পাতের প্রাথমিক উৎসও চীন।

বন্ধুপ্রতীম দেশটি গত দেড় যুগে ও সাম্প্রতিক সময়ে বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, বস্তি উন্নয়ন, ভোলা গ্যাসক্ষেত্র সহ বেশকিছু খাতে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি সামাল দিতে বিদেশি বিনিয়োগ খুঁজতে মরিয়া অর্থকষ্টে থাকা সরকার। তবে এখানেও বাধা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা আমলের রেখে যাওয়া আমলাতন্ত্র। এই আমলাতন্ত্রের মারপ্যাচে বিদেশি বিনিয়োগ এখনো বন্দি কাগজে-কলমে। কোন বিনিয়োগ চুক্তি বা চুক্তির পথে এগিয়ে যেতে পারছে না দেশ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে গতকাল বুধবার চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে যৌথ ও সরাসরি বিনিয়োগের দিকে যেতে চায় বাংলাদেশ। আমরা ঋণ থেকে সরে এসে ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগের দিকে বেশি যাচ্ছি। এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আমরা আশা করি, এক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে।

সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু ঋণ নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে এমন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রকল্পের অংশীদার হবে। এতে ভবিষ্যতে সরাসরি ও যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ২৭টি প্রকল্পের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চীন। এরমধ্যে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১৩টি প্রকল্পে আট দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণের অর্থ ছাড় করা হয়েছে। একই সময়ে ১০টি প্রকল্পের বিপরীতে ৪৮৩ মিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। সে হিসেবে, ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তি হয়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৫০ শতাংশ ও অর্থ ছাড় হয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।

সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগের আগ্রহ
পায়রা বন্দর শিল্প অঞ্চলে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা শিল্প স্থাপনে এক দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। একইসঙ্গে পুনর্ব্যবহারযোগ্য তুলা উৎপাদন, লিথিয়াম ব্যাটারি ও ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে ১৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। ৬৫০ মিলিয়ন ডলারে মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মোংলায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ করতে চায়। সম্প্রতি মোংলা বন্দর সম্প্রসারণে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলার ঋণও দিয়েছে চীনা এক্সিম ব্যাংক।

চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পিপিপি প্রকল্পে চার দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। ঢাকার কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তির উন্নয়নে চীন ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।

চায়না ফিউচার গ্রুপ হোল্ডিং লিমিটেড বাপেক্সের সঙ্গে অংশীদারিত্বে ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনে ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। এছাড়া বিএমটিএফের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে রেলওয়ের রোলিং স্টক কারখানা স্থাপন, আধুনিক কৃষি, ঔষধি ভেষজ চাষ, শিক্ষা খাতেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।

দেড় লাখের বেশি কর্মসংস্থান
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য বলছে, দেশে এক হাজারের বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে ৫৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। চীনা বিনিয়োগের কারণে দেশের উৎপাদন, রপ্তানি আয় বেড়েছে। দেশীয় শিল্পে স্থানান্তর হয়েছে চীনা উন্নত প্রযুক্তি। এতে কারখানার উৎপাদন, কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, দেশীয় সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ, রপ্তানি আয় ছাড়াও সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে শিল্পাঞ্চলটিতে বিনিয়োগ প্রায় ১৩০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে ও এক লাখের বেশি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানাচ্ছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।

যেসব দেশ চীনা অর্থায়নের এগিয়েছে
চীনের অর্থায়ন কোন দেশের বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামো শিল্পায়নকে সহায়তা করেছে, কারো রেলপথ ও বন্দর বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সব দেশ একইভাবে লাভবান হয়নি। আবার কোন দেশের জন্য ঋণের চাপ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনের অর্থায়নে পাকিস্তানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সড়ক যোগাযোগ, বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল বিদ্যুৎ ঘাটতি কমানো, পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা, শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তা করা। রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের আকার প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এতে দেশটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সুযোগ বেড়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার নিকেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যাটারি শিল্পে চীনা বিনিয়োগের ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশটির এই শিল্প। দেশটি কাঁচা নিকেল রপ্তানির পরিবর্তে দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্পপণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানসহ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিকেল গলনাগার, ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি-সংশ্লিষ্ট শিল্পে বিনিয়োগ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার নিকেলজাত পণ্যের রপ্তানি ২০১৭ সালের তিন দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালে ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

