টাঙ্গাইল হয়ে উঠছে ডেঙ্গুর নতুন হটস্পট। এ ছাড়া খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, নারায়ণগঞ্জে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রোগী। ঢাকার বাইরে নতুন এ হটস্পটগুলোয় আগ্রাসি হয়ে উঠছে ডেঙ্গুজ্বর।
এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন দুই হাজারের বেশি রোগী। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। আর মারা গেছেন ৩১৬ জন।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পূর্বাভাসে দেখা গেছে টাঙ্গাইল ডেঙ্গুর নতুন হটস্পট হয়ে উঠছে। এর বাইরে খুলনা, বাগেরহাটে রোগীর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। এসব এলাকার বদ্ধ জলাধারে বাড়ছে এডিসের লার্ভা। ঝালকাঠিতেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকার কাছাকাছি নারায়ণগঞ্জ ডেঙ্গুর অন্যতম হটস্পট।’
ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে বিভিন্ন জেলায়। টাঙ্গাইল থেকে আমাদের প্রতিনিধি মো. নাসির উদ্দিন জানান, জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। ডেঙ্গু রোগীর জন্য প্রতিটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচটি করে শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। টাঙ্গাইল সদর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার ৩৩ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জেলায় ১ হাজার ৫৯৯ জন সরকারি হাসপাতালে এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৩৮৯ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ পর্যন্ত মারা গেছের তিনজন। টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. ফরাজী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম মঞ্জু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। জেলার সব হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও গুরুত্বের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
ঝালকাঠি থেকে এস এম রেজাউল করিম জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠি জেলাকে ডেঙ্গুর রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত সোমবার জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে জেলার চারটি হাসপাতালে ২ হাজার ৩৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। ঝালকাঠির সিভিল সার্জন হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এসব ওয়ার্ডে রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
পাশাপাশি প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। বাগেরহাট থেকে শেখ আহসানুল করিম জানান, গত ২৩ জুলাই থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ২১১ জন। সরকারি হিসাবে এ সময়ে ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার জানান, বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ২৫টি শয্যা রয়েছে। গত চার মাস ধরে এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আ স মো মাহবুবুল আলম ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানান।
এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাজধানীকে কেন্দ্র করে তৈরি করা একটি পরিকল্পনা দিয়ে পুরো দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক ঝুঁকি মানচিত্র। কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় কোন ধরনের প্রজননস্থল বেশি, কোন মৌসুমে ঝুঁকি বাড়ে, কোন কীটনাশক কার্যকর এবং কোথায় কীটনাশক প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ঢাকার জন্য যে কৌশল কার্যকর, সেটি প্রত্যন্ত জেলার জন্যও একইভাবে কার্যকর হবে- এমন ধারণা বৈজ্ঞানিক নয়।’
ভর্তি রোগী ১ লাখ ছাড়াল : দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) ডেঙ্গুজ্বরে মারা গেছেন নয়জন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে তিনজন, ঢাকা উত্তর সিটি এলাকার হাসপাতালে দুজন, চট্টগ্রাম বিভাগে একজন, খুলনা বিভাগে দুজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজন মারা গেছেন। চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৩৯৬ জন। একই সময়ে এ রোগে মারা গেছেন ৩১৬ জন।