Image description

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় বাড়ছে মাটির লবণাক্ততা। এমন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে জীবন ধারণের চেষ্টা করছেন উপকূলের মানুষ। এছাড়া চাষাবাদে তৈরি হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে লবণ সহিষ্ণু জাতের ধান চাষ ক্রমে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। খাদ্যের সংস্থানে কক্সবাজারে লবণসহিষ্ণু ধান চাষ বাড়াচ্ছে কৃষক পরিবারগুলো। লবণাক্ত পরিবেশে চাষাবাদ উপযোগী ধানের জাত বাড়ার সঙ্গে তিন মৌসুমেই লবণ সহিষ্ণু চাষে ঝুঁকছেন চাষিরা।

জেলায় চলতি খরিফ-২ (১৬ জুলাই হতে ১৫ অক্টোবর) মৌসুমে ৩ হাজার ৬০৭ হেক্টর লবণ জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। যা গত মৌসুমের চেয়ে ৫৫ হেক্টর বেশি বলে উল্লেখ করেছেন কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রমাণিক।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয় সূত্র মতে, জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজারে ৩০৬৮০ হেক্টর লবণ জমি রয়েছে। সেখানে রবি, খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুম মিলে চকরিয়ায় এক হাজার ৩৯২ হেক্টর, পেকুয়ায় তিন হাজার ৫০৯ হেক্টর, রামুতে ৪০ হেক্টর, উখিয়ায় ৬০ হেক্টর, টেকনাফে ৩০০ হেক্টর, মহেশখালীতে ৫৫০ হেক্টর ও কুতুবদিয়ায় ৪০ হেক্টর জমিতে লবণ সহিষ্ণু ধান চাষ হয়ে থাকে। এ তিন মৌসুমে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে চাষের আওতায় এসেছে ৫ হাজার ৮৯১ হেক্টর জমি। গত অর্থবছরে (২০২৪-২০২৫) এ তিন মৌসুমে জমির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮০২ হেক্টর। এ বছর ৮৯ হেক্টর জমিতে চাষ বেড়েছে ।

‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততা বাড়ছে এমন এলাকায় লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ ক্রমে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। লবণ মাঠে ধান চাষ করতে স্ব স্ব উপজেলার কৃষি অফিস কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে। একারণে গতবছরের চেয়ে এ মৌসুমে চাষ বেড়েছে। লবণ মাঠে ধান চাষে আগ্রহী কৃষকদের প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সরবরাহ করার কার্যক্রম চালানো হবে।’

চাষিদের মতে, লবণাক্ত হাওয়া এবং লবণপানির ছোঁয়া যেসব বিলে পড়তো সেসব মাঠে ফলন দূরে থাক ঘাসও ভালোমতো জন্মাত না। তাই প্রাচীনকাল থেকে লবণ মাঠে গ্রীষ্মে লবণ উৎপাদনের পর বর্ষায় কিছু মাঠে পানি ঢুকিয়ে ঘের বানানো হতো। রাস্তার পাশের বা উঁচু এলাকার মাঠগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকতো। এসব মাঠে মিঠাপানির ধানচাষ করা হলেও ফলন ঘরে তোলা যেত না। ফলে ধীরে ধীরে বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ ও আশপাশের জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর পর লবণ সহিষ্ণু ধানের জাত আবস্কিারের পর ঘের না হওয়া বা ঘেরের কিনারার মাঠে ধান চাষ শুরু হয়। প্রথমে ব্রি-৪৭ জাতের ধানটি মাঠে আসে। সেটি অনেক এলাকার আবহাওয়ার সঙ্গে উপযোগী ছিল না। তাই এ ধানের ফলন কম হতো। কিন্তু চলমান সময়ে একাধিক জাতের লবণসহিষ্ণু জাতের ধান বিদ্যমান। যে এলাকায় যে ধান পরিবেশের সাথে সামাঞ্জস্য হয় সেই ধানই চাষ হচ্ছে। এভাবে বর্ষা হতে পুনরায় লবণ মাঠ শুরু হওয়া পর্যন্ত সময়ে রবি, খরিফ-১ ও খরিফ-২ তিনটি ধাপে এসব মাঠে চাষ হচ্ছে।

 

 

 

