Image description

চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে প্রায় ১০ হাজার নিলামযোগ্য কনটেইনার। প্রক্রিয়াগত জটিলতায় এসব কনটেইনার ও পরিত্যক্ত যানবাহন নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। এতে বন্দরের ইয়ার্ডে জায়গার সংকট তৈরি হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে পণ্য খালাস কার্যক্রম। অন্যদিকে, আর্থিক সংকটে থাকা ছয়টি ব্যাংকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ১ হাজার ২৬২ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া মোংলা ও পায়রা বন্দরের ড্রেজিং প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং দীর্ঘদিনের নিরীক্ষা আপত্তি পর্যালোচনা করেছে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি। অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির পঞ্চম বৈঠকে তিনটি বন্দরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালন কার্যক্রম ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

নিলামযোগ্য ১০ হাজার কনটেইনার নিষ্পত্তিতে জটিলতা: চট্টগ্রাম বন্দরে থাকা প্রায় ৫৪ হাজার কনটেইনারের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার নিলামযোগ্য। কিন্তু দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও কাস্টমসের সঙ্গে সমন্বয়-সংক্রান্ত জটিলতায় এসব কনটেইনার নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। ফলে বন্দরের ইয়ার্ডের জায়গা আটকে থাকছে এবং পণ্য ওঠানো-নামানো ও খালাস কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াগত জটিলতা দূর করা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।

ব্যাংকে আটকা ১২৬২ কোটি টাকা: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা মেয়াদোত্তীর্ণ স্থায়ী আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছয়টি আর্থিক সংকটাপন্ন ব্যাংকে তাদের ১ হাজার ২৬২ কোটি ১৬ লাখ ৭৮ হাজার ৩৮৪ টাকার স্থায়ী আমানত ছিল।

এর মধ্যে পদ্মা ব্যাংকে ছিল ১৭৯ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বাকি পাঁচ ব্যাংক—গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকে সম্মিলিতভাবে ছিল ১ হাজার ৮২ কোটি ৮৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৪ টাকা। একই সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের মোট স্থায়ী আমানতের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ১৩৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকার বেশি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ব্যাংকে তারল্য সংকট থাকায় আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে ঝুঁকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ডের (আইএফআরএস-৯) বিধান অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য প্রয়োজনীয় হিসাবভিত্তিক সংস্থান রাখা হয়নি বলে নিরীক্ষায় আপত্তি তোলা হয়েছে।

তবে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা পুরো অর্থকে ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকির প্রভাব হিসাবের মধ্যে তুলে ধরতেই এ ধরনের সংস্থান রাখার বিধান রয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে নাম আসা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকটি ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করেছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতো প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বৈঠকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

বৈঠকে বন্দর কর্তৃপক্ষের আমানত ফেরত আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের নিরীক্ষা আপত্তি নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ড্রেজিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন মোংলা ও পায়রা বন্দরের ড্রেজিং কার্যক্রমের বাস্তব ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা আপত্তি পর্যালোচনার সময় প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া গেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রকল্পের আগে ও পরে নদীর গভীরতা পরিমাপের ফল নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। আলোচনায় অভিযোগ করা হয়, ড্রেজিংয়ের আগে নদীর গভীরতা প্রায় পাঁচ মিটার থাকলেও পরে পরিমাপেও প্রায় একই গভীরতা পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগের সময়ের অনিয়মের দায় বর্তমান কর্তৃপক্ষের নয় বলে বক্তব্য দেন। তখন আগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়। প্রকল্পের বাস্তব ফলাফল ও সরকারি অর্থের ব্যবহার যাচাই করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

মোংলা ও পায়রা বন্দরে ৪৩৮টি নিরীক্ষা আপত্তি অনিষ্পন্ন কার্যপত্র অনুযায়ী, ১৯৭২ সাল থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোংলা বন্দরের বিরুদ্ধে ২ হাজার ১০৯টি নিরীক্ষা আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৮২টি নিষ্পত্তি হলেও ৩২৭টি এখনো অনিষ্পন্ন।

অন্যদিকে, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পায়রা বন্দরের বিরুদ্ধে ১৭৬টি নিরীক্ষা আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে; অনিষ্পন্ন রয়েছে ১১১টি।

পায়রা বন্দরের নিরীক্ষা আপত্তির তালিকায় ড্রেজিংয়ের কাজের কর্মসূচি অনুসরণ না করে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের অভিযোগে ১১৭ কোটি ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫৩ টাকা জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত হারের চেয়ে কম হারে মূল্য সংযোজন কর কর্তনের অভিযোগে অর্থের পরিমাণ ৯৪ লাখ ৬ হাজার ৩০ টাকা। ঠিকাদারের বিল থেকে বিলম্বজনিত জরিমানা না কাটার অভিযোগে ৯০ লাখ ২০ হাজার ২৫ টাকা এবং খননকাজে উত্তোলিত মাটির অস্তিত্ব না পাওয়াসংক্রান্ত আপত্তিতে ৫০ কোটি ৩৬ লাখ ৯৭ হাজার ৮৭৫ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব অর্থ নিরীক্ষা আপত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট; এগুলোকে প্রমাণিত আর্থিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর বিষয়ে যাচাই ও নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রকৃত দায় নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি অর্থের সুরক্ষা ও জবাবদিহিতে গুরুত্ব সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তিনটি বন্দরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন কার্যক্রম পর্যালোচনার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের নিরীক্ষা আপত্তি নিষ্পত্তি, সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ড্রেজিং প্রকল্পে যথাযথ পরিকল্পনা ও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও মোহাম্মদ কামাল হোসেন অংশ নেন। এ ছাড়া হিসাব মহানিয়ন্ত্রক, অতিরিক্ত হিসাব মহানিয়ন্ত্রক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা এবং তিনটি বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।