বাংলাদেশের ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য কেন হচ্ছে না, এ নিয়ে অনেকেই অনেক ধরনের ব্যাখ্যা দেন। কেউ আদর্শিক মতপার্থক্যের কথা বলেন, কেউ নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কথা বলেন, আবার কেউ রাজনৈতিক স্বার্থের কথা বলেন। তবে আমার বিবেচনায়, এই অনৈক্যের পেছনে প্রধানত দুটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে।
১. প্রথম কারণটি হচ্ছে পীরতন্ত্র বা খানকাহকেন্দ্রিক রাজনীতি
জামায়াতে ইসলামী বাদ দিলে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মূলত পীর, খানকাহ কিংবা মাজারকেন্দ্রিক। এসব দলের নেতৃত্বের সঙ্গে নির্দিষ্ট পীরের অনুসারী বা মুরিদদের একটি সম্পর্ক রয়েছে। এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি ধর্মীয় কর্তৃত্ব, ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থও কাজ করে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন পীর কেন আরেকজন পীরের সঙ্গে ঐক্য করবেন? দুজনেরই নিজস্ব অনুসারী রয়েছেন, নিজস্ব প্রভাববলয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বীও। ফলে রাজনৈতিক ঐক্য করতে গেলে নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং অনুসারীদের ওপর প্রভাবের প্রশ্ন সামনে চলে আসে। একজন পীরের পক্ষে আরেকজন পীরের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া সব সময় সহজ হয় না। কারণ এর সঙ্গে শুধু রাজনৈতিক স্বার্থ নয়, তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও সামাজিক কর্তৃত্বের প্রশ্নও জড়িত।
২. দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক রাজনীতি
বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক দলের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক প্রভাব নির্দিষ্ট মাদ্রাসা কিংবা মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আলেমদের নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। কোনো দলের প্রধান একটি বড় মাদ্রাসার মুহতামিম, আবার অন্য কোনো দলের নেতৃত্বের ভিত্তি আরেকটি মাদ্রাসা।
এখানেও একই সমস্যা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অনুসারী, প্রভাব, নেতৃত্ব এবং স্বার্থ রয়েছে। ফলে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের প্রশ্ন সামনে এলেও অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠা সম্ভব হয় না।
আমি মনে করি, এই দুটি বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু ইসলামি ঐক্যের কথা বললে বাস্তবে খুব বেশি অগ্রগতি হবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কাঠামো এখানে কিছুটা ভিন্ন। দলটির নেতৃত্ব কোনো নির্দিষ্ট পীরের গদি কিংবা মাদ্রাসার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এর নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে জামায়াতের নিজস্ব দলীয় স্বার্থ কিংবা অন্যদের সঙ্গে মতাদর্শিক পার্থক্য নেই।
মাওলানা মামুনুল হক সাহেব সম্ভবত এই মাদ্রাসাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিসর থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর ইসলামি রাজনীতির দিকে যাওয়ার একটি চেষ্টা করছেন। তিনি কতটা সফল হবেন, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে তাঁর এই প্রচেষ্টার বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
আমার বক্তব্য খুব পরিষ্কার। ইসলামি দলগুলোর মধ্যে মতাদর্শিক পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও রয়েছে। কিন্তু এসবের বাইরেও পীরতন্ত্র এবং মাদ্রাসাকেন্দ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ঐক্যের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
যতদিন এসব দল নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়কে নির্দিষ্ট পীর, খানকাহ কিংবা মাদ্রাসার প্রভাববলয়ের বাইরে নিয়ে আসতে না পারবে, ততদিন বৃহত্তর ইসলামি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা আমার বিবেচনায় অত্যন্ত কঠিন হবে।
কারণ ঐক্য করতে হলে শুধু অন্য দলের নেতৃত্বকে স্বীকার করলেই হবে না, প্রয়োজনে নিজের প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের কিছু অংশ ছাড় দেওয়ার মানসিকতাও থাকতে হবে।
আর বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বড় সংকটটি এখানেই।
-ওয়ালিউদ্দিন তানভীর