কৃষি বিভাগের মতে, চলতি মৌসুমে লবণ মাঠে উফষী জাতের ব্রি ধান-৭৫ সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্রি ধান-৩৩, ব্রি ধান-৪৯, ব্রিধান-৭৫, বিনা-৭, ও স্থানীয় জাত বিন্নি এবং পাইজাম আবাদও হয়েছে। স্বল্প মেয়াদি লবণসহিষ্ণু জাতের এই ধান মাত্র ১০০-১২০ দিনে পরিপক্ব হয়। এতে করে কৃষকরা যেমন অল্প সময়ে ঘরে ফলন তুলতে পারেন, তেমনি তারা সঠিক এবং উপযুক্ত সময়ে লবণ মাঠে নামতে পারছেন। স্বল্প মেয়াদী লবণ সহিষ্ণু জাতের ধানে ফলন ভাল হওয়ায় লবণ মাঠে ধান চাষের জনপ্রিয়তা নিত্য বাড়ছে।

তবে চাষিদের মতে, লবণসহিষ্ণু জাতের ধানের বীজের সহজলভ্যতার জন্য ইউনিয়ন বা এলাকাভিত্তিক ক্ষুদ্র বা বৃহৎ আকারে ডিলার থাকলে ভালো হয়। এছাড়া এখনো অনেক কৃষক পরিবার লবণ মাঠে ধান চাষের বিষয়ে জানেন না। তাদের উদ্বুদ্ধ করা গেলে খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাড়া পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর চাষাবাদ বাড়াতে কৃষি প্রণোদনায় বীজ ও সার সরবরাহ করা গেলে জেলার প্রায় সব লবণ মাঠ পর্যায়ক্রমে ধান চাষের আওতায় চলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কৃষকরা যেমনি লাভবান হবেন, তেমনি দেশও খাদ্যে সয়ংসম্পন্ন হতে পারে।

‘এক সময় লবণ চাষ শেষ হলে মাঠগুলো পরিত্যক্ত পড়ে থাকতো। এখন লবণ মৌসুম শেষ হলে ওই জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। ফলে একই জমিতে দুই ভিন্ন চাষে লাভবান হচ্ছেন কৃষক পরিবার। এখনো টেকনাফের বিপুল লবণ মাঠ মৌসুম শেষে পরিত্যক্ত থাকে। তদারকির মাধ্যমে জমিগুলোকে ধান চাষের আওতায় আনা গেলে এলাকাবাসী উপকৃত হবার পাশাপাশি, দেশের কৃষিখাতও সমৃদ্ধ হবে।’

টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ এলাকার কৃষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখানে দশকের পর দশক মাঠে লবণাক্ত বাড়ছে। ফলে, স্বাভাবিক উপায়ে বর্ষায় শস্য ফলন হচ্ছিল না। কিন্তু লবণসহিষ্ণু জাতের ধান মাঠে আসার পর লবণ মৌসুম ছাড়া বাকি সময়ে দু’থেকে তিনবার ধান চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। সাধারণ লবণ মাঠে আগাম এবং স্বল্প মেয়াদি জাতের ধানের চারা রোপণ করা হয়। লবণসহিষ্ণু ও স্বল্প মেয়াদি জাতের ধান এবং সময়মতো কৃষি প্রণোদনা পেলে লবণ মাঠে ধান চাষ আরও বিস্তার ঘটবে।

 

 

 

টেকনাফে উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্র মতে, চলতি মৌসুমে পুরো উপজেলায় ১১ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে উপজেলার লবণাক্ত জমিতে খরফি-২ চাষাবাদ হচ্ছে হোয়াইক্যং ৫০ হেক্টর, হ্নীলায় ৯০ হেক্টর, টেকনাফ সদরে ১৫ হেক্টর, সাবরাংয়ে ৪৫ হেক্টর ও বাহারছড়ায় ২ হেক্টর। চাষাবাদের আওতায় আসা ২০২ হেক্টর জমিতে ব্রিধান-৩৩, ব্রিধান-৭৫, ব্রিধান- ৪৯, বিনা-৭, বিন্নি ও পাইজাম লাগানো হয়েছে।

চাষিদের মতে, চলতি মৌসুমে লবণ মাঠে লাগানো ব্রিধান-৩৩, ব্রিধান-৭৫, ব্রিধান- ৪৯,বিনা-৭, বিন্নি ও পাইজাম প্রজাতির স্বল্প মেয়াদী ধান চাষে ভাল ফলন হয়েছে। অনেক চাষে পাক ধরেছে- কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না এলে কানি প্রতি প্রায় একশ আরি বা তারও উপরে ফলন ঘরে তোলা সম্ভব হতে পারে।

‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখানে দশকের পর দশক মাঠে লবণাক্ত বাড়ছে। ফলে, স্বাভাবিক উপায়ে বর্ষায় শস্য ফলন হচ্ছিল না। কিন্তু লবণসহিষ্ণু জাতের ধান মাঠে আসার পর লবণ মৌসুম ছাড়া বাকি সময়ে দু’থেকে তিনবার ধান চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। সাধারণ লবণ মাঠে আগাম এবং স্বল্প মেয়াদি জাতের ধানের চারা রোপণ করা হয়। লবণসহিষ্ণু ও স্বল্প মেয়াদি জাতের ধান এবং সময়মতো কৃষি প্রণোদনা পেলে লবণ মাঠে ধান চাষ আরও বিস্তার ঘটবে।’

কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডী খামার পাড়ার কৃষক শাহাজাহান বলেন, আগে জানা ছিল না বলে লবণ চাষের পর মাঠ পরিত্যক্ত পড়ে থাকতো। কিন্তু বিগত বছর চারেক আগে অল্প করে শুরু করা হয় লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ। প্রথম বছর অল্প ধান হলেও পরের বছর ফলন বাড়ে। এভাবে চাষ বাড়িয়েছি। আমার দেখা দেখি আশপাশের লবণ মাঠ এলাকায় লবণসহিষ্ণু ধানের চাষ বেড়েছে। এখন প্রায় অর্ধশত হেক্টরের মতো জমিতে বর্ষায় লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ হচ্ছে। এবার চাষের ফলনও ভালো হয়েছে।

চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মনজুর আলম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্র উপকূলের মাঠ-ঘাটে লবণাক্ততা ক্রমে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হলে, লবণসহিষ্ণু ধান চাষ বাড়ানোর বিকল্প নেই। আমরা আমাদের মতো করে বিষয়টি প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছি। কৃষি বিভাগ চাইলে তাদের সচেতনতামূলক প্রচারণায় আমরাও যোগ দিতে পারি। এভাবে উপজেলার পরিত্যক্ত লবণ মাঠে বর্ষা ও লবণ মাঠ শুরুর আগের মৌসুমে ধান চাষ নিশ্চিত করা যায়।

 

 

 

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জাগো নিউজকে বলেন, এক সময় লবণ চাষ শেষ হলে মাঠগুলো পরিত্যক্ত পড়ে থাকতো। এখন লবণ মৌসুম শেষ হলে ওই জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। ফলে একই জমিতে দুই ভিন্ন চাষে লাভবান হচ্ছেন কৃষক পরিবার। এখনো টেকনাফের বিপুল লবণ মাঠ মৌসুম শেষে পরিত্যক্ত থাকে। তদারকির মাধ্যমে জমিগুলোকে ধান চাষের আওতায় আনা গেলে এলাকাবাসী উপকৃত হবার পাশাপাশি, দেশের কৃষিখাতও সমৃদ্ধ হবে।

তবে চাষিদের অভিযোগ, লবণসহিষ্ণু বা অন্য চাষে তারা কখনো কৃষি প্রণোদনা পাননি। উল্টো উচ্চ মূল্যে সার ও বীজ সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে হয় তাদের। কৃষি বিভাগ সহযোগিতা দিলে চাষ বাড়িয়ে ফলন বাড়ানো যেত। এবছর আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকায় লবণ মাঠে চাষকৃত জমিতে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখছে কৃষকরা।

টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির জাগো নিউজকে বলেন, গত মৌসুমে টেকনাফে কৃষকরা লবণ মাঠে ধান চাষ করে বাম্পার ফলন পান। তা দেখে চলতি বর্ষায় কৃষকদের অনেকে লবণ মাঠে ধানের আবাদ করেছেন। এতে গতবারের তোলনায় বেশি পরিমাণ লবণ মাঠ আমন চাষের আওতায় এসেছে। বৃষ্টির সহনীয় মাত্রা, অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষি উপকরণ সহজলভ্য হওয়ায় এবারও লবণ সহিঞ্চু জাতের ধানের বাম্পার ফলন আশা করা যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততা বাড়ছে এমন এলাকায় লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ ক্রমে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। লবণ মাঠে ধান চাষ করতে স্ব স্ব উপজেলার কৃষি অফিস কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে। একারণে গতবছরের চেয়ে এ মৌসুমে চাষ বেড়েছে। লবণ মাঠে ধান চাষে আগ্রহী কৃষকদের প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সরবরাহ করার কার্যক্রম চালানো হবে।