অপরাধ দমনে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান চালিয়ে প্রতিদিনই সহস্রাধিক অপরাধী, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উদ্ধার হচ্ছে অস্ত্র, গুলি, মাদক ও দেশীয় অস্ত্র। শুধু ঢাকাতেই গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার করা হয় ৪৬৫ জনকে। মামলা হয় ৪২টি। এত গ্রেপ্তারের মধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ চলমান আছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, গ্রেপ্তার ও অভিযান বাড়লেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তার প্রভাব কতটা পড়ছে?
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রেপ্তার হলো অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক ধাপ। পরবর্তীতে সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সে সুযোগটা নিচ্ছে অপরাধীরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হিসাব অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএমপি এই ১১ দিনে রাজধানীতে বিভিন্ন অভিযোগে ৫ হাজার ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে ৫৮০টি। গড়ে প্রতিদিন গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪৫৫ জন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশজুড়ে গড়ে দেড় সহস্রাধিক ব্যক্তিকে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। গত ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ১১৮ দিনে বিশেষ অভিযান এবং অন্যান্য মামলায় মোট গ্রেপ্তার হয়েছে ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬ জন। এসব অভিযানে পুলিশ ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪ হাজার ৭২২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এর মধ্যে চলছে বিশেষ অভিযান। লাগাতার পুলিশি অভিযান, গ্রেপ্তারের মধ্যেও চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আগস্ট মাসের তুলনায় বেশ কিছু ক্যাটাগরিতে অপরাধ বেড়েছে। তার মধ্যে খুনের ঘটনা উল্লেখজনক।
সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৯৭টি। তবে এসব ঘটনায় নিহতের সংখ্যা আরও বেশি। একাধিক জায়গায় জোড়া খুনের ঘটনাও আছে। সবচেয়ে বেশি খুন হয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জে, ৫৭টি। দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা রেঞ্জ ৫৩টি। আর মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে খুন বেশি হয়েছে ডিএমপিতে, ৩১টি। এদিকে আগস্টে দেশজুড়ে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৮৬টি। সবচেয়ে বেশি ছিল ঢাকা রেঞ্জে, ৮৬টি।
প্রতিদিন অভিযান, গ্রেপ্তার হলেও অপরাধীরা থেমে নেই। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই ঘটছে। এসব ঘটনায় নাগরিক মনে উদ্বেগ বাড়ছে।
কুমিল্লায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা গত ৭ অক্টোবর বুধবার রাতে কুমিল্লা নগরের পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে বাড়ি ফেরার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে ১৫ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। পরদিন সকালে জেলার লালমাই উপজেলার জগৎপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় অটোরিকশা চালক সুমন মিয়াকে ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১০ অক্টোবর পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ওইদিন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দেন আসামি।
তরুণকে অপহরণের পর হত্যা রাজধানীর কাফরুলে রাকিবুল ইসলামকে (১৭) অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর লাশ কার্টনে ভরে নীলফামারীর ডিমলায় নিয়ে মাটিচাপা দেয় আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার (২৪)। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। এরপর মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করে আসামি। ভুক্তভোগীর সঙ্গে আসামির ধস্তাধস্তি হলে একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়। গত ৭ অক্টোবর তার লাশ উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় ডিএমপি।
খুলনায় ছেলের পর বাবাকে গুলি করে হত্যা খুলনার রূপসা উপজেলায় ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যার দেড় মাস পর তার বাবা আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা জেলায় ৩৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে গুলিতে।
রাজধানীতে চাঁদাবাজি, দখলদারি চলছেই গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচএফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় কয়েকশ লোক। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ইসিবি চত্বর-সংলগ্ন আবাসন প্রকল্প নিউগিনি প্রোপার্টিজে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গুলির অভিযোগ ওঠে; ক্ষতিগ্রস্ত হয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। একই দিন সকালে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় প্রায় ৩৫ কাঠা জমি দখলের চেষ্টা, বেড়া ভাঙচুর ও অফিসে হামলার অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় জমির মালিকানা বিরোধের আড়ালে সংঘবদ্ধভাবে জমি দখলের চেষ্টা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একের পর এক ঘটনার নেপথ্যে চাঁদা ও দখলের বিষয়টি সামনে আসে। তখন নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করে। গত ৬ অক্টোবর ডিএমপি জানায়, এর আগের চার দিনে ৪১ জন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর গুলশান আবাসিক এলাকার বর্জ্য অপসারণের কাজ পাওয়াকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে খিলক্ষেত থানার আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
খোদ পুলিশ সদস্যরাই নিরাপত্তাহীনতায়
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যাদের ওপর গুরুদায়িত্ব সেই পুলিশই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। খুলনা জেলায় রাতের বেলা পুলিশ সদস্যদের একা চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিট ইনচার্জদের প্রতি এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ৯ অক্টোবর রাতে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পুলিশ সুপার স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে এ নির্দেশনার কথা জানানো হয়।
এ বিষয়ে খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রূপসা থানায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা শেষে ফেরার পথে এক পুলিশ পরিদর্শক ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হন। ঘটনার সময় তিনি সাদা পোশাকে ছিলেন। ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরই মূলত জেলা পুলিশের প্রত্যেক সদস্যের সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনা করে রাতের বেলায় একা চলাচলের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয় বলছেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক। তিনি কালবেলাকে বলেন, বিভিন্ন ঘটনার পর যারা অভিযুক্ত বা যাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, তাদের একটা অংশ গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু আসলে গ্রেপ্তারই তো বিচার না। গ্রেপ্তার হচ্ছে বিচারের প্রাথমিক ধাপ। এই শুধু গ্রেপ্তার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বা মানুষকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে খুব একটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে না। কারণ এরপর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার আবশ্যক। যেটা হচ্ছে না। বিচারিক দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত বিচারের আগেই আসামিরা আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে একই অপরাধে জড়াচ্ছে। সে জন্য বলছি, শুধু গ্রেপ্তার নয়, দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। গ্রেপ্তার সাময়িক স্বস্তি তৈরি করছে, কিন্তু মোটা দাগে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি খুন হয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জে। তবে প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই জড়িতদের গ্রেপ্তারসহ অপরাধ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। তিনি কালবেলাকে বলেন, আমরা অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি। কোনো ঘটনার পর জড়িতরা যেমন গ্রেপ্তার হচ্ছে, একইভাবে এসব ঘটনা যেন না ঘটে সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিচ্ছি। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১০ হাজার কিশোর গ্যাং সদস্য আটক হয়েছে। মাদক-সংক্রান্ত গ্রেপ্তার বেড়েছে প্রায় চারগুণ। আমরা নিয়মিত স্পেশাল ড্রাইভ পরিচালনা করছি। জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও গ্রহণ করা হচ্ছে।