চীনের অর্থায়ন ও অংশীদারত্বে নির্মিত চীন-লাওস রেলপথ লাওসকে চীনের সঙ্গে ও বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, প্রয়োজনীয় পরিবহন ও বাণিজ্য-সহায়ক সংস্কার হলে রেলপথটি ভিয়েনতিয়েন-কুনমিং রুটে স্থলপথে পণ্য পরিবহনের খরচ ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া ইথিওপিয়ায় চীনা অর্থায়ন, ঠিকাদারি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে শিল্পাঞ্চল ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। এসব উদ্যোগের ফলে উৎপাদনশীল শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান তৈরি ও রপ্তানি বেড়েছে। চীনা অর্থায়ন ও ঠিকাদারিতে কেনিয়ার মোম্বাসা বন্দর থেকে রাজধানী নাইরোবি পর্যন্ত আধুনিক রেলপথ নির্মিত হয়। যার প্রথম অংশ ২০১৭ সালে চালু হয়। এতে বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বেড়েছে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিনিয়োগ খরা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিনিয়োগ টানতে স্বদিচ্ছা আছে সরকারের। তবে তা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতার তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে জমি, উন্নয়নকারী নির্বাচন, চুক্তি ও অবকাঠামো প্রস্তুতির বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে আসে।

২০২২ সালে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে উন্নয়নকারী হিসেবে যুক্ত করা হয়। ২০২৬ সালে শিল্পাঞ্চল-সংশ্লিষ্ট সহায়ক অবকাঠামোর জন্য চার হাজার ১৮৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন ও নির্মাণকাজ শুরু হয়। জানা গেছে, ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ-প্রতিশ্রুতির কথা রয়েছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে।

একটি বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে সাধারণত জমি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সংযোগ, করসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, কোম্পানি নিবন্ধন ও অর্থ স্থানান্তরের মতো একাধিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, ঋণচুক্তি, জমির ইজারা ও উন্নয়ন চুক্তির মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকায় দর-কষাকষি দীর্ঘ হয়। জমি বরাদ্দ থাকলেও রাস্তা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বন্দর-সংযোগ প্রস্তুত না থাকলে কারখানা নির্মাণ বা উৎপাদন শুরু করা যায় না। বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন ও সিদ্ধান্ত সমন্বিত না হলে পরের ধাপও আটকে সময়ে বিলম্ব হয়।

আনোয়ারার শিল্পাঞ্চলে উন্নয়নকারী নির্বাচন, চুক্তি ও অর্থায়ন চূড়ান্ত করার দীর্ঘ সময় ও চার দশমিক শূন্য ৬০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাবের অচলাবস্থা-দুটি ঘটনাই বিনিয়োগের ঘোষণা থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত ব্যবধান কত বড় হতে পারে, তা দেখিয়ে দিয়েছে।

বিনিয়োগ চলে যাচ্ছে অন্যদেশে
ঝামেলামুক্ত ও প্রকৃত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না পেলে তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ না করে অন্য দেশে চলে যান বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি। তিনি ইনকিলাবকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশ্বজুড়ে বহু দেশে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে কাগজে-কলমে ওয়ান স্টপ সার্ভিসসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবে নির্দিষ্ট সময়ে এক জায়গা থেকে সেবা পাওয়া যায় না। ফলে কাগজে নীতি থাকলেও বাস্তবে তার সুফল মেলে না।

ভিয়েতনামের উদাহরন তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ভিয়েতনাম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে বাস্তবমুখী পরিবেশ তৈরি করায় সেখানে বাংলাদেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। অন্যদিকে বাস্তবসম্মত পরিবেশের অভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগের খরা কাটছে না। এই আমলাতান্ত্রিক বাধা কেবল বিদেশী বিনিয়োগ নয়, দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। তাই শুধুমাত্র নথিপত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবসম্মত বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া জরুরি।

হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতই অগ্রাধিকার
বিনিয়োগের জন্য সহজ, স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। তিনি ইনকিলাবকে বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কোম্পানি নিবন্ধন, কর, ভ্যাট ও কাস্টমস-সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা আমলাতান্ত্রিক বাধার মুখে পড়ছেন। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, সমন্বয়হীনতা ও স্বচ্ছতার অভাব ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, বিধিবিধান সহজীকরণ, অনুমোদন প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু করছাড় বা প্রণোদনা দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়।

নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহিও
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন ইনকিলাবকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু আকর্ষণীয় প্রণোদনা যথেষ্ট নয়; ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়াও সহজ হতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এর সুফল পেতে শুধু অনলাইনে আবেদনের সুযোগ থাকলেই হবে না। বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন ও সেবা একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীকে আলাদাভাবে দপ্তরে দপ্তরে যেতে না হয়। আবেদন জমা দেওয়ার পর কোন দপ্তরে ফাইল আছে, কী কারণে আটকে আছে ও কত দিনে সিদ্ধান্ত হবে-এসব তথ্য সহজে জানার ব্যবস্থা থাকা দরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না দিলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

সিপিডির বিশেষ ফেলো বলেন, একইসঙ্গে জমি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কর, শুল্ক ও পরিবেশগত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত সেবা মূল্যায়নও জরুরি। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের সাফল্য নির্ভর করবে এর আওতায় থাকা সেবার সংখ্যা নয়, বরং বিনিয়োগকারীরা কত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পান তার ওপর।